Bartaman Logo
৫ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

যাদবপুরের ৩ পুজোয় পুরানো রেওয়াজ, বাড়ি বাড়ি চাঁদা কেটেই চলছে আয়োজন

রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, বাপুজি নগর, শ্যামাপল্লি। যাদবপুরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গড়ে ওঠা এই তিন এলাকার পুজোয় ফিরে এসেছে সেই পুরানো দিন।

যাদবপুরের ৩ পুজোয় পুরানো রেওয়াজ,  বাড়ি বাড়ি চাঁদা কেটেই চলছে আয়োজন
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: রামকৃষ্ণ উপনিবেশ, বাপুজি নগর, শ্যামাপল্লি। যাদবপুরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গড়ে ওঠা এই তিন এলাকার পুজোয় ফিরে এসেছে সেই পুরানো দিন। চাঁদার খাতা হাতে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে পড়শিদের পুজোয় আসার আমন্ত্রণ জানানোর পর্ব চলছে জোরকদমে। সঙ্গে পুজো-কর্তাদের আর্জি, ‘যে যেমন পারবেন দিন। তবে এবারের চাঁদাটা একটু বাড়াবেন না?’ বাঘাযতীন থেকে রাজা সুবোধ মল্লিক রোড ধরে এগিয়ে গেলে সুলেখা মোড় আসার আগেই বাঁদিকের রাস্তায় ঢুকে যাদবপুর অ্যাথলেটিক ক্লাব। কথা হচ্ছিল বাপুজিনগরের এই পুজো কমিটির সম্পাদক জয়ন্ত রায়ের সঙ্গে। বললেন, চোখধাঁধানো মণ্ডপ, আলোকসজ্জা থেকে শুরু করে পুজোর সেই জাঁকজমক একইরকম থাকবে এবারও। প্রতিমা হবে সাবেকি।  পুজোর বাকি আয়োজনও চিরন্তনী। এবার কোনো থিম নেই। আবার সেই আগের মতো এলাকার মানুষদের সঙ্গে নিয়ে পাড়ার ঘরোয়া পুজো। তবে থিমের চাপে গত কয়েক বছরে বাপুজিনগরের নিজস্ব পুজোয় পাড়ার মানুষরাই আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। বাইরে থেকে আসা ভিড় আর নেতা-মন্ত্রীদের হইচইতে পাড়া-পড়শিরাই পুজোয় জায়গা পাচ্ছিলেন না। এবার আর সেটা নয়। সাবেকি মণ্ডপ আর প্রতিমা থাকবে একদিকে। বাকি মাঠে এলাকার কচি-কাঁচা থেকে শুরু করে প্রবীণদের জন্য থাকবে আয়েসে বসে আড্ডা দেওয়ার পরিবেশ। পুজোর ক’দিন মণ্ডপ চত্বরে চলবে এলাকাবাসীর গেট-টুগেদার। বাপুজিনগর ফিরে যাবে বিশ-পঁচিশ বছর আগের সেই নির্ভেজাল পুজো-আড্ডায়। এখানে প্রতিমা গড়ছেন শিল্পী তপন ভট্টাচার্য, আলোকসজ্জায় পাড়ারই বাপ্পা ইলেক্ট্রনিকস আর মণ্ডপ তৈরি করছে গ্রিনফিল্ড ডেকরেটার্স। 

Advertisement

যাদবপুর অ্যাথলেটিক ক্লাবের মণ্ডপ থেকে ফের মেইন রোডে বেরিয়ে উল্টোদিকেই আর এক পুজো রামকৃষ্ণ উপনিবেশ পল্লি। শিল্পী প্রশান্ত পালের হাতে সেখানেও এবার সাবেকিয়ানার ছোঁয়া। থিমের জমক নেই। মণ্ডপসজ্জায় বাড়তি আতিসজ্জও থাকছে না। পুজো কমিটির সভাপতি শশাঙ্ক শেখর হালদারের কথায়, একচালার প্রতিমা রামকৃষ্ণ উপনিবেশে বয়ে নিয়ে আসবে ঐতিহ্যের হাওয়া। থিমের চাপে যা বেশ কয়েক বছর কিছুটা হলেও যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল। এবার আর তা নয়। থিমের চাপ না থাকায় সময় নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগচ্ছে মণ্ডপ তৈরির কাজ। এলাকার লোকজন বলছেন, আবার সেই মণ্ডপে বসে চলবে আড্ডা। পুজোর হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলির অপেক্ষাতেই তাঁরা মুখিয়ে আছেন।
রামকৃষ্ণ পল্লি থেকে এগিয়ে সুলেখা মোড়ে যেখানে সুকান্ত সেতু শেষ হচ্ছে, সেখান থেকে নাক বরাবর এগলেই শ্যামাপল্লি শ্যামা সঙ্ঘ। পুরানো যাদবপুরের নামি পুজোর মধ্যে শ্যামা সঙ্ঘের থিম নিয়ে সকলেরই আগ্রহ থাকে। তাদের এবারের থিম তুরঙ্গ অর্থাৎ ঘোড়া। হঠাৎ এমন ভাবনা কেন? শিল্পী সুমি মজুমদার জানালেন, এবছর মা দুর্গার ঘোটকে আগমন। সেকথা মাথায় রেখেই তাঁরা ঘোটক বা ঘোড়াকে নিয়েই থিম করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। তাঁরা মানে সুমি আর তাঁর দুই সহযোগী শুভদীপ মজুমদার আর তৃষ্ণা দত্ত। পৌরাণিক নানা কাহিনিতে যেভাবে ঘোড়াকে দেখানো হয়েছে, সেই রূপই ফুটে উঠবে মণ্ডপে। এর পাশাপাশি মানব সভ্যতার একেবারে শুরু থেকে আজকের যুগে আমরা এই শ্বাপদকে যেভাবে চিনেছি, সেই সবেরই প্রতিফলন ঘটবে এবারের শ্যামা সঙ্ঘের মণ্ডপে। প্রতিবারের মতো এবারেও মূল কাঠামো হবে লোহার। এছাড়া বাঁশ বুনে তৈরি করা হবে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার যোদ্ধার অস্ত্রশস্ত্র। মণ্ডপের দেওয়ালে থাকছে পিথোরা, ওরলির মতো বিভিন্ন পেন্টিং। থাকবে গুহাচিত্রের মতো বিভিন্ন ছবিও। সবটাই ঘোড়া এবং তার বিভিন্ন রূপকে কেন্দ্র করে। শিল্পীর কথায়, ঘোড়া কখনও আমাদের সঙ্গী, কখনও বাহন। আবার আমাদের সাহস, স্বাধীনতা আর এগিয়ে চলার বার্তা বয়ে নিয়ে চলে এই ঘোড়া। পূরাণের অশ্বমেধ যজ্ঞ হোক বা প্রাচীন যুগে রাজাদের লড়াই ও সফরের বাহন। বীরত্ব আর সাফল্যের প্রতীক হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী বার্তা বয়ে চলেছে ঘোড়া। তাই এমন এক প্রাণীর মাহাত্ম্যই এবার জায়গা পেয়েছে শ্যামা সঙ্ঘের মণ্ডপে। সাবেকি প্রতিমায় থাকছে অশ্বমুখী সিংহ। এছাড়া একচালায় প্রতিমার দু’পাশেও থাকছে ঘোটক। এখানকার পুজোতেও এবার প্রাধান্য পাবে পাড়া কালচার। গোটা শ্যামাপল্লি যাতে পুজোর সঙ্গে মিশে যেতে পারে, সেই আয়োজনই থাকবে। দক্ষিণ কলকাতার নানা প্রান্তের মানুষ এখানে আসবেন। তবে ভিড় যতই হোক, এবারের পুজোয় এলাকাবাসীই থাকবেন সবচেয়ে আগে। শ্যামাপল্লি এবার সর্বতোভাবেই হবে সর্বজনীন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ