Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পাক সেনার হাফিজ প্রেম!

পাক সেনার হাফিজ প্রেম!
  • ৮ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: মুম্বই হামলার মাস্টারমাইন্ড! এই অপরাধেই ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল আমেরিকা তার মাথার দাম ঘোষণা করেছিল এক কোটি মার্কিন ডলার। সেই ঘোষণার কথা শুনে সেদিন হাফিজ সইদ রাগে ফেটে পড়েছিল। বলেছিল, পাকিস্তানে কে কোটিপতি হতে চায়? এ দেশে কে আছে, যে হাফিজ সইদের বিরুদ্ধে আমেরিকার হাতে তথ্য তুলে দেবে।

Advertisement

ওই ঘোষণার পর হাফিজ পাঞ্জাব প্রদেশের নিজের সদর দপ্তর থেকে চলে আসে রাওয়ালপিন্ডি। রয়টার্সের সাংবাদিক মাইকেল জর্জি এবং কাসিম নওমান লিখছেন, মার্কিন প্রশাসন পুরস্কার ঘোষণা করার পরও হাফিজ প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সামরিক গ্যারিসন শহর রাওয়ালপিন্ডিতে ঘুরে বেড়িয়েছে। আমেরিকা-বিরোধী কিছু চরিত্রের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিল। শুধু তাই নয়, পাক সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের উল্টোদিকে হোটেল দ্য ফ্ল্যাশম্যান’স-র কনফারেন্স রুম বুক করে বিরাট সাংবাদিক সম্মেলনও করেছিল। ইসলামাবাদে মার্কিন দূতাবাস থেকে সেই হোটেলের দূরত্ব গাড়িতে মাত্র ৪০ মিনিটের পথ। রয়টার্স জানাচ্ছে, টেলিভিশনে বারবার সইদের ফুটেজ দেখানোর সময় এক পাক নিরাপত্তা অফিসার বলেছিলেন, ‘মার্কিন ড্রোন হামলায় পাকিস্তানের অসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কারণে যদি আমরা প্রেসিডেন্ট ওবামার মাথার দাম নির্ধারণ করি তাহলে কী হবে?’ ভাবুন, এই সেই পাক সেনাবাহিনী, যারা বছরের পর বছর আমেরিকার থেকে কোটি কোটি ডলার অর্থ এবং অস্ত্র সাহায্য পায়।
সেদিন সাংবাদিক সম্মেলনে হাফিজ বলেছিল, আমেরিকা আমার মাথার দাম ১০ মিলিয়ন ডলার ধার্য করেছে শুনলাম। এর মানে কী? আমি গুহা নাকি মরুভূমিতে লুকিয়ে আছি? এই তো রাওয়ালপিন্ডিতে বসে আছি। সাহস থাকলে আমেরিকা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পাকিস্তান সরকারকে বলুক! পাকিস্তান সরকারের আছে সেই সাহস? সাংবাদিক সম্মেলনের সময় গোটা কনফারেন্স রুম ঘিরে ছিল একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে হাফিজ বাহিনী। আর শুরু থেকে শেষ, আমেরিকাকে নিয়ে যখন রীতিমতো হাসিঠাট্টা করে গিয়েছে হাফিজ, তখন পাশে বসে ‘তালিবানের জনক’ মৌলবী সামি-উল-হক এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রাক্তন প্রধান হামিদ গুল। রয়টার্স জানাচ্ছে, সেদিন স্যুট পরা এক পুলিস অফিসার সিগারেটে টান দিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘যে লোকটি হাফিজ সইদের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছেন, তিনি যদি মার্কিন বিদেশ দপ্তরে চাকরি পেতে পারেন, তাহলে আমিও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে পারি। আল্লা আমেরিকার মঙ্গল করুন...।’ 
এরপরও হাফিজকে ডেকে কিছু বলার সাহস হয়নি পাকিস্তানের। কেন? তার উত্তরও পেয়েছিল সংবাদসংস্থা রয়টার্স। পাকিস্তানের বাণিজ্যিক শহর করাচিতে একজন শীর্ষস্তরের পুলিস অফিসার বলেছিলেন, ‘হাফিজ সইদ ভুল কিছু বলেননি। আসলে, তিনি একজন দেশপ্রেমিক।’ গোটা দুনিয়া জানে, হাফিজ সইদ আইএসআই এবং পাকিস্তানের মিলিটারির পোস্টার বয়। একদিকে সমান্তরাল সরকার চালানো আর অন্যদিকে ভারতের উপর হামলা ও কাশ্মীর মিশনের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অস্ত্র। ২০১২ সালে মুম্বই হামলার পর খুলে গিয়েছিল পাক সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতার মুখোশ। বেরিয়ে এসেছিল পাক সেনাবাহিনী ও সন্ত্রাসবাদের ‘অপবিত্র জোট’-র আসল চেহারা। জানা গিয়েছে, গোটা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ২০০-রও বেশি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে ৫০টিরও বেশি গোষ্ঠী শুধুমাত্র পাকিস্তানেই লালিত পালিত হয়। তাদের জন্য রয়েছে জেহাদের বিশেষ প্রশিক্ষণকেন্দ্রও।
হাফিজের সংগঠন লস্কর-ই-তোইবা পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী আহল-ই-হাদিস গোষ্ঠী। ধর্মীয় সংগঠন ‘মারকাজ দাওয়াহ-উল-ইরশাদ’-এর সশস্ত্র শাখা। লস্কর-ই-তোইবার অর্থ ‘আল্লার সেনা’। লাহোর থেকে ঠিক ৩১ কিলোমিটার দূরে পাঞ্জাব প্রদেশের মুদিরকায় লস্কর-ই-তোইবার হেডকোয়ার্টার। ১৯৮০-এর দশকে আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশে হাফিজ সইদ, জাফর ইকবাল এবং আব্দুল্লা আজ্জম এই দলটি তৈরি করেছিল স্রেফ ভারতের মাটিতে রক্ত ঝরাতে। লস্করের দাবি, তারাই পাকিস্তানে সবচেয়ে বড় জঙ্গি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। যেখানে ২,২০০টি অফিস এবং প্রায় দু’ডজন ক্যাম্প রয়েছে। তারাই সন্ত্রাসবাদীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করে জম্মু ও কাশ্মীরে পাঠায়। এইসব তথ্য সবই জানে ইসলামাবাদ। এরপরও হাফিজকে গ্রেপ্তার করা তো দূরের কথা, পারভেজ মুশারফ থেকে আসিম মুনির যেই হন, হাফিজকে যমের মতো ভয় পান তাঁরা। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব পিস স্টাডিজ-এর পরিচালক আমির রানা ‘দ্য ট্রু ফেস অব জিহাদিস’ বইয়ে লিখেছেন, হাফিজ সঈদ শুধু কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে চান না, একইসঙ্গে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক ইসলামিক খিলাফতের অংশ করতেও চান।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষকরা দাবি করেন, আইএসআই-এর ধারাবাহিক সহায়তায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরে মাদ্রাসা ও প্রশিক্ষণ শিবিরের বিস্তার ঘটেছে, যাতে আরও বেশি সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও প্রভাবিত জঙ্গি তৈরি করে ভারত-শাসিত ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করানো যায়। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন কেল, সার্ডি, দুধনিয়াল, আথমুকাম, জুরা, লিপা, পাছিবান, ফরোয়ার্ড কাহুতা, কোটলি, খুইরাত্তা, মান্ধার, নিকাইল, চামানকোট এবং জানকোট এলাকায় ছড়িয়ে আছে একগুচ্ছ জঙ্গি লঞ্চ প্যাড। ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, জম্মু-কাশ্মীরে কাজ চালানো ছায়া সংগঠনগুলিকে সন্ত্রাসবাদী আদর্শে দীক্ষিত করাই কেবল নয়, সীমান্তের ওপার থেকে পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সাহায্যও জোগায় হাফিজ বাহিনী। এই কাজে তার ডান হাত তথা লস্করের ‘ডেপুটি’ সইফুল্লা কাসুরি। এইসব সন্ত্রাসবাদী দলকে অর্থ জোগায় উপসাগরীয় দেশগুলি এবং প্রবাসী পাকিস্তানিরা। আল রেহমত ট্রাস্টের আড়ালে সেই তহবিল সংগ্রহ করা হয়।
পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আয়েশা সিদ্দিকা বলেছিলেন, ‘মার্কিন অর্থের প্রধান সুবিধাভোগী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কখনও কোনও যুদ্ধ জেতেনি। তবে আমেরিকার বিনিয়োগে পাকিস্তানে প্রচুর হোটেল, রিয়েল এস্টেট, শপিং মল গড়ে উঠেছে। এই ধরনের উদ্যোগ যতই দুর্নীতিগ্রস্তই হোক না কেন, একটি শূন্যতা পূরণ করে। কারণ, পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে মার্কিন করদাতাদের উপর নির্ভরশীল।’ পাক সেনাবাহিনীর ঘরে যতদিন আমেরিকার অর্থ ঢুকবে, ততদিন সেনাবাহিনী এবং সন্ত্রাসবাদীদের গোপন অক্ষ টিকে থাকবে। এই তথ্য ওয়াশিংটনেরও অজানা নয়। ইতিহাস সাক্ষী, নব্বইয়ের দশকে আফগান মুজাহিদিনদের গোপন সহায়তা দেওয়ার গোটা সময়জুড়ে পাকিস্তানের আইএসআই ও আমেরিকার সিআইএ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করে। এই সংঘাতের সময়, জেনারেল জিয়াউল হক আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানে কট্টর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ধারা প্রচলন করেন, যা তাঁর শাসনক্ষমতাকে মজবুত করে তোলে। আমেরিকার সাহায্য না পেলে তা কখনওই সম্ভব ছিল না। সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারাই আজও বয়ে চলেছে পাক সেনাবাহিনী। আজও বছরের পর বছর বিশাল অঙ্কের মার্কিন সাহায্য পায় ইসলামাবাদ। আর তার একটা অংশ কাজে লাগায় ভারতের বিরুদ্ধে। হাফিজ সইদদের টিকিয়ে রাখতে...।
আমেরিকার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য, পাকিস্তান আজও ‘ডাবল গেম’ খেলে চলেছে। একদিকে, তারা দেশের অভ্যন্তরীণ হিংসায় যুক্ত গোষ্ঠীগুলিকে কড়া হাতে দমন করে। অন্যদিকে, কাশ্মীর উপত্যকা এবং ভারতের অন্যান্য অংশে হামলা চালাতে সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করে। এই ‘ডাবল গেম’-এর কৌশল পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। প্রশ্ন হল, এরপরও আমেরিকা কেন পাকিস্তানের অর্থ ও সামরিক সাহায্য বন্ধ করে না? আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই অস্পষ্ট। ৯/১১-র পর আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়। স্থলপথ উন্মুক্ত করে। মার্কিন বিমানকে তার বন্দর ব্যবহার করতে দেয়। সবই মূলত আমেরিকার কাছ থেকে বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে। আর এখনও সেই কৌশলেই চলে পাক সেনা। ইসলামাবাদ জানে, কোনও ভাবেই আর দীর্ঘমেয়াদি পুরোদস্তুর যুদ্ধ চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে কম খরচের ছায়া-যুদ্ধের রাস্তা অবলম্বন করে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই।
পাকিস্তানের একটাই টার্গেট— কাশ্মীর সমস্যার উপর একটি ধর্মীয় রং চাপিয়ে গোটা দুনিয়াকে বিপথে চালানো। একইসঙ্গে আফগানিস্তানের আদলে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে কাশ্মীরের ধর্মনিরপেক্ষ ও বহু-সাংস্কৃতিক সমাজকে কঠোর ইসলামি সমাজে রূপান্তরের চেষ্টা চালানো। এরজন্য তাদের হাফিজকে প্রয়োজন। আর তাই পহেলগাঁওয়ে হামলার ঘটনার পরই লস্কর সুপ্রিমোর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছে পাক গুপ্তচর বাহিনী আইএসআই। সন্ত্রাসবাদের এই বিষধর সাপটিকে থেঁতলে মারতে ভারতীয় সেনা বা বিমানবাহিনী বড় আকারের ফৌজি অভিযান চালাতে পারে বলে ইতিমধ্যেই ছড়িয়েছে জল্পনা। লাহোরের জোহর টাউন এলাকায় হাফিজের বাসস্থান এবং তাঁর সঙ্গীদের গতিবিধি নিয়ে সম্প্রতি কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ্যে আসে। সেখানে লস্কর প্রধানের বাড়ির চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে উচ্চ রেজোলিউশনের সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে বলে দেখা গিয়েছে। পাশাপাশি তাঁর বাড়ি ঘিরে রেখেছে পাক পুলিস, আধা সেনা এবং সশস্ত্র জঙ্গিদের একটি দল। চলছে ড্রোনে নজরদারি। হাফিজ যদি পহেলগাঁওয়ে হামলার সঙ্গে জড়িত না থাকে, তাহলে তার নিরাপত্তা নিয়ে পাক সেনা এত চিন্তিত কেন?
তবে কি সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের ‘নোংরা খেলা’ চলতেই থাকবে? এর উত্তর রয়েছে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ), আইএমএফ, এডিবি-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে। একমাত্র অর্থের উৎস বন্ধ হলেই পাকিস্তান থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা সম্ভব— এই সহজ কথাটি ওয়াশিংটনেরও অজানা নয়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ