সাতাত্তরে সিদ্ধার্থ সরকারের পতনের পরই বাংলাজুড়ে কংগ্রেসের ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বাড়ির দশা প্রকট হয়ে পড়ে। শতাব্দী প্রাচীন দলের অসংখ্য অফিসের সঙ্গে নেতারাও আছেন, নেই শুধু কর্মী বাহিনী। নেতারা ঠান্ডাঘর ছেড়ে বেরোতে নারাজ। তাই গণআন্দোলন দানা বাঁধে না। মানুষের স্বার্থে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হাতে গোনা দু-একজন পথে বেরোলেই প্রমাদ গোনে প্রদেশ নেতৃত্ব। পারলে লড়াকুদের কাছা টেনে ধরে, ল্যাং মারে। সেকালে কংগ্রেস নেতাদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যেত শুধু ভোটের ঢাকে কাঠি পড়লেই। তবে শুধু নিখাদ আমোদ প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকত না, ভোটে প্রার্থী হওয়ার জন্যও জান লড়িয়ে দিতেন তাঁরা। এজন্য দলের ভিতরে কত যে উপদল গজিয়ে উঠত তার হিসাব রাখা মুশকিল হত বইকি! হাত চিহ্নে নমিনেশন পাওয়ার জন্য মারামারিও হত বিস্তর। নেতাদের কুশপুতুল জ্বালানো থেকে দলীয় অফিস ভাঙচুর—বাদ যেত না কিছুই। কুভাষার স্রোত বইত কোনো কোনো ‘জনপ্রিয়’ নেতার নামে। বস্তুত টিকিট প্রত্যাশীদের কাড়াকাড়ি, কামড়াকামড়ি বিবিধ রগড়ের জন্ম দিত।
হবে নাই-বা কেন, নেতারা ছিলেন নির্ভেজাল ভোটপাখি! ফলে রকমারি ভোটে একতরফা গোল করে বেরিয়ে যেত সিপিএম এবং তাদের বন্ধুরা। কংগ্রেস কর্মীরা দূর থেকে দেখে যেতেন কেবল শত্রুপক্ষের লাল আবির খেলা, বিজয় উৎসব। বারবার এমন গোহারা হওয়ার কোনো ব্যাখ্যা মিলত না। সায়েন্টিফিক রিগিংয়ের দোহাই দিয়ে আর জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) মুণ্ডপাত করেই একেকটা পর্ব পার করতেন কংগ্রেস নেতারা। সেই কংগ্রেস এখন সাইনবোর্ডসর্বস্ব বঙ্গদেশে। তবে শূন্যস্থান পূরণ হতে খুব দেরি হয়নি। প্রদেশ কংগ্রেসের ফেলে যাওয়া স্পেস দখল করে নিয়েছে বঙ্গ বিজেপি। মোদি-শাহরা কয়েকবছর যাবৎ বাংলার ক্ষমতা দখলের জন্য ভীষণ হাঁকপাক করছেন। ঠিক যেমন ভোট এলেই গনিখান চৌধুরী বামফ্রন্টকে বঙ্গোপাসাগরে নিক্ষেপ করার আস্ফালন করতেন। কিন্তু একুশ (বিধানসভা নির্বাচন) এবং চব্বিশের (লোকসভা নির্বাচন) অ্যাসিড টেস্টে যে বিজেপি ডাহা ফেল! সেই লজ্জার হার ও ব্যর্থতার কারণ খুঁজে দেখেছেন কি নেতৃত্ব? মনে হয় না। কারণ তারপর মেরামতির জন্য যা যা করণীয় ছিল, তার কিছুই করেনি দল। শুধুই হাওয়া গরম করে আর ইসিআই এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভরসায় কেল্লা ফতে করার খোয়াব দেখানো হচ্ছে। তার ফলে দলে বিন্দুমাত্র শৃঙ্খলার পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। সংগঠন এবং সংযমের বালাই নেই। ব্যাপারটা প্রার্থী বাছাই পর্বেই প্রকট। প্রার্থীদের জেতানোর জন্য জান লড়িয়ে দেওয়ার বদলে দিকে দিকে মাথা তুলেছেন টিকিট প্রত্যাশীর দল! কয়টি বুথে কয়জন কর্মী দেওয়া যাবে? কারা দেওয়াল লিখবেন? কারা দোরে দোরে গিয়ে ভোট প্রচার করবেন? কোনোটারই ঠিক নেই। শুধুই টিকিট পাওয়ার জন্য কামড়াকামড়ির খবর সামনে আসছে। কিন্তু তাদের মধ্যে একটু লড়াই দেওয়ার যোগ্য কজন? এই চিন্তায় নেতৃত্বের দিশাহারা অবস্থা।
ফলে বেশিরভাগ প্রতিদ্বন্দ্বী দল যখন প্রার্থীদের নাম ঘোষণাসহ প্রচার শুরু করে দিয়েছে, বিশেষত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন বিজেপি ‘যোগ্য’ প্রার্থী খুঁজে পেতে মাথার চুল ছিঁড়ছে। বঙ্গে একবারে প্রার্থী তালিকা ঘোষণার মুরোদ হয়নি ‘পৃথিবীর বৃহত্তম’ রাজনৈতিক দলের। তারা তালিকা ঘোষণা করছে দফায় দফায়। যেমন মঙ্গলবার ফের একদফা তালিকা প্রকাশ করেছে বিজেপি। এ নিয়ে চতুর্থবার। কিন্তু এদিন ১৩টি কেন্দ্রে প্রার্থী ঘোষণার পরও সেই তালিকা পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল না। এখনো বাকি থেকে গেল ছয়টি কেন্দ্র। এছাড়া ইতিমধ্যেই ঘোষিত একাধিক আসনের প্রার্থী নিয়ে দলের ভিতরে ঝগড়াঝাঁটি অব্যাহত বলেই খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারপরও এত আসনে, অত আসনে জিতব বলে বাহু ফোলাচ্ছেন গেরুয়া শিবিরের কোনো কোনো নেতা! জনগণের প্রশ্ন, কোন ভরসায়? ইসিআই, কেন্দ্রীয় বাহিনী, দুর্বৃত্ত, অঢেল টাকা আর সমাজ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়াবার সৌজন্যে? বিজেপি যেন ভুলে না যায়, বাংলার মাটি সত্যিই দুর্জয় ঘাঁটি! কাদের জন্য? যারা মানুষের বিরোধী, বাংলা ও বাঙালি বিরোধী—তাদের জন্য। বিরোধিতার এই খেলায় বিজেপিকে ‘চ্যাম্পিয়ন’ বলেই চেনে তামাম বাংলা।