Bartaman Logo
১৯ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

অ-মানুষ সেক্রেটারি

এজেন্টিক এআই প্রযুক্তি মানুষের কাজের জগতে বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এটি সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, যা আমাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছে। বিস্তারিত পড়ুন।

অ-মানুষ সেক্রেটারি
  • ১৯ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দীপ্র ভট্টাচার্য: সকালে ঘুম ভাঙতেই আপনার ফোনে একটি নোটিফিকেশন এল— ‘আপনার আজকের ১০টার মিটিং বিকেল ৪টেয় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ির ট্রেনের ওয়েটিং লিস্ট কনফার্ম হয়নি, তাই বিকল্প ফ্লাইট বুক করা হয়েছে। আপনার মায়ের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ঠিক করা হয়েছে। বিদ্যুতের বিলও জমা দেওয়া হয়েছে।’ আপনি কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আপনি এসবের কিছুই করেননি। কয়েক দিন আগে আপনি শুধু আপনার নতুন এআই সহকারীকে বলেছিলেন, ‘আমার কাজগুলো একটু গুছিয়ে দাও তো। অফিস, বাড়ি, ট্রাভেল—সব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি।’ তারপর থেকেই সফটওয়্যারটি যেন ধীরে ধীরে ‘সহকারী’ হয়ে উঠেছে। শুধু প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না, নিজের মতো করে সিদ্ধান্তও নিচ্ছে। পরিস্থিতি বিচার করছে। বিকল্প খুঁজছে। এমনকি জরুরি আর কম জরুরি কাজ আলাদা পর্যন্ত করছে।

Advertisement

কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানে ছিল চ্যাটবট। আপনি প্রশ্ন করতেন, সে উত্তর দিত। ‘আজকের আবহাওয়া কেমন?’, ‘একটা ইমেল লিখে দাও’, ‘ফ্রান্সের রাজধানী কোথায়?’—এই ছিল তার জগৎ। সে ছিল মূলত অত্যন্ত উন্নত এক তথ্য-যন্ত্র। কিন্তু এখন প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন একটি শব্দ ঘুরছে—’এজেন্টিক এআই’। এমন এআই, যে শুধু উত্তর দেয় না, নিজে পরিকল্পনা করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। পার্থক্যটা বোঝার জন্য একটা সাধারণ উদাহরণই যথেষ্ট। ধরা যাক, আপনি সাধারণ এআই-কে বললেন, ‘দার্জিলিং যাওয়ার ভালো ট্রেন কোনটা?’সে আপনাকে ট্রেনের তালিকা দেবে। কিন্তু এজেন্টিক এআই-কে বললেন— ‘আগামী সপ্তাহে কম খরচে দার্জিলিং যেতে চাই’— সে হয়তো আপনার ক্যালেন্ডার দেখে ফাঁকা দিন খুঁজবে, ট্রেন-ফ্লাইট তুলনা করবে, আবহাওয়া দেখবে, হোটেল বেছে দেবে, আপনার বাজেট বুঝবে, তারপর বুকিংও করে ফেলবে। মাঝপথে যদি ট্রেন বাতিল হয়, সে বিকল্পও খুঁজবে। অর্থাৎ, এআই আর ‘উত্তরের মেশিন’ নেই, সে ধীরে ধীরে ‘কাজের কর্মী’ হয়ে উঠছে।
এই বদলটাকেই প্রযুক্তি সংস্থাগুলি পরবর্তী বড়ো বিপ্লব বলে মনে করছে। কারণ মানুষের কাজের জগতে সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন হয় তখনই, যখন কোনো যন্ত্র শুধু নির্দেশ পালন না করে, নিজে থেকে কাজ সামলাতে শুরু করে। ইতিমধ্যে বিশ্বের বড়ো বড়ো প্রযুক্তি সংস্থাগুলি এমন এআই তৈরি করছে, যারা ইমেল পাঠাতে পারে, অনলাইনে বাজার করতে পারে, সফটওয়্যার চালাতে পারে, এমনকি অন্য এআই-কে নির্দেশও দিতে পারে। অনেক কোম্পানিতে পরীক্ষামূলকভাবে এআই ‘ইন্টার্ন’ ব্যবহার শুরু হয়েছে। কোথাও এআই রিপোর্ট লিখছে, কোথাও গ্রাহকের অভিযোগ সামলাচ্ছে, কোথাও আবার ব্যবসার হিসাব বিশ্লেষণ করছে।
একটি মার্কিন স্টার্টআপে সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা প্রযুক্তি মহলে বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। কর্মীরা দেখেন, এআই সিস্টেমটিকে বলা হয়েছিল শুধু বিক্রির রিপোর্ট তৈরি করতে। কিন্তু সে নিজে থেকে পুরানো ডেটা ঘেঁটে বুঝে নেয় যে কয়েকটি পণ্যের বিক্রি দ্রুত কমছে। তারপর সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সতর্কবার্তা তৈরি করে ম্যানেজারদের কাছে পাঠিয়ে দেয়—‘এই প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী তিন মাসে ক্ষতি হতে পারে।’ অর্থাৎ, তাকে ‘সতর্কবার্তা’ পাঠাতে বলা হয়নি। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এটি জরুরি।
এখানেই অনেকের কপালে ভাঁজ পড়ছে। কারণ মানুষ হাজার বছর ধরে যন্ত্র বানিয়েছে নিজের কাজ সহজ করার জন্য। কিন্তু সেই যন্ত্র যদি ধীরে ধীরে মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন সম্পর্কটা বদলে যায়। আপনার ফোন যদি শুধু অ্যালার্ম না দিয়ে বলে—‘আজ আপনি ক্লান্ত, তাই মিটিং বাতিল করেছি’—তাহলে সেটা নিছক সফটওয়্যার থাকে কি? এই প্রশ্ন এখন শুধু বিজ্ঞানীদের নয়, সাধারণ মানুষেরও।
এজেন্টিক এআই-র সবচেয়ে বড়ো শক্তি হল, সে লক্ষ্য বুঝতে পারে। আপনি তাকে প্রতিটি ধাপ বলে দিতে বাধ্য নন। আগে কম্পিউটারকে বলতে হত—প্রথমে এটা করো, তারপর ওটা। এখন এআই-কে শুধু শেষ লক্ষ্য বললেই অনেক ক্ষেত্রে সে নিজে পথ খুঁজে নিচ্ছে। শুনতে সুবিধাজনক। কিন্তু এর মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য ঝুঁকিও লুকিয়ে আছে। কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, কখনও কখনও তা মানবিক বিষয়ও বটে। একজন মানুষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আবেগ, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা—সব মেশায়। এআই কি তা পারে? যদি পারে, কতটা পারে? আর যদি না পারে, তাহলে আমরা কতটা দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত? আর যখন সে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে, তখন সে কি শুধুই ‘সহকারী’ থাকবে? নাকি ধীরে ধীরে আপনার আচরণকেও প্রভাবিত করতে শুরু করবে? এমন নানান প্রশ্ন উঠে আসছে।
প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিটি বড়ো আবিষ্কার মানুষের জীবন সহজ করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে মানুষের অভ্যাসও বদলে দিয়েছে। ক্যালকুলেটর আসার পর মানুষ মাথায় হিসাব কম করে। জিপিএস আসার পর রাস্তা মনে রাখার প্রয়োজন কমেছে। এখন প্রশ্ন হল—যদি এআই আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তাহলে কি আমরা ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস হারাব? সমস্যা হল, যে মুহূর্তে সফটওয়্যার নিজে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, সে আর নিছক সফটওয়্যার থাকে না।
এজেন্টিক এআই নিয়ে সবচেয়ে বড়ো আলোড়নের জায়গা সম্ভবত কর্মক্ষেত্রে। কারণ এই প্রযুক্তি শুধু তথ্য দেয় না, কাজের দায়িত্বও নিতে শুরু করেছে। আর তার ফলে বদলে যাচ্ছে ‘কাজ’ শব্দটার অর্থ। অর্থাৎ অফিসে কেউ নেই, কিন্তু ‘সহকর্মী’ কাজ করছে। এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ মানুষ এআই-কে দেখেছেন একটি উন্নত টুল হিসাবে। কিন্তু এজেন্টিক এআই নিজেকে ‘টুল’ থেকে ধীরে ধীরে ‘সহকারী’-তে বদলে ফেলছে। কোথাও সে ইন্টার্ন, কোথাও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, কোথাও আবার প্রজেক্ট ম্যানেজার।
ধরা যাক, একজন আইনজীবী আগে একটি মামলার পুরানো নজির খুঁজতে তিনজন জুনিয়রকে কাজে লাগাতেন। এখন এআই কয়েক মিনিটে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি পড়ে মূল পয়েন্ট বের করে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, কোন যুক্তি আদালতে বেশি কার্যকর হতে পারে, তার সম্ভাবনাও বিশ্লেষণ করতে পারে। একজন চিকিৎসকের সহকারীর ক্ষেত্রেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বহু হাসপাতালে এআই এখন রোগীর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করছে, সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করছে, এমনকি ডাক্তারকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—‘এই রোগীর আগের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছিল।’ অর্থাৎ এআই শুধু ‘তথ্যভাণ্ডার’ নয়, সে যেন এক সতর্ক, নিরলস সহকারী।
সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তন হয়তো ঘটছে ছোটো ব্যবসার ক্ষেত্রে। আগে একটি ছোটো সংস্থার পক্ষে বড়ো কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কঠিন ছিল। কারণ লোকবল কম, সময় কম, অর্থ কম। এখন একজন মানুষ কয়েকটি এআই এজেন্ট ব্যবহার করে প্রায় ছোটোখাটো ‘ডিজিটাল টিম’ তৈরি করতে পারছেন। একজন তরুণ উদ্যোক্তার গল্প প্রযুক্তি মহলে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তিনি অনলাইনে হাতে বানানো চামড়ার ব্যাগ বিক্রি করতেন। ব্যবসা খুব ছোটো। কর্মচারী বলতে তিনি একাই। পরে তিনি এআই ব্যবহার শুরু করেন। একটি এআই গ্রাহকদের ইমেলের উত্তর দেয়, আরেকটি বিজ্ঞাপনের লেখা তৈরি করে, তৃতীয়টি বিক্রির হিসাব বিশ্লেষণ করে বলে—কোন শহরে কোন ডিজাইনের ব্যাগ বেশি জনপ্রিয়। পরে তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি আসলে একা নই। আমার সঙ্গে পাঁচজন এআই কাজ করছে।’ এই জায়গাটাই এজেন্টিক এআই-র সবচেয়ে নাটকীয় দিক। প্রযুক্তি প্রথমবার এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে একজন মানুষ বহু ‘ডিজিটাল কর্মী’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
কিন্তু এখানেই শুরু হচ্ছে ভয়ও। কারণ এআই যদি রিপোর্ট লিখতে পারে, কোড তৈরি করতে পারে, গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে পারে, হিসাব সামলাতে পারে—তাহলে মানুষের ভূমিকা কোথায় থাকবে? প্রশ্নটা নতুন নয়। শিল্পবিপ্লবের সময়েও মানুষ ভয় পেয়েছিল, যন্ত্র চাকরি কেড়ে নেবে। অনেক চাকরি সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন কাজও তৈরি হয়েছিল। এবারও হয়তো তাই হবে। তবে পার্থক্য হল, এই প্রথম যন্ত্র শুধু শারীরিক শ্রম নয়, মানসিক শ্রমেও মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সম্প্রতি বলছিলেন, আগে তিনি দিনে ৫০০ লাইন কোড লিখতেন। এখন এআই-র সাহায্যে ৫০০০ লাইন তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হল, কোম্পানি তখন ভাবছে—’তাহলে এত কর্মী লাগবে কেন?’ অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, এআই মানুষের কাজ কেড়ে নেবে না, বরং কাজের ধরন বদলে দেবে। হয়তো ভবিষ্যতের দক্ষ কর্মী সেই ব্যক্তি, যিনি এআই-কে সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। অর্থাৎ মানুষ নিজে কম কাজ করবে, কিন্তু এআই-দের ‘ম্যানেজার’ হবে। তবে এ ছবির অন্ধকার দিকও আছে। কিছুদিন আগে একটি বিদেশি কোম্পানিতে এআই-চালিত গ্রাহকসেবা সফটওয়্যার ভুল করে কয়েকজন গ্রাহককে এমন ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেয়, যা কোম্পানির নীতির মধ্যে ছিল না। পরে দেখা যায়, এআই নিজে থেকে ‘গ্রাহককে খুশি রাখার’ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আরও ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাও আছে। যদি কোনো এআই ভুল তথ্য ছড়ায়? যদি সে আর্থিক সিদ্ধান্তে ভুল করে? যদি চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শে বিপজ্জনক ভুল হয়? সমস্যা হল, মানুষ ভুল করলে আমরা কারণ বুঝতে পারি। কিন্তু এআই কেন কোনো সিদ্ধান্ত নিল, অনেক সময়েই তার নির্মাতারাও সেই কারণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেন না। 
বর্তমানে সামাজিক সম্পর্কেও ঢুকে পড়ছে এআই। জাপান ও আমেরিকায় একাকী বৃদ্ধদের জন্য এআই এজেন্ট সঙ্গী ব্যবহার শুরু হয়েছে। তারা গল্প করে, ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, এমনকি জন্মদিনে শুভেচ্ছাও জানায়। অনেকেই বলছেন, ‘মানুষের চেয়ে এআই বেশি ধৈর্য সহকারে কথা শোনে।’ শুনতে আরামদায়ক। আবার কিছুটা অস্বস্তিকরও বটে। কারণ মানুষ প্রথমবার এমন এক সহকারী পেল, যে ক্লান্ত হয় না, বেতন চায় না, ছুটি নেয় না—কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের চেয়েও বেশি দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
এর ফলে আপনার জীবন হয়তো সহজ হবে। আগের মতো ছোটোখাটো কাজের চাপ থাকবে না। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আরও একটি প্রশ্ন মাথায় আসে, এই সিদ্ধান্তগুলি কি সত্যিই ‘আপনার’ সিদ্ধান্ত? এজেন্টিক এআই নিয়ে সবচেয়ে গভীর বিতর্ক আসলে এখানেই। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, এআই তত মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে উঠে আসছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—মানুষ কি ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাবে? কারণ সিদ্ধান্ত নেওয়া শুধু কাজের ব্যাপার নয়, সেটি মানুষের স্বাধীনতার অংশ।
আজ আমরা ফোনের জিপিএস ছাড়া রাস্তা খুঁজতে অস্বস্তি বোধ করি। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় আমরা কোন খবর দেখব। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমাদের পছন্দ বুঝে সিনেমা সাজেস্ট করে। অর্থাৎ প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই আমাদের পছন্দ ও আচরণকে প্রভাবিত করছে। এজেন্টিক এআই সেই প্রবণতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সমস্যা হল, এআই যত বেশি কার্যকর হবে, মানুষ তত বেশি তার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।
ইতিমধ্যে বিশ্বের বহু প্রযুক্তি সংস্থা এমন এআই তৈরির চেষ্টা করছে, যারা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত জীবন গভীরভাবে বুঝতে পারে। তারা চায় এআই যেন আপনার ‘ডিজিটাল প্রতিনিধি’ হয়ে ওঠে—যে আপনার হয়ে অনলাইনে বাজার করবে, ট্যাক্স ফাইল করবে, চাকরির আবেদন করবে, ভ্রমণের পরিকল্পনা করবে। শুনতে স্বর্গীয় সুবিধার মতো। কিন্তু এর বিনিময়ে এআই-কে আপনার সম্পর্কে তথ্য জানতে হবে। আপনার অর্থনৈতিক অবস্থা, স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, রাজনৈতিক মত, ব্যক্তিগত অভ্যাস—সবই তখন তার নাগালে থাকবে। প্রযুক্তির ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সফটওয়্যার মানুষের জীবনকে এত বিস্তৃতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
আর এখানেই গোপনীয়তা নিয়ে ভয় তৈরি হচ্ছে। ধরা যাক, কোনো এআই কোম্পানি জানে আপনি রাতে একা থাকলে বেশি অনলাইন শপিং করেন। তখন কি সে আপনাকে ইচ্ছে করে আরও বেশি বিজ্ঞাপন দেখাবে? যদি এআই বুঝে যায় কোন ধরনের খবর আপনাকে উত্তেজিত করে, তাহলে কি সে সেই ধরনের কনটেন্টই বেশি দেখাবে, কারণ তাতে আপনি স্ক্রিনে বেশি সময় কাটাবেন? শুধু ব্যবসা নয়, রাজনীতিতেও এর প্রভাব ভয়ঙ্কর হতে পারে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রচার হয়তো আর সবার জন্য একরকম হবে না। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত ভয়, রাগ, পছন্দ অনুযায়ী এআই আলাদা আলাদা বার্তা তৈরি   করবে।
আরেকটি বিপজ্জনক দিক হল ‘ভুল’। এআই অত্যন্ত বুদ্ধিমান হতে পারে, কিন্তু সে সবসময় সঠিক হবে—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং অনেক সময় এআই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেয়। যদি কোনো এজেন্টিক এআই আপনার হয়ে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়? যদি ভুল চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়? যদি কোনো স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ভুল করে কাউকে চাকরির জন্য ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করে? সমস্যা হল, এআই-র সিদ্ধান্তের দায় কার উপর বর্তাবে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
আরও একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন হয়তো আমাদের অজান্তেই ঘটবে—মানুষের দক্ষতা কমে যাওয়া। ক্যালকুলেটর আসার পর মানুষ মাথায় কম হিসাব করে। জিপিএস-এর উপর নির্ভর করতে করতে অনেকেই রাস্তা মনে রাখার ক্ষমতা হারিয়েছেন। ঠিক তেমনই, যদি এআই আমাদের হয়ে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তাহলে কি মানুষ ধীরে ধীরে নিজের বিচার-ক্ষমতার চর্চা কমিয়ে দেবে? একদল গবেষক বলছেন, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো বিপদ ‘সুপার ইন্টেলিজেন্ট এআই’ নয়, বরং ‘অতিরিক্ত সুবিধাজনক এআই’। কারণ মানুষ স্বভাবতই আরামের দিকে ঝোঁকে। যদি কোনো সফটওয়্যার সব কাজ করে দেয়, বেশিরভাগ মানুষই হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে চাইবেন। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড়ো শক্তিই তো সিদ্ধান্ত নেওয়া—এমনকি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও। মানুষ ভুল করে, আবেগে ভাসে, দ্বিধায় পড়ে, আবার শেখেও। সেই অসম্পূর্ণতাই তাঁকে মানুষ করে তোলে। এআই হয়তো দ্রুত, নিখুঁত ও নিরলস হতে পারে, কিন্তু জীবনের সব সিদ্ধান্ত কি শুধুই দক্ষতা দিয়ে মাপা যায়? হয়তো ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হবে মানুষ নিজের ইচ্ছা আর বিবেক নিয়ে কতটা টিকে রইল? কারণ প্রযুক্তির প্রকৃত সার্থকতা তার শক্তিতে নয়, মানুষের ভিতরের মানুষটাকে কতটা অক্ষত রাখতে পারল, সেটাতেই।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ