নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অপারেশন লোটাস—গত কয়েক বছরে দেশের রাজনীতিতে বারবার শোনা গিয়েছে এই দু’টি শব্দ। যার অর্থ আদতে, অন্য দলের জনপ্রতিনিধিদের বিজেপিতে টেনে আনা! বাংলায় পালাবদলের পর এবার কলকাতা পুরসভায় সেই ‘অপারেশন’ স্রেফ সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তৃণমূল সূত্রে খবর, কলকাতা পুরসভার অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন কাউন্সিলার ইতিমধ্যে গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে নানাভাবে ‘যোগসূত্র’ তৈরি করে ফেলেছেন। যে কোনোদিন তাঁরা ‘রং’ বদলে যেতে পারে!
৪ মে’র পর কলকাতা পুরসভার মেয়র, মেয়র পারিষদ, কাউন্সিলারদের নিয়ে বৈঠক করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে একাধিক ‘হেভিওয়েট’ কাউন্সিলার অনুপস্থিত ছিলেন। মেয়র পারিষদদের মধ্যে তারক সিং, দেবাশিস কুমার, জীবন সাহা যাননি কালীঘাটের বৈঠকে। গরহাজির কাউন্সিলারদের তালিকাটা আরও লম্বা। রাজনৈতিক মহলের খবর, দলনেত্রীর ডাকা বৈঠকে গরহাজির কাউন্সিলারদের একটা বড়ো অংশ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিজেপিতে যেতে মুখিয়ে রয়েছে। সংখ্যাটা প্রায় আধা শতক।
কয়েকদিন আগে পুরসভার মাসিক অধিবেশন নিয়ে চূড়ান্ত বিতর্ক হয়। সেই আবহে বিজেপি কাউন্সিলার তথা বরানগরের বিধায়ক সজল ঘোষ দাবি করেন, ‘দরজা একটু খুলে দিলেই পুরসভায় আর তৃণমূলের বোর্ড থাকবে না। বিজেপিতে আসার লাইন পড়ে যাবে।’ তাঁর সেই দাবি যে খুব একটা অমূলক নয়, তা টের পাওয়া যাচ্ছে সদ্যপ্রাক্তন শাসক দলের অন্দরে কান পাতলেই। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পরপরই শ্যামপুকুর অঞ্চলের দুই কাউন্সিলার ইলোরা সাহা এবং সুনন্দা সরকারের ‘ভেলকি’ সবার নজর কাড়ে। উত্তর কলকাতা তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত অভিভাবক সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেই চাঁচাছোলা ভাষায় গালাগালি করেন একাধিক তৃণমূল কাউন্সিলার। তাছাড়া, উল্টোডাঙা অঞ্চলের কাউন্সিলার অনিন্দ্যকিশোর রাউতের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে সজল ঘোষের উপস্থিতি বিতর্ক তৈরি করে। সেটি ছিল সিটি কলেজের প্রাক্তনীদের সভা। সেখানে সজল ঘোষকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রুবি, কসবা অঞ্চলের এক কাউন্সিলারও বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে খবর। বাইপাসের ধারের একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলার আবার নিজের পুরানো ‘আরএসএস কানেকশন’ ঝালিয়ে নিচ্ছেন। বেহালার দুই বিধানসভা এলাকায় সম্ভাব্য দলবদলু কাউন্সিলারের তালিকা আরও দীর্ঘ।
এখনই তাঁরা কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। তবে বেহালা অঞ্চলের বর্ষীয়ান কাউন্সিলার তারক সিং রীতিমতো ফুঁসছেন। মঙ্গলবারও কালীঘাটে কলকাতার মেয়র, চেয়ারপার্সন, মেয়র পারিষদদের বৈঠকে ডেকেছিলেন মমতা। সেখানে না গিয়ে তারক সিংয়ের স্পষ্ট জবাব, ‘কী করব ওখানে গিয়ে! পুরসভায় কোনো কাজ করা যাচ্ছে না। মিটিং করে কী হবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন অত্যাচারিত হচ্ছি, তখন দলের একজনও ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে না। উনি (মমতা) ঘরে বসে রয়েছেন। আর কর্মীরা রাস্তায় মার খাচ্ছে। আমাদের নিজেদের প্রোটেকশন যদি নিজেদেরকেই নিতে হয়, তাহলে কালীঘাটে যাব কেন!’
এদিকে, এদিন কালীঘাটে বৈঠকে না গিয়ে এন্টালির বিধায়ক তথা ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার সন্দীপন সাহা চলে যান বিধানসভায়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ সেরে নেন। এনিয়েও যথারীতি গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
এই আবহে সম্প্রতি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, সময় হলেই ‘দরজা’ খুলে দেওয়া হবে! চলতি বছরের শেষে কলকাতা পুরসভার নির্বাচন। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, তার আগেই সম্পন্ন হতে পারে ‘অপারেশন লোটাস’।