দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: সময় বদলেছে। বাঙালির সমাজ জীবনে প্রবেশ করেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সংস্কৃতি। আর তাতেই ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে বাংলার একাধিক ঐতিহ্য। আজকাল সম্পত্তি ক্রয়, নতুন উদ্যোগ শুরু, ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা, মানেই ধনতেরাস। কিন্তু তা কি আদৌ কোনওদিন বাঙালির ছিল? গ্রাম-বাংলার প্রবীণরা বলেন, ধনতেরাস নয়, বাঙালির ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।
সেই প্রাচীনকাল থেকেই অক্ষয় তৃতীয়া বঙ্গীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পৌরাণিক কাহিনী বলে, এই বিশেষ দিনেই সুদামার দারিদ্র দূর করে তাঁকে অঢেল ধন-সম্পদে ভরিয়ে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। আবার এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তবে সার্বিকভাবে অক্ষয় তৃতীয়ার তিথি ‘ক্ষয়হীন’। আর তাই নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য স্থাপন, সোনা-দানা বা ধনসম্পত্তি ক্রয়ের আদর্শ দিন এটিই। অথচ, বর্তমানে বাঙালির জীবনে প্রবলভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারতের সংস্কৃতির ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটে চলেছে। যার ফলে সার্বিকভাবেই ধনতেরাসের গুরুত্ব বাড়লেও, ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে অক্ষয় তৃতীয়া। পয়লা বৈশাখের রীতি তবু টিমটিম করে নিজের অস্তিত্ব জিইয়ে রাখলেও অক্ষয় তৃতীয়ার উদ্যাপন প্রায় চোখেই পড়ে না। রাজ্যব্যাপী এই প্রবণতার ছাপ স্বাভাবিকভাবে ধরা পড়েছে রানাঘাটেও। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সময় অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে রানাঘাটে উৎসবের মেজাজ থাকত। বিশেষত স্টেশন বাজার, কোর্ট মোড় এলাকায় থাকা সারিসারি দোকানে এইদিনেই বিশেষ পুজো, হালখাতা, নতুন বাণিজ্য স্থাপনের রীতি ছিল। কিন্তু আজ সেই সারিবদ্ধ দোকানগুলির মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিতে ছাড়া ‘অক্ষয় তৃতীয়া’ উদ্যাপনের ছবি চোখে পড়ে না। যে কয়েকটি জায়গায় হয়, তারাও স্রেফ নামমাত্র পুজো ছাড়া আর কিছুই করে না। হালখাতার চল প্রায় নেই বললেই চলে। কোর্ট মোড়ের এক ব্যবসায়ী দিলীপ দাস বলেন, এক সময় আমার দোকানে খুব বড় করে পুজো হতো। এই চত্বরের এত দোকানে অক্ষয় তৃতীয়ার উদ্যাপন হতো, যে রানাঘাটের লোকজনের মুখেমুখে ফিরত, ‘অক্ষয় তৃতীয়া মানেই কোর্ট মোড়’। কিন্তু, আজকাল আর কোথায় কি! বাঙালি মনে করে, ধনতেরাস বুঝি সবচেয়ে ভালো দিন। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী, অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য অসীম। সোনাদানা কেনাকাটা, গৃহ নির্মাণ, নতুন বাণিজ্য স্থাপনের মতো যেকোনও উদ্যোগের জন্যই সবচেয়ে শুভদিন এটি। আরেক ব্যবসায়ী অরুণ বিশ্বাস বলেন, এখন ব্যবসায়ীদের কাছে হালখাতা করা মানেই লোকসান। আগে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই বাঙালি কেনাকাটা করত। কিন্তু এখন ধনতেরাসে লোকে ঝাঁটা কেনেন, অথচ অক্ষয় তৃতীয়ার মাহাত্ম্য ভুলে গিয়েছেন।
তবে, কেবলমাত্র উত্তর-পশ্চিম ভারতের সংস্কৃতির ছাপ নয়, আধুনিকতার কারণে সামাজিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণেও অক্ষয় তৃতীয়া ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে। বিশেষত, বর্তমান প্রজন্ম আগ্রহহীন। ফলে, ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ মনে করেন, এভাবেই ধীরে ধীরে অক্ষয় তৃতীয়ার চল হারিয়ে যাবে বাংলার সমাজ থেকে।
ছবি: অভি ঘোষ