অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: শ্যামপুকুরের ৫৫ নম্বর বাড়ি। কালীপুজো এলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে এই বাড়ির স্মৃতি। ১৮৮৫ সাল। সেবার ৬ নভেম্বর ছিল দীপান্বিতা অমাবস্যা। তার কিছুদিন আগেই বলরাম বসুর বাড়ি থেকে এই বাড়িতে এসে উঠেছিলেন অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণদেব। এই বাড়ির গৃহকর্তা তখন কালীপদ ঘোষ। অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে প্রতিদিনই বিকেলের দিকে ভক্তরা আসতেন এই ভিটেতে।
কালীপুজোর দিন সকালে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ভক্তদের পুজোর আয়োজন করতে বলেন। ভক্তরা মাস্টারমশাই মহেন্দ্র গুপ্তকে দিয়ে ঠনঠনিয়ার কালীবাড়িতে পাঠান ডাব, চিনি দিয়ে পুজো দিতে। সন্ধ্যার দিকে একে একে ভক্তরা শ্যামপুকুরের ওই বাড়িতে আসেন। তাঁরা এসে দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব একটি ছোটো খাটের উপর বসে। তাঁর দু’দিকে মোম জ্বলছে। ঘরে ধূপ-ধুনোর গন্ধ। সামনে ফুল, ফল, নৈবেদ্য সাজানো। রামচন্দ্র দত্ত কালীপুজোর কোনো ব্যবস্থা না দেখে গিরিশ ঘোষকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, পরমহংসদেবের উদ্দেশ্য কী? পুজোর আয়োজন না করে এভাবে বসে আছেন কেন?
ধীরে ধীরে ঘর ভক্তে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে কালীপদ ঘোষ লুচি, সুজির পায়েস, সন্দেশ নিয়ে আসেন। কিন্তু ঘরে কোনো বিগ্রহ না থাকায় কীভাবে পুজো হবে, তা নিয়ে সবাই চিন্তিত ছিলেন। ওইদিন সকাল থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব আনন্দে মাতোয়ারা ছিলেন। কপালে চন্দনের ফোঁটা। পরনে শুদ্ধ বস্ত্র। মাঝে মাঝেই মায়ের নামে সমাধিস্থ হচ্ছিলেন। উপস্থিত ভক্তদের তিনি বলেন, তোমরা ধ্যান কর। পিছনের সাড়িতে বসেছিলেন গিরিশচন্দ্র। তিনি এগিয়ে গিয়ে পুষ্পপত্রে রাখা ফুল-চন্দন হাতে নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে অঞ্জলি দিলেন। গিরিশের অঞ্জলি পাওয়ার পর ঠাকুরের শরীরে বয়ে যায় শিহরণ। খাট থেকে নেমে দণ্ডায়মান অবস্থাতেই সমাধিস্থ হলেন। মুখে দিব্য হাসি, মুদ্রা ধারণ করল তাঁর দু’হাতের আঙুল। তাঁর দেহে ফুটে উঠল এক জ্যোতি। উপস্থিত ভক্তরা তখন মহাভাবে জগতে। মাস্টার রাখাল, শরৎ, লাটু, কালীপদ, রামচন্দ্র, অক্ষয়কুমার সেন, নিরঞ্জন একে একে শ্রীরামকৃষ্ণের চরণে অঞ্জলি নিবেদন করলেন। তখন ‘জয় মা জয় মা’ ধ্বনিতে মুখরিত গোটা ঘর।
এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অক্ষয়কুমার সেন তাঁর রামকৃষ্ণ পুঁথিতে লিখেছেন— ‘কে কালী আর কে প্রভু, না পারি বুঝিতে। কালিতে কেবল তিনি, মা কালী তাহাতে।’ তাঁর কথায়, ‘এর মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ লুচি-সুজি গ্রহণ করলেন। গলায় ব্যথার কারণে এতদিন তিনি কিছুই খেতে পারছিলেন না। অথচ সেদিন অবলীলায় খেয়ে নিলেন লুচি-সুজি।’ উপস্থিত ভক্তরা সেদিন শ্রীরামকৃষ্ণের ভিতরেই দেখতে পেয়েছিলেন মা কালীকে। শ্রীরামকৃষ্ণের দিব্যলীলার কারণে এই দিনটি বরাভয়লীলা রূপে পরিচিত হয়।
শ্যামপুকুরের ওই বাড়িতে আজও শ্রীরামকৃষ্ণের বরাভয়লীলাকে স্মরণ করে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পটে অনুষ্ঠিত হয় কালীপুজো। সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হয় পুজো। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে আজও ভক্তরা তাঁদের অর্ঘ্য নিবেদন করেন।



