Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

অযোধ্যা কদর বোঝেনি রাম-সীতার পটচিত্রের মৌ চিত্রকরের মেঠো সুরে পটগান মাতিয়ে দিচ্ছে হস্তশিল্প মেলা

অযোধ্যা কদর বোঝেনি রাম-সীতার পটচিত্রের মৌ চিত্রকরের মেঠো সুরে পটগান মাতিয়ে দিচ্ছে হস্তশিল্প মেলা
  • ১২ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ‘সাঁঝের বেলায় যমুনার জল আনতে বলে কে?’ মেলার ভিড়ে মেঠো গলায় এই গান শুনে সকলেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন গানের উৎস খুঁজে বের করতে। অচিরেই চোখ চলে যাচ্ছে চিত্তাকর্ষক স্টলগুলি ছেড়ে মাটি দিয়ে সাজানো ছোট্ট দোকানটায়। মেলার জাঁকজমক ছেড়ে জনতা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই। উৎসুক জনতার ভিড় জমছে স্টলের সামনে। ভিতরে প্রাকৃতিক রং দিয়ে পট আঁকতে আঁকতে একমনে গান গেয়ে চলেছেন মৌ চিত্রকর। 
Advertisement
কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের মাঠে হস্তশিল্প মেলায় ভর সন্ধ্যায় রকমারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে মৌ চিত্রকরের মেঠো গান। কাউকে নিজের শখে গান শোনাচ্ছেন। আবার গানের আবদার এলে সেটাও পূরণ করছেন। আবার কখনও নিজের খেয়ালে ভিড় মেলাতেই সুর চড়াচ্ছেন। উদ্দেশ্য, নিজের হাতে আঁকা পটচিত্র বিক্রি করা। টুকটাক কেনাকাটা, বিক্রিবাটা চলছে ঠিকই। কিন্তু আরও একটু ভালো ব্যবসা করে যেতে চান তিনি। কথা বলে জানা গেল, মাস কয়েক আগে নিজের গ্যাঁটের টাকা খরচ করে অযোধ্যা গিয়েছিলেন রাধা-মাধব, রামসীতা, কৃষ্ণলীলার পটচিত্র নিয়ে। কিন্তু শিল্পী হাতের ছোঁয়ায় পটচিত্রে জীবন্ত হয়ে ওঠা দেবতা দর পায়নি ‘রাম জন্মভূমি’-তে। হতাশ হয়েছিলেন। কিন্তু হাল‌ ছাড়েননি। তাই মেদিনীপুর থেকে মৃৎশিল্পের শহর কৃষ্ণনগরে ছুটে আসা। 
কয়েকদিন হল কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজের মাঠে শুরু হয়েছে রাজ্য সরকারের হস্তশিল্প মেলা। বিভিন্ন জেলা থেকে নিজের হাতের কাজ নিয়ে শিল্পীরা এসেছেন মেলাতে।‌ পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে পটচিত্র নিয়ে এসেছেন মৌ চিত্রকর। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর স্বামী। স্বামীর হাত ধরেই পটচিত্রের কারুকার্য শেখা মৌয়ের। শ্বশুরবাড়ির বংশগত এই ব্যবসা নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন তিনি। বর্তমানে পট আঁকতে পটু মৌ। তিনি বলেন, ‘লটকল ফল, অপরাজিতা, লতাপাতা সহ বিভিন্ন জৈব উপকরণ দিয়ে আমরা রং তৈরি করি। প্রথমে বাটনা দিয়ে বেটে, তারপর কাঁঠালের আঠা মিশিয়ে গাঢ় রং তৈরি হয়।’ সেই রঙেই পটের উপর জীবন্ত হয়ে ওঠেন দেবতারা। মৌ দেবীর হাতের নিপুণ কাজ ছুঁয়ে না দেখলে বোঝা যায় না। সারাদিন এই কাজেই দিন কাটে তাঁর। সংসার চলে এই পটচিত্র এঁকেই। পাশাপাশি জামাকাপড়ের উপর ফ্যাব্রিকের কাজও করেন। সারা বছরই নিজের হাতের কাজ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। তিনি বলেন, ‘পটচিত্র নিয়ে আমি দিল্লি, মুম্বই সহ বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। সেখানে বিক্রিবাটাও খুব ভালো হয়েছে। এই পটচিত্র এঁকেই আমাদের সংসার চলে। আমার স্বামী পটচিত্র এঁকে অনেক জায়গায় পুরস্কৃতও হয়েছেন।’
গত অক্টোবরে মাসে গিয়েছিলেন অযোধ্যায়। আশা করেছিলেন, হিন্দু ভূমিতে দেবতাদের পটচিত্র আলাদা গুরুত্ব পাবে। বিক্রিবাটাও হবে ব্যাপক। তাই নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু রামের জন্মভূমিতে রাম-সীতার পটচিত্রর বিক্রি নেই’ দেখে অবাক হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে অযোধ্যা গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানকার মানুষ দেবতাদের নিয়ে আঁকা পটশিল্পের গুরুত্ব বোঝেনি।’
কৃষ্ণনগরের হস্তশিল্পের মেলায় ঢুকলেই মৌ চিত্রকরের গলায় শোনা যায়, ‘সাঁঝের বেলায় যমুনার জল আনতে বলে কে?/ওই না জানি কোন কালার সাথে মন মেজেছে/ওই কদম গাছে উঠে বংশী বাজায় কে? সাঁঝের বেলায় যমুনার জল আনতে বলে কে?’
সম্পর্কিত সংবাদ