সুকান্ত বসু, কলকাতা; ২৫০ বছরের প্রাচীন টালার মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজো। এখানে মাকে দেওয়া হয় বড় সাইজের জোড়া ইলিশ। ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় বিউলির ডাল, পোস্ত, কচু শাক সহ নানা পদ। হরেকরকম ফল, মিষ্টি ছাড়াও লুচি, আলুর দম, ছোলার ডাল মাকে নিবেদন করে প্রসাদ হিসেবে সবাইকে দেওয়া হয়। একচালা প্রতিমায় মা দুর্গার সঙ্গে থাকা সিংহ ঘোড়ামুখী। একে বলে ‘নেকো সিংহ’। দশমীর দিন কুমারী পুজো হয় টালার মুখোপাধ্যায় বাড়িতে।
পরিবারের তরফে রবিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় জানান, এই বাড়িতে একটা সময় প্রতি বছর মাটির প্রতিমার বদলে পুজোর দিনগুলিতে প্রতিষ্ঠিত অষ্টধাতুর মা চণ্ডী পূজিতা হতেন। পরে শুরু হয় সাবেকি একচালার প্রতিমায় পুজো। প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের আমলে এই পুজো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাঁরই উদ্যোগে এই পুজোয় বেড়েছিল জাঁকজমক ও আড়ম্বর। রবিশঙ্করবাবু বলছিলেন, ‘এখনও দুর্গাপুজোর সময় আমাদের মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত মা চণ্ডী ও নারায়ণ শিলার পুজো হয় নিষ্ঠার সঙ্গে। এই নারায়ণ শিলার একটা ইতিহাস রয়েছে। আমাদের পরিবারের পূর্বপুরুষ প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় প্রতিদিন একজন ব্রাহ্মণ খুঁজে তাঁর পা ধুইয়ে তবেই দুপুরের অন্ন গ্রহণ করতেন। একদিন অনেক বেলা হয়ে যাওয়ার পর একজন ব্রাহ্মণকে খুঁজে পান। আচমকা সেই ব্রাহ্মণ বাড়িতে এসে প্রাণকৃষ্ণবাবুর হাতে একটি তুলসী দেওয়া নারায়ণ শিলা তুলে দেন। বলেন, এটি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করে পুজো করলেই হবে। এতেই তাঁর সমস্ত আশা ও কামনা পূর্ণ হবে। তার কিছুদিন পরেই মৃত্যু হয় ওই ব্রাহ্মণের। বাড়ির একটি চালাঘরে সেদিন থেকে শুরু হয় আমাদের বাস্তুদেবতা নারায়ণ শিলার পুজো।’
অতীতে এই বাড়ির পুজোয় ছাগ বলির প্রচলন ছিল। পরে বন্ধ হয়ে যায় বলিপ্রথা। তবে অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগে মুখোপাধ্যায় বাড়ির মন্দির দালানেই হতো দুর্গাপ্রতিমা। পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রতি বছর কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা আনা হয়। মুখোপাধ্যায় পরিবারের গৃহবধূ শ্যামলীদেবী বলেন, ‘সপ্তমী থেকে দশমী—পুজোর চারদিনে মাকে যে ভোগ নিবেদন করা হয়, তার মধ্যে থাকে নানা পদ। সাদা ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, পাঁচ রকমের তরকারি, চাটনি, পায়েস, নানা ধরনের মিষ্টি ইত্যাদি। বাড়ির ঠাকুর দালানে মহালয়ার পরের দিন থেকে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। চলে পঞ্চমীর দিন পর্যন্ত।’ কয়েকশো বছরের প্রাচীন বাড়ি ও মন্দিরের গঠনশৈলী ও চোখধাঁধানো স্থাপত্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এমনই অজস্র ইতিহাস। ফি বছর উত্তর কলকাতা ও শহরতলির বহু মানুষ টালার মুখোপাধ্যায়দের বাড়ির পুজো দেখতে ভিড় জমান।