সৌরভ ভট্টাচার্য, তেহট্ট: তেহট্ট-দেবগ্রাম রুটের বাসে উঠলে সাহেবের দেখা পেতে পারেন। সাহেবকে মনে আছে? ১৯৮১ সালের সুপারহিট বাংলা ছবি ‘সাহেব’-এ নায়ক বোনের বিয়ের টাকা জোগাড় করতে নিজের ফুটবল কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে কিডনি বিক্রি করেছিল। আর বাস্তবের সাহেব কলকাতার বড় বড় ক্লাবে নিয়মিত ফুটবল খেলেও ভাগ্যের পরিহাসে আজ বাসের কন্ডাকটর। পুরো নাম সাহেব আলি ঘরামি। যাঁরা ময়দানের নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা নামটি মনে করতে পারবেন। ফিলিপ ডি রাইডারের কোচিংয়ে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের ডিফেন্সে নিয়মিত ছিলেন সাহেব। তাঁকে রীতিমতো সমঝে খেলতেন বিপক্ষের বড় বড় স্ট্রাইকাররা। একটা চোটই তাঁর জীবন ওলটপালট করে দেয়। এখন কাঁধে টাকার ব্যাগ, হাতে টিকিটের বান্ডিল নিয়ে ভিড় বাসে টিকিট কাটেন। কখনও গেটে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে যাত্রী ডাকেন। একসময় ময়দানে যাঁর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হতেন দর্শক, আজ সেই সাহেব আলি ঘরামিই সংসার চালাতে বাসের কন্ডাকটর!
পলাশীপাড়ার পারকুলা গ্রামের এক দিনমজুর পরিবারে ১৯৮৫ সালে জন্ম সাহেব আলির। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তাঁর প্রতিভা নজরে আসে স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের। ২০০৪ সালে একটি টুর্নামেন্টে তাঁর খেলা দেখে তাঁদের ক্লাবে খেলতে ডাকেন সোনালি শিবিরের কর্তারা। সেই সূত্রেই কলকাতার ময়দানে পা রাখা। তবে তাঁর ফুটবল জীবনে সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ২০০৭ সালে। সুযোগ পান ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবে। লাল হলুদ জার্সি গায়ে কলকাতার ময়দানে নামার স্বপ্ন পূরণ হয় তাঁর। প্রায় তিন বছর ইস্ট বেঙ্গলে খেলেছেন। প্রথম বছরেই সাত-আটটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সুভাষ ভৌমিকের কোচিংয়ে। পরে ফিলিপ ডি রাইডারের আমলে নিয়মিত হন প্রথম একাদশে। এরপর দল বদলে মহামেডান স্পোর্টিংয়ে। তবে ২০১৩ সালে চোট পাওয়ায় আর কোনো বড় দলে সুযোগ হয়নি খেলার। এরপর তিনি পিয়ারলেস ক্লাবে ন’ বছর খেলার পর দেশের বাড়িতে ফিরে আসেন।
ফুটবল খেলেই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নের পাশাপাশি স্থায়ী চাকরির চেষ্টাও করেছিলেন সাহেব। ফুটবল খেলার সুবাদে ২০১০ সালে ওএনজিসির মতো সংস্থায় চাকরির সুযোগ এসেছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু ক্লাব না ছাড়ায় চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে সংসারের দায়িত্ব বাড়তে থাকে। স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের তাগিদে পেশাদার ফুটবল থেকে দূরে সরে যেতে হয় তাঁকে।
এখন কন্ডাকটরি করেও মন থেকে ফুটবলকে বিদায় জানাতে পারেননি। সময় পেলেই স্থানীয় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ‘খেপ’ খেলতে নামেন। নিজের ক্লাবকে চ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্ন এখনও দেখেন। ফুটবলই যেন তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়, যা শেষ হয়েও শেষ হয়নি। সাহেব আলির কথায়, এখন আর নিয়মিত ফুটবল খেলার সুযোগ পাই না। তবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খেলতে যাই। বড় দলে খেলার সময় যে আনন্দ পেতাম, এখন আর সেই সুযোগ নেই। অর্থের অভাবে অনেক সময় নিজের গ্রামেও খেলা দেখতে যেতে পারি না। সংসারের তাগিদে ফুটবল ছেড়ে অন্য কাজ করতে হচ্ছে। একসময় যাঁর পায়ের কাজ আর দক্ষতা প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগকে চাপে রাখত, আজ তাঁর জীবনের গোলপোস্ট বদলে গিয়েছে। মাঠের বদলে বাস, ফুটবলের বদলে টিকিটের বান্ডিল, স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি দর্শকের বদলে প্রতিদিনের বাসযাত্রী। তবু সুযোগ পেলেই এখনও পায়ে বল তুলে নেন সাহেব। কারণ পেশা বদলেছে, জীবন বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসাটা বদলায়নি। ময়দানের আলো থেকে জীবিকার অন্ধকার গলিতে চলে আসা সাহেব আজও ফুটবলকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন।