সকালে হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি ঝলমলে সূর্যকিরণ জয়সলমীর দুর্গটিকে সোনায় মুড়ে দিয়েছে। কেল্লার দিকে দৃষ্টি রেখে গাড়িতে উঠলাম। মরুভূমিতে প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যসম্ভারের খামতি নেই। বালির পাহাড়ে ঝলমলে সূর্যের আলো। রাস্তার ধারে সর্ষের খেতে হলুদ ফুলের রমরমা। গাছের নীচে ময়ূরের পেখম মেলে বসে থাকা। ইতিউতি কালো কালো মুখ নিয়ে ভেড়াদের কাঁটা গাছের কচিপাতা চিবিয়ে চলা। দু’একটা উটের চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা— এসব দেখে চলেছি, এমন সময় মুকেশ (ড্রাইভারের নাম) বলে, ওই দেখুন কুলধারা গ্রামের ধ্বংসস্তূপ। তাকিয়ে দেখি সত্যিই তো ঘরবাড়ির ভাঙা ভাঙা প্রাচীর। সামনে একটি গেটে লেখা আছে ‘কুলধারা হন্টেড ভিলেজ’। ড্রাইভারের কাছে শুনলাম অনেককাল আগে এটি পালি ব্রাহ্মণদের সমৃদ্ধ গ্রাম ছিল। এই গ্রামের একটি বারো বছরের সুন্দরী বালিকা রাজমন্ত্রীর নজরে পড়ে যায়। গ্রামের মোড়লকে খবর পাঠায় মন্ত্রী যে, মেয়েটিকে তার মহলে পৌঁছে দিতে হবে। গ্রামের লোক জানায় আগামী কাল পাঠাবে। একরাতের মধ্যে গ্রামের লোক মেয়েটিকে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু মন্ত্রীর কোপ থেকে রেহাই মেলেনি। মেয়েটি মারা যায় এবং সেই মেয়েটির আত্মা আজও গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। কেউ বা বলে বালিকার বাবা অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, এই গ্রামে কেউ কোনওদিন বসবাস করতে পারবে না। জনশ্রুতি ব্রাহ্মণের অভিশাপে গ্রামটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।
গল্প শুনতে শুনতে গাড়ি ছুটে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পরে ড্রাইভার বলে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখুন দেবী মায়ের মন্দির। মন্দিরে পৌঁছতে দু’ঘন্টা লাগবে। আধঘন্টা সময় এসেছি এরমধ্যে চড়া রোদ গাড়িতে ঠিকরে পড়ছে। প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে অনেকটা পথ পিছনে ফেলে এলাম অথচ শুরু থেকেই পথের সঙ্গী হিসেবে সামনে পিছনে আর একটা গাড়িও চোখে পড়েনি। মনে মনে ভাবছি এরকম নির্জন জায়গায় গাড়ি খারাপ হলে সাহায্য পাব কোথায়!
রহস্যময় মরুর বুকে চিকন হলুদ বালির রাজত্ব। কিছুদূর অন্তর রাস্তার দু’পাশে সুদীর্ঘ পোলের মাথায় লম্বা লম্বা ফ্যানের ব্লেড ঘুরছে। জয়সলমীরে বাতাস-বাহিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা আছে জানতাম, কিন্তু এই প্রথম তা চাক্ষুষ করলাম। প্রায় ঘন্টা দুই পাড়ি দেওয়া হয়ে গিয়েছে। হাত পা ছাড়াতে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। বেশ সুন্দর জায়গা। বালির ঢিবির দিকে যেতে চাইলে ড্রাইভার বারণ করেন। বালির পাহাড়ে নাকি হারিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়!
প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ভারত-পাকিস্তান বর্ডারে অবস্থিত তনোট মাতার মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছলাম। ভিড় একেবারে নেই। চকচকে চত্বরে মন উদাস করা পরিবেশ। ড্রাইভারই আমাদের গাইড। গাড়ি যথাস্থানে রেখে আমাদের নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে বাঁদিকে হাত পা ধোয়ার জায়গা। ইচ্ছা হলে স্নানও করা যায়। তারপর মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়।
আট-দশ জনের পিছনে লাইন দিয়ে দেবী দর্শন করলাম। ফুল ও প্রসাদ গ্রহণ করে বেরিয়ে এলাম। মন্দিরের গায়ে চিত্রিত দেবীর বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত চিত্রগুলি দেখি। তনোট মাতাকে হিংলাজ দেবীর অংশ বলা হয়। মন্দির মিউজিয়ামে সুরক্ষিত রয়েছে বোমা! জানতে পারলাম দেবীর মন্দির ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তান থেকে অনবরত বোমা বর্ষণ করা হলেও দেবীর অলৌকিক মহিমায় একটি বোমাও ফাটেনি।
মন্দিরের প্রশস্ত কম্পাউন্ডের একধারে জিলিপি ও লুচি ভাজা হচ্ছিল। সঙ্গে গ্লাসভর্তি ঘন দুধও পাওয়া যাচ্ছিল। জিলিপি নিয়ে বললাম, ‘আশা করিনি এখানে লুচি জিলিপি পাব।’ আমার কথা শুনে বিক্রেতা জানা়লেন, ‘আমরা দু’জন বিএসএফ মিলে এগুলো বানাই। আমার বাড়ি হাওড়ায় এবং বন্ধুর বাঁকুড়ায়।’ মন্দিরের দায়দায়িত্ব সবই বিএসএফ জওয়ানদের। এবার যাব কাঁটাতারের বেড়া দেখতে। যার ওপারে পাকিস্তান। তবে তার আগে মন্দিরের প্রবেশ গেটের ডানপাশে অবস্থিত বিএসএফ অফিসে গাড়ির কাগজসহ প্রতি জনের আধার কার্ড ও পারমিট দেখিয়ে অনুমতি নিতে হবে।
দশ বারোটি ট্যুরিস্ট গাড়ির যাত্রীরা লাইন দিয়েছে। অনুমতিপত্র মিলতেই গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম বর্ডারের উদ্দেশে। খানিক দূর গিয়েই আবারও চেকপোস্ট। এখানে বিএসএফ আমাদের সমস্ত ডকুমেন্ট নিয়ে নেয় এবং বলে সীমান্ত থেকে ফেরার পথে তা যেন অফিস থেকে সংগ্রহ করে নিই আমরা।
সামনেই সুউচ্চ কাঁটাতারের বেড়া। তার একদিকে পাকিস্তান অন্য দিকে ভারত। জওয়ানদের কড়া নজরের মাঝে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে পায়চারি ও ফটো তুলতে বাধা নেই। উঁকিঝুঁকি দিলাম কিন্তু ওপারে জনপ্রাণীর দেখাও মিলল না। চারপাশে উপুড় করা গামলার মতো নীল আকাশ। নীচে বালির উপরে আমরা। সীমা-পরিসীমা বুঝতে পারলাম না। বেশিক্ষণ থাকতেও পারলাম না। গাড়িতে চেপে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বিএসএফ ঘাঁটির দিকে রওনা দিতে হল। আধার কার্ড সংগ্রহ করে ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেল লঙ্গেওয়ালা যুদ্ধক্ষেত্রে। জনসমাগম খুবই কম। টহলদারি ও সীমান্তরক্ষীর সংখ্যাই বেশি। এখানেও তনোট মায়ের মহিমায় পাকিস্তানি ট্যাংকার বিকল হয়ে পড়ে। মাত্র একশো কুড়ি জন ভারতীয় যোদ্ধার কেরামতিতে পাকিস্তানের পরাজয় ঘটে। যুদ্ধের নিদর্শন সাজানো রয়েছে।
ড্রাইভারকে লাঞ্চের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বলেন, রামগড়ে গিয়ে তবেই তা সম্ভব। প্রায় বিকেল নাগাদ রামগড়ের রাস্তার ধারে একটি হোটেলে গাড়ি থামে। এখানে জনতার ভিড়। এই বিকেলেও চাউল, রোটি সব কিছুই পাওয়া যাবে।
দিন পালাতে শুরু করেছে। আদিগন্তের লালিমায় স্নান করছে আকাশ। শহরে পৌঁছতে আরও ঘণ্টাখানেক তো লাগবেই। মিনিট কুড়ি যাওয়ার পর গাড়ির চাকা বিকল হয়ে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। নির্জন জায়গায় গা ছমছম করে উঠল। নিরুপায় হয়ে বালিয়াড়ির তারায় তারায় ভরা অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে রইলাম। কিন্তু মনের উদ্বেগে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারলাম না। গাড়ি সারিয়ে হোটেলে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা বাজল। আমাদের দেখে হোটেল মালিকের যেন ধরে প্রাণ এল। বললেন, ‘উফ! ওই রাস্তায় গাড়ি বিকল হওয়া মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে পড়া। তনোট মাতার আশীর্বাদেই নিরাপদে ফিরতে পারলেন।’
জয়শ্রী ঘোষ