Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এবার বল কমিশনের কোর্টে

আগামী মে মাসের একেবারে গোড়ায় বিধানসভা গঠন করতে হবে পশ্চিমবঙ্গে। এজন্য মার্চ-এপ্রিলের ভিতরেই নির্বাচন সুসম্পন্ন হয়ে যাওয়া দরকার। ২০২১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে।

এবার বল কমিশনের কোর্টে
  • ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগামী মে মাসের একেবারে গোড়ায় বিধানসভা গঠন করতে হবে পশ্চিমবঙ্গে। এজন্য মার্চ-এপ্রিলের ভিতরেই নির্বাচন সুসম্পন্ন হয়ে যাওয়া দরকার। ২০২১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২৭ মার্চ থেকে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে। গতবার ভোট নেওয়া হয়েছিল মোট আট দফায়। এবার ভোটগ্রহণ কত দফার তা আলোচনাসাপেক্ষ। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ন্যূনতম দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। ওইসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) তরফ থেকেও এখনো পর্যন্ত ইঙ্গিত অনুরূপ। এতে তীব্র আপত্তি রয়েছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের। তবু সব মিলিয়ে রাজনৈতিক মহলের অনুমান, ভোটের দফা এবার কমছেই। যত কম দফাতেই ভোট নেওয়া হোক না কেন, নির্বাচন কিন্তু শিয়রেই! কমবেশি সাড়ে সাত কোটি ভোটদাতা মতদান করবেন। এই সংখ্যাটি গণতন্ত্রের যেকোনো কাঠামোর পক্ষেই বিশাল। তার উপর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিন দফায় (দীর্ঘ প্রচার পর্বে, ভোটগ্রহণের দিন এবং ভোটগ্রহণ ও গণনা পরবর্তীকালে) হিংসার পরম্পরা রয়েছে বাংলার। অনেক নিন্দামন্দ, সমালোচনাতেও বাংলার নির্বাচনি সংস্কৃতি একচুলও বদলায়নি। আমরা জানি, বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রতিবারই ভোটার তালিকার সংশোধন করা হয়। নিয়মমাফিক এবারও তা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিহার বিধানসভার আগে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, বাংলাতেও এই প্রক্রিয়া আসন্ন। বিহারে এসআইআর নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা, নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম, বিজেপি এবং তাদের দোসর একাধিক দল ছাড়া সকলেই এজন্য ইসিআইকে কাঠগড়ায় তুলেছিল। বিহারের এসআইআর প্রক্রিয়া সমালোচিত হয়েছিল আদালতেও।

Advertisement

তারপরেও ইসিআই কতটা শুধরেছে বা নিজেকে প্রস্তুত করেছে তা নিয়ে সংশয় ছিল বিস্তর। বিশেষ করে বাংলার মতো একটি স্পর্শকাতর রাজ্যে এসআইআরে হাত দেওয়ার আগে তাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতিগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রস্ততিগ্রহণে কমিশন কতখানি গাফলতি করেছে বা ব্যর্থ হয়েছে তার প্রমাণ মিলছে প্রতিদিন। কমিশনের সিদ্ধান্তহীনতার ছবিটা ধরা পড়ছে পদে পদে। বিশেষ করে শুনানিতে গ্রাহ্য নথির তালিকা নিয়ে ইসিআই এপর্যন্ত যে কাণ্ড করেছে, তাতে মধ্যযুগের নিন্দিত শাসক মহম্মদ বিন তুঘলকও লজ্জা পেতে পারতেন। কমিশনের খামখেয়ালি আচরণ এবং বিবেচনা বোধের চরম অভাব গোটা প্রক্রিয়াকে কখনো হাস্যকর, কখনো উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে শুধু এক শ্রেণির ভোটারদের মধ্যেই নয়, এসআইআর প্রক্রিয়ায় কাজ করতে বাধ্য বিএলও নামক বহু কর্মীও মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলছেন। কমিশন সরকারিভাবে মানুক আর নাই মানুক, এসআইআর আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গে এপর্যন্ত শতাধিক অকালমৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেসসহ একাধিক অবিজেপি দলের লাগাতার প্রতিবাদ, এমনকি মামলা মকদ্দমাতেও পরিস্থিতির ইতিবাচক বদল হচ্ছিল না। অবশেষে সরাসরি শীর্ষ আদালতে পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়েও সাধারণ আইনজীবীর ভূমিকায় নেমে এসে সওয়ালও করেন তিনি। এসআইআর নিয়ে মানুষের যে গণহয়রানি চলছে, আতঙ্কের পরিবেশ কায়েম হয়েছে, সেই যন্ত্রণা থেকে সকলের মুক্তির দাবিতেই বাংলার জননেত্রী এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এসআইআর যন্ত্রণা বহুগুণ হয়েছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, নথি নিয়ে তুঘলকি কারবার, মাইক্রো অবজার্ভার নামক এক নয়া প্রজাতির অদ্ভুত খবরদারি প্রভৃতির সৌজন্যে। এসব হটিয়ে একটি যুক্তিসংগত উপায়ে এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই যাতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও সাঙ্গ হতে পারে, এটাই ছিল মুখ্যমন্ত্রীর চূড়ান্ত দাবি।
মমতার দাবি যে যথার্থ, সুপ্রিম কোর্টের সিলমোহরে সেটাই প্রমাণিত হল আরো একবার। সোমবার সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিল, ভোটার তালিকায় কারো নাম থাকবে কি না, সেই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও, কোনো মাইক্রো অবজার্ভার নয়। তাঁরা শুধু ইআরওদের কাজে সহযোগিতা করবেন। ওইসঙ্গে নামের ভিন্ন বানানসহ কিছু ভুল সংশোধনের জন্য নথি যাচাইয়ের সময় বৃদ্ধিও করা হয়েছে। শুনানিতে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড এবং সার্টিফিকেট দুটিই গ্রাহ্য। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে সুপ্রিম-নির্দেশে বাংলার অগ্নিকন্যার জয়ই দেখছেন সবাই। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিনও শেষমেশ পিছোতে পারে। পেরিয়ে যেতে পারে ফেব্রুয়ারি মাস। এই অনাবশ্যক বিলম্বের দায় যুগপৎ ইসিআই এবং মোদি-শাহের পার্টির। অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি এড়ানোই যেত। তার জন্য কমিশনের আর একটু বিবেক বুদ্ধি বিবেচনা ও স্বাধীনচিন্তা প্রত্যাশিত ছিল। তাতে সত্যিই উৎসবের চেহারা নিতে পারত বাংলায় ভোট‍। পরিবর্তে শুরুর আগেই হয়ে উঠেছে অশান্ত এবং বিষাদময়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হুজুরের হাতে তামাক খাওয়ার বদভ্যাস করে ফেললে সত্যিই তা দুর্ভাগ্যের। আমরা আশা করব, এবার অন্তত নির্ভুল ও নিরপেক্ষ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে কমিশন তার মুখরক্ষায় যত্নবান হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ