Bartaman Logo
৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ছুটিতে উটি

উটি বেড়াতে গিয়ে নীলগিরি পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও গোলাপ বাগান দেখা হলো। উটির বিশেষত্ব ও ভ্রমণ পরিকল্পনা জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

ছুটিতে উটি
  • ৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

কীভাবে যাবেন 
উটির সবচেয়ে কাছের শহর কোয়েম্বাতুর। এখান থেকে উটির দূরত্ব ৮৬ কিমি। বিমানে ওই অবধি গিয়ে বাকি রাস্তা গাড়িতে যেতে পারেন। আবার রেলপথে আসতে চাইলে তাও সম্ভব। সেক্ষেত্রে হাওড়া/ শিয়ালদহ থেকে কোয়েম্বাতুর বা মাইসুরু অবধি বেশ কিছু ট্রেন চলে। মাইসুরু থেকে ১২৫ কিমি দূরে উটি। সেখানে নেমেও গাড়িতে যাওয়া যায়। থাকার জন্য সারা উটি জুড়েই রয়েছে নানা রিসর্ট, বিলাসবহুল হোটেল, ছোটো বড়ো নানা হোমস্টে ও তামিলনাড়ু সরকারের বাংলো।

Advertisement

 

 

একদিন খাবার টেবিলে বললাম, ‘চলো এবার বরং উধগমণ্ডলম ঘুরে আসি!’ বেড়াতে যাওয়ার গন্ধ পেলেই আমার একটু বেশি ন্যাওটা হয়ে ওঠা যার স্বভাব, সেই তুতো বোন দেখি, হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে আছে। নিষ্পাপ অপমানের সুযোগ পেয়েছি, কেউ ছাড়ে! তাই সদ্ব্যবহার করে বললাম, ‘আজকাল কলেজে তো লেখাপড়া কিস্যু হয় না, বছরে সাত মাসই ছুটি। তাই বুঝতেও পারলি না।’ আমাদের টাগ অব ওয়ারের মাঝেই ততক্ষণে বাড়ির লোকজন জেনে গিয়েছে, এবার আমাদের গন্তব্য নীলগিরি পাহাড়ের রানির দেশ, উটি! যার আগে নাম ছিল উধগমণ্ডলম। উৎসাহের চোটে ছড়াও তৈরি হয়ে গেল মুখে মুখে! ‘দিন চারেকের ছোট্ট ছুটি/ চালাও পানসি, যাচ্ছি উটি!’   
পানসিতে যদিও যাওয়া সম্ভব নয়, তাই বিমানপথেই শুরু হল যাত্রা। যাত্রী আমরা দু’টি পরিবার। হাফ বড়ো হওয়া কলেজছাত্রীটিকে ধরে মোট ৬ জন। দক্ষিণ ভারতের এই শৈলশহর, তামিলনাড়ু রাজ্যে অবস্থিত। আমাদের দার্জিলিঙের চেয়েও বেশ কিছুটা উঁচুতে হওয়ায় এই শহরে সারা বছরই বেশ ঠান্ডা থাকে। আমরা গিয়েছি কোনো এক এপ্রিল মাসে। এমনিতে বর্ষার পরেও এই শহর আদ্যন্ত সুন্দরী। তবে বেছে বেছে এপ্রিলে আসার কারণ পরে বলছি। কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের দূরত্ব পেরিয়ে আমাদের বিমান যখন কোয়েম্বাতুর বিমানবন্দরের রানওয়ে ছুঁয়েছে ঘড়িতে তখন বেলা সাড়ে বারোটা। তারপর হোটেল থেকেই পাঠানো গাড়িতে চেপে বাকিটা যাওয়া। ও বাবা, সে চলছি তো চলছিই। পথ আর ফুরয় না! অবশ্য না ফুরলেও এই পথ বিমান সফরের সবটুকু ক্লান্তি শুষে নিতে পারে। মাখনের মতো রাস্তা আর সঙ্গে দোসর ঠান্ডা বাতাস। শহরাঞ্চল পেরতেই নীলগিরি পাহাড়ের দেখা মেলে হঠাৎ হঠাৎ। হ্রদ, পাহাড় ও চা বাগানের শহর উটি। দু’চোখ ভরে নীলচে সবুজ দেখতে দেখতে ঘণ্টা তিনেক পর হোটেলে এসে পৌঁছলাম। ঘড়ি বলছে সময় প্রায় ৪টে। সেদিন আর বিশেষ কিছু করার নেই। হোটেলে ঢুকতেই দুর্দান্ত খাবার ও আতিথেয়তায় জায়গাটাকে বেশ আপন বলেই মনে হল। উটি বেড়ানো শুরু হল ঠিক তার পরের দিন থেকে। ছোটোবেলায় পড়েছিলাম, নীলগিরি পর্বতে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দোদাবেতা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৬৫২ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই শৃঙ্গ। প্রথমেই ঠিক করলাম, যখন নীলগিরির দেশেই এলাম, তখন তার সবচেয়ে উঁচু জায়গাটুকুই আগে প্রাণ ভরে দেখি। আমাদের চালকও দেখলাম এই প্রস্তাবে সহমত হলেন। হোটেল থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে রওনা দিলাম দোদাবেতা পিক দেখতে। টেলিস্কোপ হাউস থেকে দোদাবেতাকে দেখে মনে হল, এমন নীলচে আভার পাহাড় দর্শন আগে কেন হয়নি! এই পয়েন্ট থেকে সম্পূর্ণ উটি শহরটাকেও দেখা যায়। মানুষের চোখই তখন ড্রোন! এসব দৃশ্যের সামনে এলে বোঝা যায়, কেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ক্যামেরার চেয়েও শক্তিশালী মানুষের দুটো চোখ! এমন মনোমুগ্ধকর দোদাবেতা আজীবন মনে রাখার মতো। এখান থেকে গাড়িতে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্বেই রয়েছে টি ফ্যাক্টরি ভিউ পয়েন্ট। সোজা কথায় চায়ের মিউজিয়াম। চা বাগানের গা গেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এই মিউজিয়াম। তবে যদি যে কোনো সাদামাঠা পথেও অ্যাডভেঞ্চারাস হওয়া আপনার মজ্জাগত হয়, তাহলে বলব, প্রথমে বরং রোপওয়ের সাহায্য নিয়ে একবার আকাশপথে দেখে নিন এই চা বাগান। তারপর চা বাগানেরই টি সেন্টার থেকে চা খেয়ে পায়ে হেঁটে চলে আসুন বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে। এখানকার পাইন ফরেস্ট, হোম মেড চকোলেট ফ্যাক্টরি, স্টোন হাউজ সবকিছু দেখতেই মাথাপিছু আলাদা আলাদা টিকিট কাটতে হয়। সঙ্গে ক্যামেরা থাকলে তার জন্যও আলাদা টিকিট কাটতে হবে। তবে মোবাইলে ছবি তোলার জন্য আলাদা করে কোনো চার্জ নেই। বিখ্যাত বলিউড ছবি ‘আন্দাজ আপনা আপনা’-র কিছুটা অংশ শ্যুট হয়েছিল এই বোটানিক্যাল গার্ডেনেই।
এসব দেখে বেরিয়ে এবারের গন্তব্য রোজ গার্ডেন! ঠিক এই কারণেই এপ্রিল মাসে উটি আসা আমাদের। সাধারণত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর হল উটি বেড়াতে আসার পিক টাইম। তবে যদি চান কাশ্মীরের গোলাপ বাগিচার মতো একখানা আস্ত স্বপ্নের গোলাপবাগ দেখবেন, তাহলে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে উটি প্ল্যান করে ফেলুন। এখানে প্রায় ৪০০০ প্রজাতির গোলাপ আপনাকে মুগ্ধ করবে! সাজানো গোছানো গোলাপ বাগান ছেড়ে প্রায় কারও বেরতে ইচ্ছে করছিল না। বেরতে হল চালকের তাড়ায়। তিনি জানালেন এবার লাঞ্চ না সারলে উটি লেকে বোটিং করার সময় পেরিয়ে যাবে। তাঁরই পরামর্শে পথের ধারে একটা ঝাঁ চকচকে রেস্তরাঁয় লাঞ্চ সেরে আমরা এগলাম উটি লেকের উদ্দেশ্যে। এখানে ৩০০-১০০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন রকমের বোট ভাড়া করা যায়। ৩০ মিনিটের জন্য বাজেট বুঝে পছন্দের বোট নিতে পারেন। তবে এখানে একটি ট্যুইস্ট আছে। বোটে ওঠার আগে বোটভাড়ার সমপরিমাণ টাকা কাউন্টারে জমা রাখতে হয় সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে। সময়ের মধ্যে ফিরে এলে ও বোটের কোনো ক্ষতি না হলে জমা টাকা কাউন্টার থেকে ফেরত দেওয়া হয়। বোটিং সেরে ফিরে এলাম হোটেলে। ফেরার পথেই দেখে নিলাম মুরুগান মন্দির এলখিল। মন্দির চত্বরে মুরুগানের বিশাল স্ট্যাচু রয়েছে। চারদিকে পাহাড় ও বড়ো বড়ো পাইন গাছের বনে ঢাকা এই মন্দিরের কারুকাজ দেখলে চোখের আরাম হয়। প্রতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে মুরুগানকে কেন্দ্র করে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়। সারাদিনের একটা দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। 
পরের দিন সকালে ঝকঝকে রোদ দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল। কারণ আজ আমরা এমন জায়গায় যাব, মেঘ করলে সেই জায়গার আসল সৌন্দর্য ঠিক বোঝা যাবে না। এমনিতে পাহাড়ি অঞ্চলে মেঘ-রোদ্দুরের খেলা চলেই। তবে নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চলে দিনটা রোদ্দুর দিয়ে শুরু হলে, বোঝা যায়, গোটা দিন মোটের উপর নিরুপদ্রব কাটবে। হোটেল থেকে ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম সিক্সথ মাইল-এর দিকে। সবুজ পাহাড় ও জলপ্রপাত ঘেরা সিক্সথ মাইল রোদে আরও ঝলমলে দেখাচ্ছিল। এর অনতিদূরেই নাইনথ মাইল। দুটো জায়গা ঘুরতে ঘুরতেই মনে পড়ে যাচ্ছিল ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘বরফি’, ‘আজব প্রেম কি গজব কহানি’-র মতো আরও কিছু হিন্দি ছবির কথা। এসব ছবির সৌজন্যে আমরা এই সিক্সথ মাইল, নাইনথ মাইলকে পর্দায় দেখেছি বহুবার! 
ছবির মতো সুন্দর শহর উটির অন্যতম সেরা স্পটটিকে আমরা রেখেছিলাম সর্বশেষ আকর্ষণ হিসেবে। শহরের মাঝে মোহময়ী পাইকারা লেক। নাইনথ মাইল থেকে গাড়িতে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। হ্রদের জলে এসে পড়েছে তার পাশ ঘেঁষে উঠে যাওয়া পাহাড়ি বনরাজির ছায়া। এখানে বোটিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও বেশি ভিড় হর্স রাইডিংয়ে। এর পাশেই পাইকারা ফলস। লেকের মাঝে চওড়া খাতে ধাপে ধাপে নেমে আসছে জলরাশি। বর্ষার পর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে উটি গেলে এই জলধারা আরও উন্মত্ত আকারে ধরা দেয়। মূলত পাইকারা নদীকে কেন্দ্র করেই লেক ও ফলস তৈরি হয়েছে। এরপর লাঞ্চ সেরে চললাম নিজের হাতে চকোলেট বানানো শিখতে। উটির বিখ্যাত চকোলেট ফ্যাক্টরিতে এই সুযোগ রয়েছে। ফ্যাক্টরিটি সুসজ্জিত ও  বেশ বড় এলাকা জুড়ে। ঘুরে দেখতে ও নানা ধরনের চকোলেটের স্বাদ নিতে গেলে হাতে কিছুটা সময় রাখা দরকার। এখানকার চকোলেটের স্বাদ বাজার চলতি চকোলেটগুলির থেকে এক্কেবারে আলাদা। নিজের হাতে চকোলেট বানিয়ে সেই চকোলেটের স্বাদ যেমন নিতে পারবেন, তেমনই এখান থেকেও কিনতে পারবেন মনের মতো চকোলেট। কোকো, মিল্ক ইত্যাদি নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি চকোলেট কিনে নিলাম টোকেন গিফটের জন্য। ফেরার পথে উটির বিখ্যাত তিব্বতি মার্কেট থেকে শীতের পোশাক কিনতে পারেন, দামেও সস্তা। সেদিন রাতেই উটিতে আমাদের শেষ রাত। তাই দুর্দান্ত ডিনারের আয়োজন করেছিলেন হোটেল কর্তৃপক্ষ। পরের দিন সকালে তাঁদেরই ঠিক করে দেওয়া গাড়িতে সোজা বিমানবন্দর! 
বিমানে গেলে যাতায়াত মিলিয়ে দিন চারেকেই উটি ভ্রমণ সম্ভব। তবে যাঁরা একটু বাজেট ফ্রেন্ডলি উপায়ে ঘুরতে চান, তাঁরা গাড়ি ছাড়াও ভরসা করতে পারেন ভাড়ার ট্যাক্সি অথবা প্রাইভেট ট্যুরিস্ট বাসের উপর। স্থানীয় অনেক ট্যুর অপারেটরই এমন বাস বা ট্যাক্সি ভাড়া দেন। উটি গিয়েও যোগাযোগ করে নিতে পারেন। আরও একটি কথা উটি যাওয়ার আগে খেয়াল রাখতে হবে। উটি কিন্তু প্লাস্টিক বর্জিত শহর। তাই  প্লাস্টিকের জলের বোতল সব জায়গায় কিনতে পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে জল সঙ্গে রাখা ভালো। প্লাস্টিকের বোতলে পর্যটকরা জল নিতেই পারেন, শুধু সেই বোতল যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। বাইরে থেকে কাচের বোতলের জল কিনতে পারেন। তার দাম বেশ কিছুটা বেশি। তবে প্লাস্টিকবর্জিত বলেই বোধহয় উটির চারপাশে এতটুকু আবর্জনা নেই। ঝকঝকে রাস্তাতেও প্রায়ই সরকারি উদ্যোগে ঝাঁট পড়ছে। নিজেদের শহরকে সুন্দর করে রাখার নেপথ্যে এখানকার মানুষজনের সচেতনতাও চোখে পড়ার মতো। তাই বোধহয় একটি পাহাড়ি শহর এত নির্মল ও পটে আঁকা ছবির মতো সুন্দর হতে পারে! 
মনীষা মুখোপাধ্যায় 

সম্পর্কিত সংবাদ