Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

অস্ত্রের বিষ ঢুকছে লড়াইয়ে হারা মোরগের শরীরে, মাংস খেলে হতে পারে ক্যান্সারও

অস্ত্রের বিষ ঢুকছে লড়াইয়ে হারা মোরগের শরীরে, মাংস খেলে হতে পারে ক্যান্সারও
  • ২৭ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সংবাদদাতা, পুরুলিয়া: শীতের শুরুতেই ‘পাহুড়’ মাংস খেতে ভালোবাসেন? লড়াইয়ে হেরে যাওয়া ওই পাহুড় মাংস খেতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনছেন না তো? লড়াইয়ের সময় আঘাত লেগে শরীরে বিষ ঢুকে যাওয়া ওই মাংস খেতে বারণ করছেন চিকিৎসকরা। বিষাক্ত ওই মাংস খেতে থাকলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Advertisement
শীতের শুরুতে পুরুলিয়া জেলার গ্রামে গ্রামে চলছে মোরগ লড়াই। শীতের মরশুমে বেশি হলেও প্রায় সারা বছর ধরেই কমবেশি চলে মোরগ লড়াই। লড়াইয়ে হেরে যাওয়া মোরগের মাংস পুরুলিয়াতে পাহুড় মাংস নামে পরিচিত। কয়েক বছর আগেও জয়ী মোরগের মালিক হেরে যাওয়া পাহুড় বাড়ি নিয়ে যেতেন। আত্মীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে আয়েস করে সেই পাহুড় মাংস খেতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে লড়াইয়ের ময়দান থেকেই পাহুড় মাংস বিক্রি করে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অধিকাংশ জায়গাতে ওই মাংস বিষাক্ত হয়ে থাকছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 
মোরগ লড়াইয়ের সময় দুটি মোরগের পায়ে ‘কাইত’ বা ছোট ধারালো অস্ত্র বেঁধে দেওয়া হয়। ওই অস্ত্রে বিষ প্রয়োগ মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বেড়ে গিয়েছে বলে জানাচ্ছেন মোরগ লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কমিটির সদস্যরা। মোরগের পায়ের অস্ত্র তৈরির কাজ করেন বান্দোয়ানের বাসিন্দা এমন এক ব্যক্তি জানান, বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাইতে বিষ লাগানো থাকছে। বেশ কিছুদিন ধরে ওই বিষ তৈরি করতে হয়। তিনি আরও বলেন, সাধারণভাবে পাওয়া যায় এমন কিছু জিনিস দিয়েই তা তৈরি করা হয়। মোবিল এবং কার্বলিক অ্যাসিডের মিশ্রণে চামচিকা, গিরগিটি, টিকটিকি, মাকড়সা, বিছে ফেলে দিয়ে তা উনুনে হালকা গরম করা হয়। তারপর প্রায় তিন মাস ধরে ওই মিশ্রণ হালকা রোদে রাখা হয়। তারপর কাইত বা অস্ত্র গরম করে তৈরি করার পর মিশ্রণে তা দু’ বার চুবিয়ে দেওয়া হয়। তাতেই বিষাক্ত ওই অস্ত্র তৈরি হয়। এরকমই অস্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দা এক যুবক জানান,  শহরের দশকর্মা ভাণ্ডার এবং কিছু দোকান থেকে সহজেই ওই সমস্ত জিনিস কেনা যায়। তুঁতে বা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, বারুদ, অ্যাসিড, রস সিঁদুর, আফিম, নিমতেল দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। অস্ত্র তৈরির পর তা ওই মিশ্রণে চুবনো হয়। তাতেই তা ভয়ানক বিষাক্ত হয়ে যায়। ওই বিষাক্ত অস্ত্র মোরগের শরীরে ঢুকে যাওয়ার পর প্রচণ্ড জ্বালা করে। তাতেই লড়াইয়ের ময়দান থেকে ছুটে পালিয়ে যায় মোরগ। জখম হওয়া মোরগটি পালিয়ে যেতে অন্য মোরগকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। ওই বিষাক্ত অস্ত্র মোরগের শরীরে ঢোকার পর একদিকে যেমন মোরগের শরীরের ওই অংশে পচন ধরতে শুরু করে। কখনও আবার সারা শরীর নীলাভ হয়ে গিয়ে মরে যায় মোরগটি। শরীরে বিষ ঢুকে থাকা ওই মোরগ মাংস খেলে পেটের রোগের পাশাপাশি মারণ রোগের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বান্দোয়ানের এএন ঝাঁ হাই স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক সাজিতব্য মাহাত বলেন, বিষক্রিয়া হওয়া এ ধরনের মাংস খেলে পেটের রোগের পাশাপাশি স্নায়ুর সমস্যা দেখা দিতে পারে। ক্যান্সারের মতো মারণ রোগের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। ওই বিষ তৈরির জন্য যে সমস্ত জিনিস ব্যবহার করা হয় তা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। মোরগ লড়াইয়ের ওই অস্ত্রে বিষ প্রয়োগ অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। 
পুরুলিয়া দেবেন মাহাত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক পবন মণ্ডল বলেন, এ ধরনের বিষাক্ত মাংস খেলে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। জেলা বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদক চিকিৎসক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, রান্না করার সময়ে বিষের পরিমাণ খানিকটা কমলেও ওই রকম মাংস খেলে পেটের সমস্যা থেকে শুরু করে শরীরের অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায় ওই বিষাক্ত অস্ত্রে মোরগ মালিকও জখম হয়েছেন। একদিকে যেমন ওই অস্ত্রে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, তেমনই আবার যে অংশে আঘাত লাগে সেখানে পচন ধরার মতো ঘটনাও দেখা গিয়েছে। 
সম্পর্কিত সংবাদ