সারা পৃথিবী জানে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন একজন ‘মার্কেন্টিলিস্ট’। আর তিনিই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। ‘মার্কেন্টিলিজম’ কাকে বলে? এটা হল সেই বিশেষ অর্থনৈতিক তত্ত্ব, যেটা শুধু নিজ দেশের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যেই মোক্ষলাভের শিক্ষা দেয়। বাণিজ্যে বাকি সব দেশকে দশ গোল দিয়ে নিজ দেশের সম্পদ এবং শক্তি বৃদ্ধিই এই তত্ত্বের নিহিত দর্শন। ষোড়শ-অষ্টাদশ শতকে গোটা ইউরোপ এই তত্ত্বের নিবিড় অনুশীলন করেছিল। মার্কেন্টিলিস্ট নেতারা বিশ্বাস করেন যে, ‘ফেভারেবল ব্যালান্স অফ ট্রেড’ থেকে দেশের স্বর্ণ ও রৌপ্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাহাত্ম্য হল ‘জিরো সাম গেম’—অর্থাৎ আমার মুনাফা মানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোকসান—সোজা কথায় অন্যের ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে আমাকে লাভবান হতে হবে। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের আরও বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ শিল্প-বাণিজ্য রক্ষার স্বার্থে সরকারি ‘রেগুলেশন’ জারি থাকবে এবং আমদানির সামনে খাড়া করে রাখতে হবে ‘রেস্ট্রিকশন’। মার্কেন্টিলিস্ট পলিসিতে বৈদেশিক পণ্যের উপর অধিক শুল্ক এবং দেশীয় পণ্যের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ হয়। মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি শ্রমিকের অভিবাসন সংকোচনও এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একসময় ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস এই নীতির চূড়ান্ত অনুশীলন করেছে। মার্কেন্টিলিজম যে সব ক্ষেত্রে সুফলদায়ক হয় না তার প্রমাণ স্পেন। এজন্য সে-দেশের বস্ত্রবয়ন শিল্পকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল, এমনকী মন্বন্তরও নেমে এসেছিল একটা সময়।
Advertisement
বহু বছর বাদে, মার্কিন মুলুকে এই অর্থনৈতিক জাতীয়বাদের চাষ চান ট্রাম্প। প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিসকে পরাস্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় দ্বিতীয়বার অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য ট্রাম্প তাঁর দেশবাসীকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’! কীভাবে? ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁদের শিল্প-কারখানাগুলিকে আমেরিকাতেই ফেরাবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মার্কিন শিল্প কলকারখানাগুলিকে সে-দেশের ভিতরেই নির্মাণের জন্য তিনি লোভনীয় ইনসেনটিভ দেবেন। তাতে চীন, ভারতসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাবে। যদি ব্যবসাগুলি এখনও বিদেশে তাদের কারখানা তৈরি করতে চায় তবে ট্রাম্প প্রশাসন প্রযুক্তি রপ্তানির উপরও বিধিনিষেধ আরোপ করবে। তেল এবং ওষুধ শিল্পের উপরেও একচ্ছত্র রাশ চায় নয়া যুক্তরাষ্ট্র। ‘অবৈধ’ অভিবাসন নিয়েও ট্রাম্প বরাবরই খড়্গহস্ত। আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব থেকে অপরাধ, মাদকের উৎপাতসহ যাবতীয় খারাপ ব্যাপারের জন্য তিনি এই সমস্যাকেই দায়ী করে থাকেন। দেশশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই ১০ লক্ষ ‘অবৈধ’ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খেদানোও ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি! তিনি সেইমতো পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন। তার প্রাথমিক আঁচ ভারতীয় অভিবাসীদের গায়ে পড়েছে। ভারত ‘উদ্বাহু’ হয়ে তা মেনেও নিয়েছে! তবে এর শেষ কোথায় তা এখনও অজানা।
কিন্তু তাতেও যে মার্কিন মুলুকের ‘অধীশ্বরকে’ খুশি রাখা সম্ভব হবে না, তা সংশ্লিষ্ট মহল বেশ বুঝতে পারছিল। গরিব এবং উন্নয়নশীল ‘বন্ধু’ দেশগুলিকে মার্কিন কোষাগার থেকে যাবতীয় দানখয়রাতিও বন্ধ
করতে তৎপর হয়েছেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যেই এই নীতির অন্যতম বলি ভারতও। জলবায়ু সংকট বলে কিছু যে আছে, তাও তিনি মানেন না। এই বাবদ কানাকড়িও খরচ করার পক্ষপাতী তিনি নন। এই যে রাষ্ট্রনায়কের নীতি, ধ্যানজ্ঞান তাঁর সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্ব করতে গিয়েছেন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ‘হাউডি মোদি’ থেকে ‘নমস্তে ট্রাম্প’... ‘বন্ধুত্বে’র সব ঝলমলে বিজ্ঞাপনই এখন ব্যুমেরাং হওয়ার পথে। গোটা দুনিয়া দেখছে, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরতেই বন্ধুত্বের সেই বুলি উধাও। মার্কিন পণ্যের উপর চড়া শুল্ক আরোপের জন্য ট্রাম্প ভারতের উপর বরাবরই ক্ষুব্ধ। এমনকী ভারতকে ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ বলেও অভিযুক্ত করেন তিনি। ট্রাম্প যে তাঁর জায়গা থেকে একচুলও সরতে রাজি নন, তা তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন এই দফায় মোদির প্রথম আমেরিকা সফরে। কার্যত মোদির মুখে ঝামাই ঘষে দিয়েছেন ‘বন্ধু’ ট্রাম্প স্বয়ং। মার্কিন মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের দাবি, মোদির সঙ্গে বৈঠক চলাকালে পাল্টা শুল্ক আরোপ ইস্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমার সঙ্গে কোনও তর্ক নয়!’ বণিক মহলের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ভারত আগামী দিনে আর্থিকভাবে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে। ‘ম্যাগা’ নীতি আমাদের এই গ্রহকে কোনোভাবেই ভালো, নিরাপদ কিংবা সমৃদ্ধ করবে না। এই নীতি কেবলই আমেরিকার স্বার্থে। সেখানে আলগা বন্ধুত্বের কোনও জায়গা নেই। মার্কিন প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব পেতে হলে ভারতকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং সমকক্ষ হতে হবে। ‘বড়োর পিরিতি বালির বাঁধ’ মাত্র—মোদিরা এই সত্য কবে বুঝবেন?
কিন্তু তাতেও যে মার্কিন মুলুকের ‘অধীশ্বরকে’ খুশি রাখা সম্ভব হবে না, তা সংশ্লিষ্ট মহল বেশ বুঝতে পারছিল। গরিব এবং উন্নয়নশীল ‘বন্ধু’ দেশগুলিকে মার্কিন কোষাগার থেকে যাবতীয় দানখয়রাতিও বন্ধ
করতে তৎপর হয়েছেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যেই এই নীতির অন্যতম বলি ভারতও। জলবায়ু সংকট বলে কিছু যে আছে, তাও তিনি মানেন না। এই বাবদ কানাকড়িও খরচ করার পক্ষপাতী তিনি নন। এই যে রাষ্ট্রনায়কের নীতি, ধ্যানজ্ঞান তাঁর সঙ্গে আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্ব করতে গিয়েছেন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ‘হাউডি মোদি’ থেকে ‘নমস্তে ট্রাম্প’... ‘বন্ধুত্বে’র সব ঝলমলে বিজ্ঞাপনই এখন ব্যুমেরাং হওয়ার পথে। গোটা দুনিয়া দেখছে, ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরতেই বন্ধুত্বের সেই বুলি উধাও। মার্কিন পণ্যের উপর চড়া শুল্ক আরোপের জন্য ট্রাম্প ভারতের উপর বরাবরই ক্ষুব্ধ। এমনকী ভারতকে ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ বলেও অভিযুক্ত করেন তিনি। ট্রাম্প যে তাঁর জায়গা থেকে একচুলও সরতে রাজি নন, তা তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন এই দফায় মোদির প্রথম আমেরিকা সফরে। কার্যত মোদির মুখে ঝামাই ঘষে দিয়েছেন ‘বন্ধু’ ট্রাম্প স্বয়ং। মার্কিন মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের দাবি, মোদির সঙ্গে বৈঠক চলাকালে পাল্টা শুল্ক আরোপ ইস্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমার সঙ্গে কোনও তর্ক নয়!’ বণিক মহলের আশঙ্কা, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ভারত আগামী দিনে আর্থিকভাবে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে। ‘ম্যাগা’ নীতি আমাদের এই গ্রহকে কোনোভাবেই ভালো, নিরাপদ কিংবা সমৃদ্ধ করবে না। এই নীতি কেবলই আমেরিকার স্বার্থে। সেখানে আলগা বন্ধুত্বের কোনও জায়গা নেই। মার্কিন প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব পেতে হলে ভারতকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং সমকক্ষ হতে হবে। ‘বড়োর পিরিতি বালির বাঁধ’ মাত্র—মোদিরা এই সত্য কবে বুঝবেন?


