দীপক বসু: ১৯৭৫ সাল। আইএফএ শিল্ড ফাইনাল। ট্রানজিস্টর প্রায় বুকে জড়িয়ে রেখেছেন এক বৃদ্ধ। ইস্ট বেঙ্গল গোল করতেই তাঁর চোখের কোণ চিকচিকে। প্রিয় ক্লাবই তাঁর বেঁচে থাকার অক্সিজেন। ইস্ট বেঙ্গল ও নিজের জীবনের মধ্যে কোনও একটা বেছে নিতে বললে কী করতেন তিনি? আমি নিশ্চিত, নিঃসন্দেহে লাল-হলুদকেই আঁকড়ে ধরতেন আমার বাবা শৈলেশ বসু। ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব প্রতিষ্ঠার অন্যতম কাণ্ডারি তিনি।
১ আগস্ট লাল-হলুদের প্রতিষ্ঠা দিবস। মশালের আলো শতবর্ষ পেরিয়েও তা আপন দ্যুতিতে ভাস্বর। লাল-হলুদ শুধু রং নয়। আমার মতো লক্ষ লক্ষ মানুষর বিশ্বাস, ভরসা, ভালোবাসা। ১৯২০ সালে ক্লাব প্রতিষ্ঠার সেই সন্ধ্যায় ফিরে তাকানো যাক। একটা বড় টেবিল ঘিরে গম্ভীর আলোচনায় মগ্ন কর্তারা। নতুন ক্লাবের নাম বাছাই নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা চলছে। টেবিলে তিনবার টোকা দিয়ে হঠাৎ বাবা বলে উঠেছিলেন, ‘আমাদের ক্লাবের নাম হোক ইস্ট বেঙ্গল।’ কালবিলম্ব না করে সম্মতি জানান বাকিরা। সুরেশবাবু, নসা সেন ও বাবার একটি দুষ্প্রাপ্য ফটোগ্রাফ বহুদিন আমাদের পরিবারে সংরক্ষিত ছিল। তা হারিয়ে যাওয়ার আপশোস আজও কুরে কুরে খায়।
ইস্ট বেঙ্গল পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা। লেক ভিউ রোডের বাড়িতে মাঝেমধ্যেই আসতেন কর্তারা। কাছেই যতীন দাস রোডে ছোট্ট চায়ের দোকান। মারকাটারি ইস্ট বেঙ্গল আড্ডায় ভেঙ্কটেশ, সালেদের দেখতে ভিড় জমে যেত। বড় ম্যাচ জিতলেই বাড়ির হেঁসেল ইলিশের গন্ধে ম-ম। চোখ বন্ধ করলে সেসব দিন ছবির মতো ভেসে ওঠে। ছয়ের দশকের কথা মনে পড়ছে। লিগের বড় ম্যাচের আগে কলকাতা জুড়ে টিকিটের হাহাকার। এদিকে, ম্যাচের আগের দিন টিকিটের অনুরোধ নিয়ে হাজির এক পরমাত্মীয়। শেষপর্যন্ত মুশকিল আসান হলেন আমার জ্যোতিষকাকু (জ্যোতিষ গুহ)। বাবাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন তিনি। দুরুদুরু বুকে বেশ রাতে তাঁর বাসভবনে উপস্থিত হয়েছিলাম। নিজে হাতে বান্ডিল থেকে টিকিট তুলে দিয়ছিলেন তিনি। ইস্ট বেঙ্গল কর্তাদের সঙ্গে আজও আমাদের পরিবারের সুসম্পর্ক অটুট। প্রতিষ্ঠা দিবসে ক্লাবে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান ওঁরা। শারীরিক কারণেই সবসময় তা সম্ভব হয় না। তবে বলতেই হয়, পরিকাঠামোয় আমার ইস্ট বেঙ্গল সবার সেরা। এবছরের দলগঠনেও বাড়তি যত্ন নেওয়া হয়েছে। প্রিয় দলের সাফল্য নিয়ে আমার মতো প্রবীণও বেশ আশাবাদী।
লেখক শৈলেশ বসুর পুত্র