সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: পূবালি হাওয়া আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি মানেই মৎস্যজীবীদের মুখে চওড়া হাসি। পদ্মা, মেঘনাতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। এটাই বহু প্রাচীন রীতি। এবার বাংলাদেশে পরিস্থিতি উলটো। পূবের হাওয়া রয়েছে...ঝিরঝিরে বৃষ্টি রয়েছে। মৎস্যজীবীরা আশা নিয়ে জাল ফেলছেন নদীতে। কিন্তু দেখা নেই ‘গন্ধ ঝাঁক’-এর! বড্ড মন খারাপ মৎস্যজীবীদের। একে অপরের মধ্যে হাঁকডাক করে স্মরণ করছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে—‘হালার মাছ ধইরা জুত নেই!’
বাংলাদেশের চাঁদপুর হোক কিংবা বরিশাল, সব জায়গার ছবিটা একই রকম। ফলে, পদ্মা বা মেঘনার ভরপুর গন্ধ ভরা স্বাদু ইলিশ এপার বাংলাতেও আসছে না। রাজ্যের মৎস্যদপ্তরের এক শীর্ষ কর্তা বলছিলেন, বাংলাদেশের চাঁদপুরে সব থেকে বেশি ইলিশ পাওয়া যেত। এবার সেখানেও জাল ভর্তি মাছ উঠছে না। মরশুম শেষ হওয়ার পর দেড় বছর কেটে গিয়েছে। তারপরও পদ্মা বা মেঘনা উদার হয়নি। বছরে আট মাস ইলিশ ধরার উপর নিষেধাঞ্জা থাকে। সেসব মানা হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইলিশ অধরা।
ইলিশ বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়া পরিবর্তন এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বর্ষাকালে সাধারণত ইলিশ সমুদ্র থেকে নদী অর্থাৎ মিষ্টি জলে আসার চেষ্টা করে। মিষ্টি জলে এসে ডিম পাড়ে। কয়েক বছর ধরে বর্ষার খামখেয়ালিপনা চলছে। উষ্ণায়নের জন্য সমুদ্রের পরিবেশও বদল হচ্ছে। জলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সমস্ত বিভিন্ন কারণে মাছ উপকূলে আসছে না। ফলে, বাঙালির ইচ্ছে থাকলেও বর্ষার মরশুমে পাতে ইলিশ তুলতে পারছেন না। লালগোলায় পদ্মায় মাছ ধরেন জীবন দাস। তিনি বলেন, ‘জালে ছোট সাইজের মাছ উঠছে। আগের মত বড় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আশা করা যায় পুজোর আগে ভাল মাছ পাওয়া যাবে।’
পদ্মা কিংবা মেঘনাতে নয়, সমুদ্রও এবার বেশ কৃপণ। দীঘার মৎস্যজীবী সুমন্ত পাত্র বলছিলেন, ‘মাছ ধরার খরচ বেড়ে গিয়েছে। গভীর সমুদ্রে ট্রলার নিয়ে গিয়ে মাছ ধরতে হয়। জ্বালানির খরচ বেড়ে গিয়েছে। অন্যান্যখরচও বেড়েছে। কিন্তু জালে প্রত্যাশিত ইলিশ উঠছে না। যতদিন না সমুদ্র উদার হবে ততদিন পর্যন্ত বেশি দাম দিয়েই মাছ কিনতে হবে।’ রাজ্যে মৎস্য ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বাজারে সব থেকে বেশি। সেদেশের সরকার অনেক সময় মাছ পাঠাতে না চাইলেও চোরা পথে ইলিশ এদেশে ঢোকে। নির্দিষ্ট বিক্রেতাদের কাছে এই মাছ পাওয়া যেত। এবার সেটাও হচ্ছে না। বাজারে বড় সাইজের কিছু ইলিশ দেখা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা কেনার সাধ্যি অনেকেরই থাকছে না।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো নিয়ে সরকারিভাবে বহুদিন ধরেই গবেষণা চলছে। মুর্শিদাবাদের ফরাক্কায় বিশেষ উপায়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া মিষ্টি জলে সমুদ্রের রূপালি ফসল চাষ করা যায় কিনা, তা নিয়েও বহুদিন ধরে পরীক্ষা চলছে। কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য মিললেও নদী অথবা সমুদ্রের ইলিশের স্বাদ মিলছে না। সবাই এখন মুখিয়ে কবে সদয় হয় পদ্মা কিংবা মেঘনা অথবা বঙ্গোপসাগর।