Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

অরণ্যের অধিকারী

১৫০-১২৫-১০০-৫০, না, এটি আধার বা অন্য কোনো কার্ডের নম্বর নয়। এ বছরের সাপেক্ষে একে বীরসাকেন্দ্রিক এক সোনালি চতুর্ভূজের জয়ন্তীযোগ বলা যেতে পারে।

অরণ্যের অধিকারী
  • ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সায়ন্তন মজুমদার: ১৫০-১২৫-১০০-৫০, না, এটি আধার বা অন্য কোনো কার্ডের নম্বর নয়। এ বছরের সাপেক্ষে একে বীরসাকেন্দ্রিক এক সোনালি চতুর্ভূজের জয়ন্তীযোগ বলা যেতে পারে। ২০২৫ সালে বীরসা মুণ্ডার জন্মসার্ধশতক সহ মৃত্যুর সপাদশতবর্ষ (১২৫ বছর) পূর্তি হয়েছে। আবার বঙ্গসাহিত্যে তাঁর অমর চিত্র কথাকার মহাশ্বেতা দেবীর জন্মশতবর্ষও শুরু হয়েছে। তাঁর লেখা বীরসাচরিতমূলক উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’-এর বর্তমানে সুবর্ণজয়ন্তী চলছে। ১৯৭৫ সালে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় এই সৃষ্টির মাধ্যমেই লেখিকা ‘মডার্ন ম্যান’ বীরসার ‘বিশ্বমানবকে অরণ্য-জল-পরিবেশ রক্ষায় সেনানী’ হওয়ার ডাককে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

Advertisement

১৫ নভেম্বর, ১৮৭৫। তিন তারার ত্রহ্যস্পর্শ যোগে এই মুণ্ডারী ভগবানের জন্ম হয় প্রতিবেশী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের বামবা গ্রামে। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। তাই তাঁর নাম রাখা হয় বীরসা। ঘটনাচক্রে ২০০০ সালে তাঁর ১২৫ তম জন্মদিনেই  প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি ঝাড়খণ্ডের প্রতিষ্ঠা হয়। সুগানা মুণ্ডা এবং করমি-র পুত্র এই অনার্যকৃষ্ণের জন্মকালে মাতৃভূমি আগ্রাসী দিকু ও ব্রিটিশদের অত্যাচারে পরিণত হয়েছিল কংস-কারাগারে। যাঁদের পূর্বজ চটিয়া হরম ও নাবু-র নামে ছোটনাগপুরের নামকরণ, যাঁদের হাতে এই পাথুরে জমিতে শাবলের ঘায়ে খুঁটি গেড়ে খুটখাট্টি গ্রামগুলি গড়ে ওঠে, তাঁরাই হারায় নিজেদের জমিতে স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার। পেটের অন্ন ও বিদ্যার প্রয়োজনে স্বগোত্রীয় দেবতা সিংবোঙাকে ছেড়ে তাঁদেরকে যিশুর উপাসক হতে হয়। খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়ে বীরসা পায় দাউদ নাম। মৃত্যুকালীন বন্দিদশায় তাই নিজেকে যিশুর মতোই একজন ভেবেছিলেন।
অন্নহীন, আলুনি, চীনা ঘাসের দানাসেদ্ধ থেকে তৈরি ঘাটো খাওয়া, হতশ্রী সংসারের সদস্য ছিলেন বীরসা। মেষপালক যিশু এবং গোপালক কৃষ্ণের মতো গাইচরীর কাজ করতে হয়েছিল তাঁকেও, মাত্র আট বছর বয়স থেকে। বাজাতে পারতেন বাঁশি ও লাউখোলের তৈরি টুইলা। ছোটো থেকেই তাঁর মনের মধ্যে একটা রোখ চেপে গিয়েছিল, ‘আমি বড়ো হব!’ যে কারণে মা-বাবার ‘পেটের ছেলা’ হয়েও অনেক সময় তাঁদের কাছে ছিলেন ‘অচিনা’। খাটাংগায় মাসির বাড়িতে নিশ্চিন্তে খাওয়া-পরার সুখ পেয়েছিলেন। কিন্তু তা মানুষকে ভীতু, কমজোরি করে দেয়—এই বোধ মাথার মধ্যে কাজ করায় একদিন ফিরে আসেন চালকাড়ে গ্রামে।
তারপর...আয়ুভাতুর জয়পাল নাগের পাঠশালা, বুরজু-র জার্মান মিশনে শিয়ালের আঙুর ফল খাওয়ার ইংরেজি গল্প পড়া সাঙ্গ করে চলে যান চাইবাসায়। সাহেবদের সমান হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে সেখানে পৌঁছতে বাবার সঙ্গে এগারো বছরের বীরসা সেদিন যেন এক জন্ম হেঁটেছিলেন।
ভাবীকালের মহাদাবানলের প্রথম স্ফুলিঙ্গ দেখা দিয়েছিল সেই চাইবাসাতেই। ফাদার নর্ট্রট মুণ্ডাদের ভিখিরি, বেইমান বললে প্রথম প্রতিবাদী স্লোগান চলে আসে বীরসার মুখে—‘সাহেব সাহেব এক টোপি হ্যায়!’সেদিনই খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে আর্যভারত থেকে কৃষ্ণমহাভারত নির্মাণের অভিষেক!
জঙ্গল ছিল তাঁর কাছে মায়ের মতো। ছোটনাগপুর ছিল শরীর এবং সেই অঞ্চলের নদী তাঁর রক্ত। বোধহয় আদিদেবতা হরম্ আসুলের আশীর্বাদ পেয়েই তিনি বাঘ দেখেও ডরতেন না।‘এ আমার বন’—খুব ছোটোবেলায় বলা এই সদর্প উক্তি তাই উত্তরকালে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পরিণত হয়েছিল এক শপথবাচনে—‘শুচ করে দিব মা গো’। তাই দিকু ও বিজাতীয়দের হাতে বন্দিনী অরণ্যে নিষিদ্ধ সময় জ্যৈষ্ঠ মাসে ঢুকে মশাল জ্বালেন। তারপর ‘নে মুলুক দিসুমরে ধরতি আবায় হাইজি লেখায় ভাদ্রমাসে’ অর্থাৎ তিনি পরিণত হন ধরতি-আবা বা পৃথিবীপিতাতে। জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে জন্ম দেন এক নতুন বীরসাইত সম্প্রদায়ের। অধিকারের জন্য  প্রয়োজনে মারা এবং মরার জন্য তৈরি থাকার ডাক দেন। সাহেবদের গায়ের রং বলে সাদাকেই শত্রু বলে চিহ্নিত করেন।
সিদ্ধ হতে গেলে ক্ষুরস্য ধারা সাধনার কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়। শ্মশানবোঙাকে অগ্রাহ্য করে, কবর খুঁড়ে মৃতদেহ থেকে আংটি-পয়সা বের করা যেন ছিল বীরসার সেই শবসাধনা। মুন্সি আনন্দ পাঁড়ের কাছে থেকে মহাকাব্য, পুরাণ... বহু কিছু পড়েছিলেন। প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আগে পরিব্রাজক বিবেকানন্দ কিংবা বিশ্বজয়ী অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো প্রায় সকল মুণ্ডা-এলাকা পরিভ্রমণ করেছিলেন বীরসা। জল বেঁধে রাখা পাথর সরিয়ে ধুরা নদীকে পরিণত করেন মুক্তধারায়। বহতা স্রোতের জল ও আপাং গাছের শিকড় বেটে খেতে বলে আটকান সকলের হায়জা বা কলেরাও। নিমপাতা সিজে জল খাইয়ে দূর করেছিলেন মহামারী বসন্ত বা চেচক বুড়ির প্রকোপ। ছেলেবেলায় ছাগলের ভাঙা পা লতাপাতার বাঁধনে সারানোর শিক্ষানবিশিই পরিবেশবান্ধব জনচিকিৎসক হতে সহায়তা করেছিল তাঁকে।  
রাজদ্রোহের পুরস্কার হিসেবে উনিশ বছর বয়সে জরিমানা সহ দু’বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পান বীরসা। তিনি একে ‘ঈশ্বরের পরীক্ষা’ বলেই ধরে নেন। ১৮৯৭ সালে জন্মমাসে কারামুক্ত হন। স্ত্রী নন, চিরসখী সালীর বাড়িতে দাঁড়িয়ে বীরসা ঘোষণা করেন সংগ্রামী মিশন—উলগুলান। এটিই ছিল দীক্ষাদানের মন্ত্র। পুরাণক, নানক, প্রচারক নামে বিভক্ত ছিল তাঁর অনুবর্তীরা। ইংরেজদের প্রতীকরূপে কাটা হয়েছিল কলাগাছ। আদি রাজধানী নওরতনগড়ের কেল্লা দখল করা স্থির হল। মুণ্ডানিদেরও এর শরিক করা হল। বীরসাইত হলে মেয়েদের হাত ধরা যাবে না—নারীসুরক্ষার জন্য জারি ছিল নিয়ম। সকলের কণ্ঠ জাগরিত হয়েছিল বীরসার জয়গানে—‘ধরতিরে পুড়োই রাজা জয়।’
১৩০৬ বাংলা সনের (১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ) ৭ পৌষ উলগুলানের অগ্নুৎপাত শুরু হবে বলে ঠিক হয়। ৯ পৌষ সাহেবদের বড়োদিনের পার্টিতে তির চলে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে বত্রিশটি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের আগুন। ক্যাপ্টেন রোশের নেতৃত্বে ৮০ জন সৈন্য অভিযান চালিয়েও বীরসাকে ধরতে পারেনি।
৭ জানুয়ারি, ১৯০০। খুঁটি থানা আক্রমণ করে মুণ্ডারা। শৈলরাকাবের পাহাড়ে তারা আশ্রয় নেয়। মেয়েরাও পিঠে সন্তানকে বেঁধে সেদিন লড়াই করেছিল ।এ যেন জালালাবাদের সূর্যসেনের পূর্বপট। হতাহত নিয়ে সংবাদপত্রের মতান্তর ছিল কুড়ি থেকে চারশো পর্যন্ত। এদিকে বীরসা ফেরার।
তাঁর ধরা পড়াটা অনেকটা ভিঞ্চির আঁকা যিশুর ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবির কথা মনে করায়। বিশ্বাসঘাতক শিষ্য জুডাসের কাজটা করেছিল পরমী, যার সঙ্গে বীরসার আরান্দি বা বিয়ে হতে হতেও হয়নি। ৫০০ টাকার জন্য, কয়েকজনের সহায়তায় সেনত্রার জঙ্গলে পরমী ভাত রান্না করে ধোঁয়ার নিশান উড়িয়ে দেয় সে। তাতেই মুণ্ডাসিংহ পিঞ্জরাবদ্ধ হতে বাধ্য হন। তবে যিশুর মতো ক্ষমাসুন্দর হয়ে অনুগামীদের গ্রেফতারি এড়ানোর রাস্তাও বাতলে দেন—আমাকে না চিনে, না বুঝে উলগুলান করেছ, এই স্বীকারোক্তি দিও সকলে।
১ জুন বিচারালয়ে বীরসার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিচারব্যবস্থার অব্যবস্থার পাশাপাশি অপশক্তির দুর্দান্ত আস্ফালন বলে ধরা যেতেই পারে। বহু মুণ্ডার নানাবিধ শাস্তি হয়। একটি এক বছরের শিশুর একদিনের কারাদণ্ড প্রাপ্তিতে গা শিউরে ওঠে। সে কি সালীর কাছ থেকে দত্তক নেওয়া বীরসার পুত্র পরিবা? তার মধ্যে নিজের নাম থাকবে বলে ঘোষণা করেছিলেন বীরসা। 
আজ থেকে সিকিসহ শতাব্দী পূর্বে প্রায় তিনশো চাঁদ (মুণ্ডাগণনায় এক বছর বারো চাঁদের সমান) পার করা, বছর পঁচিশের বীরসা রক্তবমনের পর মহানির্বাণ লাভ করেন। ৯ জুন, ১৯০০। সকাল ন’টা। প্রাণের খাঁচা ভেঙে তাঁর আত্মা মুক্তি পেলে, শরীর থেকে জেলের শিকল খোলা হয়। ৫০০ জন মুণ্ডা তাঁকে বেড় দিলেও শনাক্ত করেনি। বেয়নেটের ঘা লাগা কপাল নিয়ে ভরমি মুণ্ডা রোদনসুরে, মন্ত্রগভীর স্বরে গান ধরেন— ‘হে ওতে দিসুম সিরজাও/নি’আলিয়া আনাসি/আলম আনদুলিয়া/আমা’রেগে ভরোসা/বিশ্বাস মেনা!’ পৃথিবীর প্রতি তাদের প্রার্থনা ব্যর্থ না করার, বিশ্বাস স্থাপনের এই আর্জি যেন ধরতি-আবা বীরসার সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে যায়। বিরক্ত রাঁচির জেলসুপার ডাক্তার আন্ডারসন ধৈর্য হারান। কারণ, তাঁর হাতেই ময়নাতদন্ত হওয়া, সেলাই করা দেহটা নিতে এসে ডোমরা বীরসাকে ভগবান বলে। বীরসা যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না শেষ। সুপারসাহেব রীতি মেনে সমাধি, বীরসার সহপাঠী তথা ডেপুটি সুপার অমূল্যর কথায় ভাই কনু মুণ্ডাকে দিয়ে মুখাগ্নি, এমনকি অমূল্য সহ বীরসাইতদের সৎকার দেখার অনুমতি পর্যন্ত দেননি। জেলের সিপাহিদের পাহারায় শিবন মেথররা তাঁর নশ্বর দেহটিকে শুকনো গোবরের চিতায় শুইয়ে দেয়। কিন্তু শিবন ও অন্ধকার অন্তরাল থেকে নিভন্ত চিতার সামনে আসা সালীর জন্যই হরমু নদীর জল পায় বীরসার অবিনশ্বর আত্মা। জঙ্গলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সালী এক মুঠো ছাই আঁচলে বেঁধে নেয়। 
তাঁদের সেই বিশ্বাস মূর্তরূপ ধারণ করেছিল পরবর্তীতে চাকরিত্যাগী অমূল্যর নোটবয়ের লেখা কথাগুলিতে —উলগুলানের শেষ নাই...বীরসার মরণ নাই...
বীরসার চিতার সামনে দাঁড়িয়ে ধরমু ক্ষমা চেয়ে যে কথাটি বলেছিল, সেখানেই ইতিহাসের পাতায় তাঁর চিরন্তন জয়পতাকা উড়েছিল—‘উলগুলানে, অনেক আগুন জ্বালিয়েছিল, আগুন ওরে চিনে। জ্বলছে কেমন দেখ।’
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ