অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: বেলুড়ে স্বামীর বিবেকানন্দের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হল মঠ। বেলুড়ের পাশেই গঙ্গার পশ্চিম তীরের গ্রাম বালি, হাওড়ার এক প্রাচীন জনপদ। এই বালির গ্রাম্য দেবতা কল্যাণেশ্বর। কল্যাণেশ্বর মন্দির সংলগ্ন সিদ্ধেশ্বরী মায়ের মন্দির ভেঙে পড়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের সভাপতিত্বে সভায় সিদ্ধান্ত হল—নতুন মন্দির গড়ে তোলা হবে। গড়ে উঠল নতুন মা সিদ্ধেশ্বরীর মন্দির।
বালি গ্রামের গ্রাম্য দেবতা কল্যাণেশ্বর। ঐতিহাসিক অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, রাঢ় দেশে যে কটি অনাদি শিবলিঙ্গ আছে, বালির কল্যাণেশ্বর তারই অন্যতম।
৫০০ বছর আগে এই অঞ্চল ছিল বেতবন ও নাগা শৈব সন্ন্যাসীদের আখড়া। ‘বালির সেকাল একাল’ বইয়ে উল্লেখিত হয়েছে, এদের মধ্যে কেউ স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে কল্যাণেশ্বরকে উদ্ধার করেন। পরে গড়ে ওঠে বড়ো পাকা মন্দির। এই কল্যাণেশ্বরের পাশেই ছিলেন মা সিদ্ধেশ্বরী। তবে তার পাকা মন্দির ছিল না। একবার প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে মায়ের মন্দির ও প্রতিমা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।
স্থানীয় মানুষজনের কাছে কল্যাণেশ্বর বড়ো আপনজন, তিনি সকলের একান্ত ‘বাবা’। রীতি অনুসারে শিব ও শক্তি আরাধনা একইসঙ্গে হয়ে থাকে সর্বত্র। তাই মায়ের মন্দিরের ভগ্নদশা তৎকালীন বালিবাসীর কাছে ছিল বড়ো বেদনার। এই অবস্থার পরিবর্তনে ডাকা হল সভা।
কল্যাণেশ্বর মন্দিরের অন্যতম সেবায়েত প্রবীর রায়চৌধুরী বলছিলেন, স্বামী বিবেকানন্দ এসেছিলেন এই সভার সভাপতিত্ব করতে। স্বামীজির উৎসাহ ও সহযোগিতায় সভায় সিদ্ধান্ত হল—নতুন পাকা মন্দির গড়ে তোলা হবে। এরপরই একচূড়াবিশিষ্ট পায়ের পাকামন্দির গড়ে ওঠে।
শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে ভক্তদের সঙ্গে করে কল্যাণেশ্বর দর্শনে এসেছিলেন। অনুভব করেছেন বাবার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি। তাই শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যদের কল্যাণেশ্বরের প্রতি ছিল অসম্ভব ভক্তি ও বিশ্বাস। আজও বেলুড় মঠ থেকে নিয়মিত পুজো পাঠানো হয় এই মন্দিরে। সারাবছরই দলে দলে সন্ন্যাসীরা আসেন কল্যাণেশ্বর শিবের মাথায় জল ঢালতে।
কল্যাণেশ্বর মন্দিরের সংলগ্ন এই মা স্থানীয় মানুষের কাছে সিদ্ধেশ্বরী নামে পরিচিত। মন্দিরের প্রাচীন নথি থেকে জানা যায়, মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে সেসময় বিরাট নরনারায়ণ সেবার ব্যবস্থা হয়েছিল। শিব ও কালী মন্দিরে একত্রে অনুষ্ঠিত হয় সংবৎসরের নিত্যসেবা। সকালে ফল মিষ্টি ও সন্ধ্যায় আরতির পর দুই মন্দিরে লুচির ভোগ দিয়ে দেবতাদের শয়ন দেওয়া হয়। দীপান্বিতা অমাবস্যায় মায়ের বিশেষ পুজোয় ফল বলি দেওয়া হয়। প্রতিবছর অঙ্গরাগের পর কালীপুজোয় মা সিদ্ধেশ্বরী সেজে ওঠেন বেনারসি, সোনা-রুপোর অলংকার ও ফুলের সাজে। সেই প্রাচীন কাল থেকে আজও বালির মানুষজনের কাছে বাবা কল্যাণেশ্বরের মতো মা সিদ্ধেশ্বরীও বড়ো আপনজন, আস্থা ও বিশ্বাসের আশ্রয় ভূমি।



