Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নতুন ভোরের শপথ

সূর্যোদয়ের সঙ্গে আরও একটা বঙ্গাব্দ এসে হাজির চৌকাঠে। ১ বৈশাখ, বাঙালির নববর্ষ।

নতুন ভোরের শপথ
  • ১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সূর্যোদয়ের সঙ্গে আরও একটা বঙ্গাব্দ এসে হাজির চৌকাঠে। ১ বৈশাখ, বাঙালির নববর্ষ। আজ নিতান্তই আরও একটা বিনোদনের লগ্ন, সকালে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’র ডাকে প্রভাতফেরি বা সান্ধ্য অনুষ্ঠান, সারাদিন বাংলা বা রোমানে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখা টেক্সট মেসেজ, হোটেল-রেস্তরাঁয় লোভনীয় ছাড়ের অফারে কব্জি ডুবিয়ে বাঙালি খানাপিনার বন্দোবস্ত। এমন বিনোদনের লগ্ন নানা দিনে প্রায় সারা বছর ধরেই আসে, চলে যায়। নতুন কলরব এসে পুরাতনকে ভুলিয়ে দেয়। তাই প্রশ্ন জাগে, নববর্ষ আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেও তাকে কি হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করতে পারছে? নাকি তা গরিমা হারাচ্ছে? এর উত্তর নিয়ে বিশেষ কাটাছেঁড়া করার দরকার পড়ে না। কারণ দোকানে দোকানে হালখাতার পুজো, ময়দানে বড় ক্লাবগুলির বারপুজো, সোনার দোকানে ভিড় বা বইপাড়ার আড্ডায় পেটপুজোতেই এখন বাঙালি-নববর্ষের দিনটার মহিমা। দুর্ভাগ্যের হলেও বাস্তব যে, এখন আবার নববর্ষের অনুষ্ঠানে ধর্মের তকমা বসানো রাজনীতি ক্রমশ প্রবল হচ্ছে! মুঘল সম্রাট আকবর নাকি হিন্দুরাজা শশাঙ্ক কার হাত ধরে বঙ্গাব্দের সূচনা— তাই নিয়ে বঙ্গসমাজে আকচাআকচি শুরু হয়েছে। প্রামাণ্য ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়া বা অস্বীকার করার এই অপচেষ্টা শুধু দুর্ভাগ্যের নয়, ভয়েরও। কারণ, এর পিছনেও মেরুকরণের সূক্ষ্ম কৌশল লুকিয়ে রয়েছে। 

Advertisement

নববর্ষ মানেই রবীন্দ্রনাথের গান। বাঙালির এই বছর শুরুর দিনটায় অনেকেরই সকাল শুরু হয় ‘এসো হে বৈশাখ’-এর বাণীতে। এই গানেই শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের আর্তি, ‘বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ প্রায় ১০০ বছর আগের এই গীত রচনা যেন আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নববর্ষের সকালে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দিনগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে, রবীন্দ্রনাথ কথিত সেই আবর্জনার স্তূপ যেন ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সর্বত্র। ক্ষমতার আস্ফালন, দুর্নীতির লম্বা হাত, কলহ, ব্যর্থতা-অপদার্থতার সাতকাহনে অতিক্রান্ত একটা বছর। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টালেও কোন জাদুবলে এই যাবতীয় আবর্জনা দূর হয়ে যাবে, এমনটা এখনও ভাবা যাচ্ছে না। বরং ঈশান কোণে ঐক্য-সম্প্রীতি বিনষ্ট করার কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। উঠেছে চক্রান্ত অথবা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। এ যেন এক নতুন রাজ্য, নতুন সকাল, যেখানে নিত্যনতুন ‘জয়ন্তী’ উদযাপনের নামে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি বজ্রনির্ঘোষ ঘোষিত হচ্ছে। উল্টোদিকে আবার ‘আত্মরক্ষার’ অজুহাতে আগুন নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে। আবর্জনা স্তূপে তাই এখন বারুদের গন্ধ, ধিকিধিকি আগুনের শিখা। তবে এটাই সব নয়। বাংলা তো সম্প্রীতি রক্ষার কথাই বলে। বছর ঘুরলে ফের ভোটের রাজনীতির খেলোয়াড়েরা কুর্সি দখলের লক্ষ্যে আরও উন্মত্ত, উগ্র ও মদমত্ত হয়ে উঠতে পারেন— সে সম্ভাবনাও প্রবল। তাই ১৪৩২-এ আপাতত কোনও আশার আলো সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। তবু আনন্দের বার্তা দিয়েই হয় বছরের শুরু। অতীতের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে ভালোভাবে চলার পরিকল্পনা করার এটাই শ্রেষ্ঠ দিন। আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলার শপথ নেওয়ার দিন। 
তাই হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে চলবে না। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর সন্ধানে এগিয়ে আসতে হবে সমাজকে। একা কারও চেষ্টায় এ কাজ হতে পারে না। মাটি ফুঁড়ে কেউ একজন নেতৃত্ব দিতে উঠে আসবেন—এমনটা ভাবারও কোনও কারণ নেই। বরং সচেতন ও দায়িত্বশীল বঙ্গবাসীকেই সম্মিলিতভাবে প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে হবে, অনেক হয়েছে, আর না। এখনও সমাজের নানা পরিসরে নতুন ভাবনা ও নতুন সৃষ্টির যেসব উদ্যোগ জারি রয়েছে, রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘পুরাতনের মধ্যে নতুনের উন্মেষ’, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে বুদবুদ এখনও অবশিষ্ট আছে তাদের হাত ধরেই উঠে আসতে পারে উত্তরণের পথ। তাই আরও একটা ছুটির দিন উদযাপনের বাইরে এই নববর্ষ বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে বাঁচাতে সঙ্কল্পের দিন হয়ে উঠুক। এক অন্য সকাল নিয়ে আসুক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ