যুগ বদলের সঙ্গে মহিলাদের অধিকারের জায়গাগুলোও একটু একটু করে পালটে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন মহিলারা সেবা, শ্রম, ভালোবাসা দিয়ে যেতেন। প্রতিদানে সমাজ বা সংসারের প্রতি তাঁদের কোনো প্রত্যাশা ছিল না। সত্যি বলতে কী, চাওয়ার অধিকার থেকেও তাঁরা ছিলেন বঞ্চিত। সমাজ তাঁদের চিন্তাধারা এমনভাবে গড়ে তুলেছিল যে সেবার প্রতিদানে কোনো প্রত্যাশা করার মতো মানসিক স্থিতিই ছিল না তাঁদের। আর এই যে কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই জীবনযাপন, এটা যে শুধুই আমাদের দেশের চিত্র ছিল, তাও কিন্তু নয়। সমগ্র বিশ্বেই মহিলারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
শিক্ষা থেকে সামাজিক যে কোনো স্বাচ্ছন্দ্যে পুরুষের অগ্রাধিকার। মহিলারা অধিকার পাবে তারপর। এই সামাজিক চিত্রে যে প্রচুর তফাত ঘটেছে তা হয়তো নয়, তবে কিছুটা বদল যে এসেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর এই বদল এসেছে নারীশিক্ষা ও স্বনির্ভরতার হাত ধরে। এ যুগের মেয়েরা আর ‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’, মন্ত্রে দীক্ষিত নয়। তারা কিছু দিলে, তার পরিবর্তে পরিবার বা সমাজের কাছে কিছু আশাও করে।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল শিবপুর দীনবন্ধু কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী আরফা ইকবালের সঙ্গে। তাঁর মতে, ‘নারী তবেই সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হবে, যবে তারা শিক্ষিত হবে। মেয়েরা অনেকেই আজও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নয়। তার কারণ শিক্ষার অভাব। অনেক সময় অবশ্য পারিবারিক পরিকাঠামোও এর জন্য দায়ী। তবে শিক্ষিত মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই বেশি সচেতন। তারা নিজেদের অধিকার নিয়ে ভাবে এবং তা পাওয়ার জন্য দাবি জানায়। ফলে সরকারের নারী শিক্ষার পরিকাঠামো আরও উন্নত করে তোলা উচিত।’ তাঁর মতে, মেয়েদের উপার্জনও জরুরি। তবেই মেয়েরা এই সমাজে নিজেদের জন্য জায়গা করে নিতে পারে। আর কন্যা সন্তানের বাবা মায়েরও এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার। ছোটো থেকেই মেয়েদের অধিকার বিষয়ে সচেতন করা উচিত।
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির ছাত্রী সৃজা চৌধুরি একেবারে আদি যুগ থেকেই মহিলাদের সামাজিক অবস্থানের কথা বললেন। তাঁর মতে, ‘এই যে সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণিতে নারীর বিচরণ তা কিন্তু ভারতীয় প্রেক্ষাপটেই সীমিত নয়। রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে ইংল্যান্ডের মতো প্রথম বিশ্বের দেশেও মহিলাদের সামাজিক অস্তিত্ব উন্নত ছিল না। তাদের ‘অ্যাঞ্জেল অব দ্য হাউস’ বলে অভিহিত করা হত। অর্থাৎ বাড়িতে সবরকম কাজ, রান্না, ঘরকন্না, স্বামীর যত্ন, গুরুজনদের দেখভাল করে তারা বাড়িটা স্বর্গের মতো করে গড়ে তুলবে। কিন্তু তার বিপরীতে তাদের কোনো চাহিদা থাকতে পারবে না। স্বামীর সেবা করবে কিন্তু বিনিময়ে স্বামীর কাছে কোনো স্বীকৃতি দাবি করতে পারবে না। সেই সময় ইংল্যান্ডের ‘ফেয়ার মেইডেন’ বা সাদা চামড়ার মহিলা, যাঁরা তথাকথিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত সমাজে বাস করতেন, তাঁদের কথাই এখানে বলা হচ্ছে। সেই সময়কার সাহিত্যিকরাও যেসব নারীর কথা লিখেছেন তাঁরাও বেশিরভাগই এই তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধি। এই যদি প্রথম বিশ্বের শিক্ষিত সমাজচিত্র হয়, তাহলে বাদবাকি নারীর অবস্থান কোন তিমিরে ছিল তা তো বলাই বাহুল্য।’
আশার কথা এই যে, মহিলারা এরপর প্রচুর উন্নতি করেছে। সমগ্র বিশ্বে মহিলাদের সমবেত রোজগার এই মুহূর্তে মোটামুটি বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। মহিলাদের স্বনির্ভরতা আজ সমাজের কাছে অন্তত প্রত্যাশিত ঘটনা। মহিলারা সেই স্বনির্ভরতার উপর ভর দিয়ে নিজেদের ইচ্ছেগুলো জোর গলায় জানাতে সক্ষম হচ্ছে। এখন আর মেয়েদের ‘বিয়ে দেওয়া হয় না’, তারা ‘বিয়ে করে’। আজকের নারী অনেকক্ষেত্রেই জোর গলায় বলতে পারেন, তাঁরা সন্তান নিতে চায় না। মাতৃত্বের বেদির উপর নিজেদের কেরিয়ার ও জীবন বলি হয়ে যাক, সেটা তাঁরা চান না। আজকের নারীর অনেকাংশের কাছেই সংসার ও সন্তানের তুলনায় কেরিয়ার বেশি গুরুত্ব পায়। এবং সমাজ তা মেনেও নেয়। তবে এগুলো সবই সমাজের ওপর তলার চিত্র। নিম্ন শ্রেণির অর্ধ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত নারীর কাছে এই ধরনের জীবনযাপন স্বেচ্ছাচারিতার সমান।
সৃজার কথার সুর শোনা গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্রী সম্প্রীতি মণ্ডলের কথাতেও। ‘নারী আজও সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারে না’, বললেন সম্প্রীতি। তাঁর কথায় নারীমুক্তির চেতনা বা সংগ্রাম এখনও মাত্র একটা শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ। সমাজের নীচের স্তরের মহিলারা আজও নিজেদের অধিকার, চাহিদা ইত্যাদি বিষয়ে ওয়াকিবহাল ন়ন। তাঁদের কাছে এখনও জীবনের অর্থ স্বামীর সেবা, সন্তান ধারণ ইত্যাদিতেই সীমাবদ্ধ। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই নারী উন্নয়নের মাধ্যমে এক বিশেষ শ্রেণির মহিলার আবির্ভাব হয় এই সমাজে, ‘ভদ্রমহিলা শ্রেণি’। আমরা মূলত তাঁদের জীবনযাত্রার কথাই জানি এবং আলোচনা করি। কিন্তু গ্রামের মহিলারা আজও উন্নতির আলো দেখেননি। সমাজের কাছে তাই তাঁদের কোনো প্রত্যাশা নেই। আর এই ভদ্রমহিলারাও কিন্তু অনেকাংশেই পুরুষ শাসিত সমাজ দ্বারা পরিচালিত। অর্থাৎ তাঁদের চাহিদাও ততটাই এগিয়েছে যতটা পুরুষতন্ত্র তাঁদের এগতে দিয়েছে।’
বাড়ির পুরুষটিকে তুচ্ছ করে তাঁর মতের তোয়াক্কা না করে নিজের চাহিদার পিছনে দৌড়নো বা তা দাবি করার মানসিকতা আজও মহিলাদের মধ্যে বিরল। তবে দিন বদল, নারীশিক্ষার বৃদ্ধি, নারীর স্বনির্ভরতা ইত্যাদির ফলে একটু একটু করে পুরুষতন্ত্রের সুতোগুলো আলগা হচ্ছে। দিন বদলের সঙ্গে নারী স্বাধীনতার মূল্য সমাজের চোখে গৃহীত হচ্ছে, এটাই আশার কথা।
‘স্বাধীনচেতা, স্বনির্ভর মহিলারা আজও সমাজে ব্যতিক্রম’, জানালেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী স্বস্তিকা রায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সমাজে আগাগোড়াই এমন কয়েকজন মহিলার আবির্ভাব হয়েছে যাঁরা ব্যতিক্রমী। শকুন্তলা দেবী, কল্পনা চাওলা, দ্রৌপদী মুর্মু সেই ব্যতিক্রমী নারীর সাক্ষর বহন করেন। তাই বলে সমগ্র চিত্রে নারীর অবস্থানের খুব একটা বদল হয়েছে বলে মনে করেন না স্বস্তিকা। শহরে যদিও বা মহিলাদের খানিকটা উন্নতি চোখে পড়ে, গ্রাম কিন্তু যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই পড়ে রয়েছে। সেখানে মহিলারা আজও শুধুই সেবা, শ্রম, ভালোবাসা দিয়েই যা়ন, প্রতিদানের কিছুই আশা করেন না। আর তথাকথিত উন্নত জীবনের অধিকারী শহুরে নারীকেও বারবার তাঁর দক্ষতা, প্রতিভা বা পারদর্শিতার প্রমাণ দিতে হয়। তবে একধাপ করে এগতে এগতেই মোক্ষে পৌঁছনো যায়। নারী যখন অনেকটাই এগতে পেরেছে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করতে পেরেছে, পুরুষতন্ত্রের গায়ে আঘাত হানতে পেরেছে তখন সেই দিনও দূরে নয়, যবে নারী সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপন করবে।
বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ঐন্দ্রিলা বসুর মতে, ‘দিন বদল এবং যুগ পালটানোর ফলে মেয়েদের সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তবে মেয়েদের এই অবস্থানগত বদলের নানা স্তর রয়েছে। বৈদিক যুগে নারীর যে উন্নত জীবনের কথা আমরা পড়ি, মধ্যযুগে আবার তাই অবগুণ্ঠনের অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। তারপর আবারও আধুনিক যুগে শিক্ষার আলোয় আলোকিত নারী মুক্তির স্বাদ পায়। ফলে বিভিন্নভাবে মেয়েরা নিজেদের জীবনধারার পরিবর্তন দেখেছে। সমাজ এই সব পরিবর্তনেরই সাক্ষী। এবং আধুনিক স্বাধীন নারীর জীবনযাপনের ধরন সম্বন্ধেও ক্রমশ সমাজ ওয়াকিবহল হচ্ছে। তা মেনেও নিচ্ছে। নারী শিক্ষা ছাড়া হয়তো এগুলো সম্ভব হত না। তার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে প্রণাম জানাতে হয়। শিক্ষিত মেয়েদের গলার স্বর জোরাল হয়েছে বলেই তারা নিজেদের অধিকারগুলো দাবি করতে পারছে। সচেতনতা না থাকলে দাবি আসত না।’ তবু ঐন্দ্রিলার মতে এখনও বহু পথ চলা বাকি। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক বদল আসা বাকি। তবেই গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন হবে নারী।
খলিসানি মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী সৃষ্টি ঘোষালের মতে, ‘সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে সেটাই তো স্বাভাবিক। সমাজ উন্নত হবে, নারী তার সঠিক মর্যাদা পাবে। এতে আর আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? তবে নারীর এই যে সামাজিক অধিকার পাওয়ার প্রতি আগ্রহ ও সচেতনতা, তা সম্পূর্ণই এসেছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বদলের মাধ্যমে। মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠছে এবং নিজেদের মতামত সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হচ্ছে। প্রথম বিশ্বে মহিলারা এই শিক্ষা ও স্বনির্ভরতা বহু আগেই অর্জন করেছিলেন বলে তাঁদের সামাজিক অবস্থান এখন বেশি মাত্রায় উন্নত। কিন্তু আমাদের সমাজেও মেয়েরা আজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। বিবাহে পণপ্রথা বন্ধ হয়েছে, নারী শিক্ষা অবাধ হয়েছে। শিক্ষিত, স্বনির্ভর নারী আর এখন বিয়েকেই জীবনের মোক্ষ বলে মনে করেন না। এই ধরনের বদলগুলোই ক্রমশ মেয়েদের সামাজিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে, ভবিষ্যতে আরও করবে।’
সুদিন আসবেই। আশা এটুকুই।
কমলিনী চক্রবর্তী