নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: স্কুলের ইউনিফর্ম গায়ে থাকলেও, অনেক নাবালিকা ইতিমধ্যেই বেছে নিচ্ছে জীবনের সঙ্গী। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতার ফলে দূরের মানুষের সঙ্গেও তৈরি হচ্ছে প্রেমের সম্পর্ক। অনেক ক্ষেত্রেই প্রেমিক প্রাপ্তবয়স্ক হলেও প্রেমিকা থাকে স্কুলপড়ুয়া নাবালিকা। সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে বাড়তে চিন্তা থাকছে না ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে। অন্যদিকে, আর্থিক অনটনের কারণে অনেক পরিবারই ১৮ বছর না হতেই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয়ের এক অন্ধকার চক্রে আটকে পড়ছে মেয়েরা। যথাযথ পরিবার পরিকল্পনার অভাবে অল্প বয়সেই গর্ভবতী হয়ে পড়ছে তারা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে নদীয়া জেলায় নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যাটা চোখ কপালে তোলার মতো। নদীয়া জেলার গর্ভবতী মায়েদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, এক বছরে প্রায় ১০ হাজার জন নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছেন। যেখানে নদীয়া জেলায় এবং বছরে মোট গর্ভবতী মায়ের সংখ্যা ৬৮ হাজার ৭৮৮ জন। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে ১৫ জন নাবালিকা।
জানা গিয়েছে, ১৫ বছরের নীচে ৩৪৯ জন নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছেন। যার মধ্যে শুধু হরিণঘাটা পুরসভাতেই নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা ১০২ জন। আবার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী গর্ভবতী হওয়া নাবালিকার সংখ্যা ৯৬৩৩। কালীগঞ্জ, নাকাশিপাড়া, করিমপুর-২, করিমপুর-১ ব্লকে এই নাবালিকা প্রসূতির প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। নাবালিকা প্রসূতির এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে মনে করছে স্বাস্থ্যমহল। স্বাস্থ্যদপ্তরের এক পদস্থ কর্তার কথায়, বিয়ের পর শ্বাশুড়বাড়ি থেকে গর্ভধারণের চাপ আসছে নাবালিকার উপর। অনেক সময় অনিচ্ছার সত্ত্বেও তাঁরা গর্ভধারণ করছেন।
স্বাস্থ্যদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নাকাশিপাড়া ব্লকে একবছরে ৬৪৮৪ জন গর্ভবতী হয়েছেন। যার মধ্যে ১৫ বছরের নীচে গর্ভবতী মা রয়েছেন ৩৭ জন। যা নদীয়া জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। আবার ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে ১১৩৬ নাবালিকা গর্ভবতী হয়েছেন। যা নদীর জেলায় মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান। পাশাপাশি কালীগঞ্জ ব্লকে এক বছরে ৬২৯৫ জন মহিলা গর্ভবতী হয়েছেন। এই ব্লকে ১৫ বছরের নীচে গর্ভবতী মা রয়েছেন ৩১ জন। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী গর্ভবতী মায়ের সংখ্যা ১৩২৯ জন। অর্থাৎ করিমপুর-২ ব্লকে ৩৮৬৮ জন গর্ভবতী মায়ের মধ্যে ১৫ বছরের নীচে রয়েছে ১৬ জন এবং ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে রয়েছে ৮৯২ জন। অর্থাৎ, করিমপুর-২ ব্লকে একবছরে মোট গর্ভবতীর মায়ের মধ্যে ২৩ শতাংশই নাবালিকা। করিমপুর-১ ব্লকে একবছরে ১৫ বছরের কম বয়সী ১৭ জন এবং ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৪৭৬ জন নাবালিকা মা হয়েছেন। কৃষ্ণনগর-১ ব্লকে নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা ১৩ শতাংশ এবং কৃষ্ণনগর-২ ব্লকে ১৬ শতাংশ।
গ্রামের পাশাপাশি শহর এলাকাতেও এই পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। বিশেষ করে হরিণঘাটা পুরসভায়। সেখানে এক বছরে গর্ভবতী মায়ের সংখ্যা ৫৪৪ জন। যার মধ্যে ১৫ বছরে নীচে গর্ভবতী মা রয়েছেন ১০২ জন। এছাড়াও কুপার্স ক্যাম্পে এরম গর্ভবতী নাবালিকা রয়েছেন ৩০ জন। অন্যদিকে শান্তিপুর পুরসভা এলাকায় ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী নাবালিকা প্রসূতির সংখ্যা ২১৪ জন। এমনকী কৃষ্ণনগর শহরে এরকম নাবালিকা প্রসূতি রয়েছেন ৯৬ জন। নদীয়া জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জ্যোতিষচন্দ্র দাস বলেন, নাবালিকা প্রসূতি কমাতে আমরা কাজ করছি। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির করা হচ্ছে। সেখানে এইসমস্ত বিষয় নিয়ে মানুষকে ওয়াকিবহাল করা হচ্ছে।