নন্দীগ্রামে অধিকাংশ জায়গায় বিরোধী দলের এজেন্টকে বুথে বসতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সকাল থেকে। কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান এবং সিপিআইয়ের শান্তিগোপাল গিরি একসুরে এই অভিযোগ করছেন। বেলা গড়াতেই ভোট লুটের অভিযোগ আনলেন স্বয়ং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও। বদলের বাংলাতেও সামান্য দু’টি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে এত অভিযোগ! এ কথা ঠিক, ওই দু’টি কেন্দ্রের ফলে সরকার তেমন কোনো বিপদে পড়বে না। বিধানসভার ছবিও বদলাবে না তেমন। অঘটন হলেও বিরোধীরা বিরাট কোনো অক্সিজেন পাবে না। তবে ফল উলটে গেলে শোরগোল যে একটা পড়বে সেকথা বিলক্ষণ বলা যায়। সরকারের বয়স মাত্র পাঁচ মাস তাতেই এত! তাই সাবধানের মার নেই।
শুভেন্দুবাবুর প্রেস্টিজ ফাইট বলে কথা! কী নন্দীগ্রাম, কী রেজিনগর দু’জায়গাতেই একই অবস্থা! ছবিটা গত পাঁচ দশক ধরেই যেকোনো ভোটে বড্ড চেনা! পুলিশের ভূমিকাও একই। এটাই হয়ে উঠেছে উপনির্বাচনের ছবি। সিপিএম আমলে এই একই কথা শোনা যেত কংগ্রেস ও পরে তৃণমূলের মুখে। এগারোর পালাবদলের পর ওই একই অভিযোগ শুনতে পাওয়া গেল কংগ্রেস, সিপিএম ও বিজেপির মুখে। মাত্র পাঁচ মাস আগে টিএমসির শাসন গিয়ে কুরসিতে বিজেপি। ভয় ভরসার টানাপোড়েনে এবারও দেখা গেল শাসক বিরোধী স্থান বদলালেও অভিযোগগুলি একই থাকে। শুধু রাজা আর প্রজার চেয়ার বদল হয় মাত্র! গতকালের নির্যাতিতরাই রাতারাতি আজকের ভক্ষক হয়ে যায় বেমালুম! বাকিটা অপরিবর্তনশীল। আঙুল চোষে বেচারা জনগণ! আক্ষেপ আর হতাশাই ওদের রোজনামচা! নন্দীগ্রামের ১২ দিনের জেল ফেরত প্রার্থী মিলন প্রধান অভিযোগ করলেন, বহিরাগত ঢুকিয়ে ভোট করানো হচ্ছে আর পুলিশ নাকি নীরব দর্শক। আচ্ছা, এ কী নতুন কোনো অভিযোগ? ১৯ বছরের পুরানো মামলায় তাঁর গ্রেপ্তারও যেন অবাক করা নয়। নন্দীগ্রামের গড় চক্রবেড়িয়ায় উদভ্রান্ত কংগ্রেস প্রার্থী পুলিশের সামনে বলেই ফেললেন, তাঁকেও সজোরে লাঠি খেতে হয়েছে বাহিনীর। তাঁর সামনে গ্রামের মহিলাদের বলতে শুনলাম, বহিরাগতরা ভয় দেখাচ্ছে, ভোট দিতে দিচ্ছে না। ওরা বলছে তোমাদের ভোট হয়ে গিয়েছে। আর বুথের বাইরে জটলা সরাতে হিমশিম দশা পুলিশের। লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়া, কিংবা বচসা, সব একইভাবে চলল পাল্লা দিয়ে। দিনের শেষে সব অবাধ ও শান্তিপূর্ণ! সার্টিফিকেট দিচ্ছেন কে? মহামান্য জ্ঞানেশ কুমার, যাঁর নামে প্রতিবাদে সারা দেশ উত্তাল। দিল্লিতে নির্বাচন সদন অভিযানে বিরোধীরা। জ্ঞানেশকে যেতেই হবে, সব বিরোধী এককাট্টা। প্রমাণ হল, সব একই থাকে আর আমরা শুধু নতুন স্বস্তি খুঁজি। শেষে বদলায় না কিছুই! উপনির্বাচন হল বঙ্গের আর এক কেন্দ্র রেজিনগরেও। সেখানে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তথা মাত্র পাঁচ মাস আগে বড়ো ব্যবধানে জয়ী হুমায়ুন কবীর নিজেই পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে গ্রেপ্তার। ওই কেন্দ্রে এবার হুমায়ুনের ছেলে প্রার্থী। এই ক’দিনে ভোট ঘুরে যাওয়ার আসল রহস্যটা মুখে কেউ না বললেও সবার জানা। সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল লড়াইটা আসলে হুমায়ুনের সঙ্গে বিজেপির! এবং বলাই বাহুল্য মাত্র পাঁচ মাসের নির্বাচনি পরিসংখ্যান উলটে দিয়ে গড়পড়তা উপনির্বাচনের ঐতিহ্য মেনেই শাসক দলের পাল্লা ভারী। বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকারই ধারে ভারে এগিয়ে। এর নামই ক্ষমতা। আর শুভেন্দু অধিকারীর গড় নন্দীগ্রামে গতবারের প্রধান বিরোধী মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো প্রতিনিধিই নেই। তাহলে ওই ৪৬ শতাংশ ভোট কোথায় যাবে? মনোনয়ন জমা দিয়েও মমতা তৃণমূল প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নাম তুলে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই বদলে যাওয়া পরিবেশে দুই কেন্দ্রেই বিজেপির জয়ের আশা প্রবল। বাকিটা বলবে শুক্রবারের ফল।
৯২ লক্ষ নাম একতরফা বাদ গিয়েছে এই বঙ্গে। গোটা দেশে ১৩ কোটি। এসআইআর যদি না হতো বাংলার ভোট মানচিত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, তা অনিশ্চিত। গভীর রহস্যে মোড়া। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার দুই কেন্দ্রের নির্বাচনের ফলাফলেরও গুরুত্ব তাই বিরাট। আপাতত শুক্রবারের ফলের অপেক্ষা। সেইসঙ্গে আম জনতার আক্ষেপ। রাজা আসে রাজা যায়, শুধু পোশাকের রং বদলায়। পোশাকের ঢং বদলায়। দিন বদলায় না।