ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বিশ্বের সবথেকে বড় পুরস্কারের নাম কী? তোমরা সকলেই এককথায় উত্তর দেবে ‘নোবেল প্রাইজ’। আলফ্রেড নোবেলের নামাঙ্কিত এই পুরস্কার প্রত্যেক বছরই দেওয়া হয়। কিন্তু এই পুরস্কারের অস্তিত্বই থাকত না, যদি না সেদিন সকালে খবরের কাগজের স্ট্যান্ডের দিকে চোখ পড়ত আলফ্রেডের। ঘটনাটি ১৮৮৮ সালের ১২ জুন। সেদিন সকালে সংবাদপত্রে বড় বড় হরফে নিজের নাম দেখে চমকে উঠলেন আলফ্রেড নোবেল। ছাপা হয়েছে তাঁরই মৃত্যুসংবাদ! শিরোনামে লেখা ‘মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীর মৃত্যু’। ফ্রান্সের একটি পত্রিকা ভুল করে আলফ্রেডের ভাইয়ের মৃত্যুকে তাঁর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিল। সেই সময়ই আলফ্রেড নোবেল বুঝে গিয়েছিলেন তিনি মারা গেলে পৃথিবী তাকে কীভাবে মনে রাখবে— ‘মৃত্যু ব্যবসায়ী’! আসলে তিনি ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন। এই ডিনামাইট বিস্ফোরণের জেরে বহু মানুষের মৃত্যু হতো। তাই আলফ্রেডকে ‘মৃত্যু ব্যবসায়ী’ বলে ওই পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল।
তখনই তিনি শপথ নেন তাঁর ভাবমূর্তি বদলাতে হবে। যার ফলে মানবদরদি আলফ্রেডের ছায়ায় হারিয়ে গেলেন বিজ্ঞানী আলফ্রেড, ব্যবসায়ী আলফ্রেড। কী-ই না করেছেন তিনি একা হাতে! ৩৫৫টি আবিষ্কারের পেটেন্ট, লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, নাটক।
নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক
সুইডেনের বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল ১৮৯৫ সালে একটি উইল করে যান। আর সেই উইলের জন্যই তিনি আজও বিশ্ববিখ্যাত। মৃত্যুর পর দেখা যায় উইলে আত্মীয়দের জন্য প্রায় কিছুই রেখে যাননি। বরং উইলে একটি ফাউন্ডেশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। নোবেল ফাউন্ডেশন। সেই ফাউন্ডেশনের কাজ হবে প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাবিদ্যা ও সাহিত্য ক্ষেত্রের সেরা ব্যক্তিত্বকে পুরস্কৃত করা। এই তালিকায় ১৯০৫ সালে যুক্ত হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। আর ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতির জন্য আলফ্রেডের স্মৃতির উদ্দেশে পুরস্কার দেয় সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অব সুইডেন। নোবেলেরই সমমানের পুরস্কার এটি। বর্তমানে প্রত্যেক পুরস্কারের জন্য সনদ ও সোনার মেডেলসহ এক কোটি দশ লক্ষ ক্রোনা বা নয় লক্ষ মার্কিন ডলার অর্থ প্রদান হয়।
নোবেল পদক কী দিয়ে তৈরি?
১৯০১ সালে যখন নোবেল পুরস্কার চালু করা হয়, তখন পদকটি তৈরি করা হতো খাঁটি সোনা দিয়ে। কিন্তু ১৯৮০ সাল থেকে পদক তৈরির ধরনে কিছুটা পরিবর্তন আসে। বর্তমানে নোবেল পদকটি মূলত ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং এর ওপর একটি পাতলা স্তরে ২৪ ক্যারেট খাঁটি সোনার প্রলেপ থাকে। এই পদ্ধতিতে পদকটি দেখতে সম্পূর্ণ সোনার মতো মনে হলেও এটি মূলত সোনার একটি সংকর ধাতু। যার ওজন ১৭৫ গ্রাম।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া
নোবেল পুরস্কারের জন্য কাউকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি নোবেল কমিটিগুলো নিজেরা করে না। এই কাজটি করে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। তাঁরা কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করলে তাঁকে বা ওই প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করতে পারেন। তবে কেউ তাঁর নিজের নাম বা প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনীত করতে পারবেন না। বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের যেকোনও দেশের মানুষই এই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
প্রথম নোবেল পুরস্কার
প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয় ১৯০১ সালে। সেই বছর পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান উইলহেলম কনরাড রন্টজেন (জার্মানি), রসায়নে জ্যাকোবাস হেনরিকাস ভ্যান্ট হফ (নেদারল্যান্ডস), চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমিল ফন বেহরিং (জার্মানি), সাহিত্যে সুলি প্রুধোম (ফ্রান্স)। প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার পান জিন হেনরি ডুনান্ট (সুইজারল্যান্ড) ও ফ্রেডেরিক প্যাসি (ফ্রান্স)।
শান্তি পুরস্কারের নেপথ্যে এক নারীর অবদান
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিলেন অস্ট্রিয়ান শান্তিকর্মী বার্থা ফন সুটনার। যিনি প্রথম নারী হিসেবে শান্তিতে নোবেল পান। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, তার প্রভাবেই নোবেল উইলে শান্তি পুরস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভারতীয় নোবেল বিজয়ীদের নাম
এশিয়া থেকে প্রথম নোবেল পুরস্কার পেয়ে বিশ্বে নজির গড়েন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই প্রথম অ-ইউরোপীয় ব্যক্তি যিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯৩০ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান সি ভি রমন। ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন মাদার টেরিজা। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পান আর এক বাঙালি অমর্ত্য সেন। ২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান কৈলাস সত্যার্থী। এছাড়াও ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে ১৯৬৮ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পান হরগোবিন্দ খুরানা। ১৯৮৩ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল জয় করেন সুব্রহ্মণ্যম চন্দ্রশেখর। ভেঙ্কটরমন রামাকৃষ্ণণ ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। সর্বশেষ ২০১৯ সালে আর এক বাঙালি অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। এছাড়াও ভারতের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে এমন নোবেল প্রাপকেরা হলেন— বিজ্ঞানী রোনাল্ড রস, রুডিয়ার্ড কিপলিং, চতুর্দশ দলাই লামা,
ভি এস নাইপল।