১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) চালু করার ব্যাপারে শীর্ষ আদালতে বড়ো জয় পেয়েছে বাংলা। টানা কয়েকবছর বাংলায় এই প্রকল্পের কাজ কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। তার ফলে এখানকার অতিদরিদ্র লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্দশায় পড়েছেন। তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে। সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের রায়ের সুবাদে বাংলায় মনরেগার কাজ ফের শুরু হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, রাজ্যের ২ কোটি জবকার্ডধারী শ্রমিকের হকের পাওনা এখনও বকেয়া পড়ে আছে। ওই বিপুল অর্থও আদায় হওয়া জরুরি। এই লক্ষ্যে মঙ্গলবারই বাংলার মাটি থেকে শুরু হয়েছে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। যুগপৎ জারি করা হয়েছে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই। বকেয়া টাকার দাবিতে একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নতুন করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। পাশাপাশি, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায়ের পরও বাংলার প্রান্তিক মানুষের টাকা আটকে রাখা হলে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে। ওইসঙ্গে শুরু হবে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন।
এই প্রসঙ্গে জানানো যায়, মনরেগার বকেয়া মজুরিসহ একাধিক দাবিতে হাইকোর্টে আগেই একাধিক মামলা হয়েছিল। সেগুলি এখনও বিচারাধীন। মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে রাজ্যের তরফে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র বেঞ্চের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মামলাগুলির শুনানি ৭ নভেম্বর। মনরেগা চালুর দাবিতে তৃণমূল কংগ্রেস দিল্লিতে আগেই আন্দোলন করেছে। অভিষেকের ভাষায় সেটা ছিল ‘ট্রেলার’। টাকা ফের আটকালে বাংলার মানুষ এবার পুরো ফিল্মটাই দেখাবেন! অর্থাৎ কেন্দ্রের ঘুম ছুটিয়ে দেওয়ার মতো করেই রাজনৈতিক লড়াই শুরু করবেন তিনি, এমনই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলার সেনাপতি। পশ্চিমবঙ্গে মনরেগার কাজ বন্ধ হয়েছে ২০২২ সালে। তার আগে পর্যন্ত এই খাতে কেন্দ্রের কাছে বাংলার হকের পাওনা আটকে ছিল ৬,৯১৯ কোটি টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে তারপরে বাংলার জন্য লেবার বাজেট বরাদ্দ হলে রাজ্য আরও ৫০,৩৪৪ কোটি টাকা পেতে পারত। কিন্তু রাজ্যকে সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেওয়া হয়নি। এই টাকা রাজ্যে আসার মানে বাংলার গরিব মানুষগুলি হাতে হাতে কাজ পেতেন। মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত এই কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্প কংগ্রেস জমানায় চালু করার উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা বৈষম্য ও বেকারত্ব। তার প্রধান বলি গরিব মানুষ। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি গ্রাম ভারতে। তাই এমন একটি আইন তৈরি করা হয়েছে যে, গ্রামের যেকোনও মানুষ দাবি করামাত্র সরকার তাঁকে বছরে অন্তত ১০০ দিনের কাজ দিতে বাধ্য থাকবে। গত দুই দশকে ভারতে দারিদ্র্য অবশই কিছুটা কমেছে। তার পিছনে মনরেগা প্রকল্প রূপায়ণের কৃতিত্ব যে বিরাট, তাতে সন্দেহ কী? বলা বাহুল্য, মনমোহন সিংয়ের দুটি ইউপিএ জমানাতেই মনরেগা রূপায়ণে বেশ গতি ছিল।
জনমুখী প্রকল্পটির বারোটা বাজানো হয়েছে মোদিযুগে। যখন কাজের দিন বৃদ্ধির দাবি জোরালো হচ্ছে, তখনই এই খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। তারই মধ্যে চলেছে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ সরকারগুলির সঙ্গে চরম বঞ্চনার খেলা। অবিজেপি রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে মোদিবাবুদের সবচেয়ে অপছন্দের হল বাংলার মা-মাটি-মানুষের সরকার। কারণ এই সরকারের নেত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি দিল্লির যেকোনও অনাচারের কট্টর সমালোচক এবং আজন্ম আপসহীন প্রতিবাদী। তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে বারবার হেরে গিয়ে বস্তুত বাংলার গরিব মানুষকেই কষ্ট দিয়ে চলেছে কেন্দ্র। দুর্নীতির অজুহাত খাড়া করে এখানে মনরেগার কাজ ও টাকা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তার ফলে লক্ষ লক্ষ কর্মদিবস বানচাল হয়ে গিয়েছে। এই ভয়াবহ গরিব মারা নীতি আর বরদাস্ত করা যায় না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাংলার মানুষের দাবিতেই সিলমোহর পড়েছে। এবার অন্তত মোদি সরকারের বিবেক জাগ্রত হওয়া দরকার। বাংলায় যাতে অবিলম্বে ১০০ দিনের কাজ শুরু হতে পারে তার জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিক তারা। তৃণমূলের রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করলে সবচেয়ে ক্ষতি হবে বঙ্গ বিজেপির। মোদি-শাহের কেন্দ্রীয় সরকার যদি ছাব্বিশের ভোটে বঙ্গ বিজেপিকে ‘বলিপ্রদত্ত’ চিহ্নিত করে থাকে তবে তারা যা খুশিই করতে পারে। জুতসই জবাবটা বাংলার মানুষ যথাসময়েই দেবেন।