নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘ঝালমুড়ি, ঝালমুড়ি...’ ডাক নেই। ‘লেবু চায় লাগবে, লেবু চায়...’ শোনা যাচ্ছে না। ট্রেন গতি নেওয়ার পর কাচে ঢাকা জানলার ওপাশে চেনা জায়গাগুলি সরে সরে যাচ্ছে অন্যান্য দিনের মতোই। কিন্তু কামরায় ঝালমুড়ির সঙ্গে জং ধরা লোহার গন্ধ, ছানার জলের টক গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা ফল-সব্জির গন্ধ নেই। কারণ এ লোকাল এসি। এটি ঝকঝকে, পরিষ্কার, ঠান্ডা এবং অচেনা। অনেকে বলছেন, ‘যাচ্ছি অফিস। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন ছুটিতে দার্জিলিং যাচ্ছি।’ ‘ভাড়া দিতে কিন্তু গা কড়কড় করছে’-বক্তব্য অনেক যাত্রীর। রানাঘাট থেকে শিয়ালদহ এসি লোকাল চালু হয়েছে সবে। মঙ্গলবার দেখা গেল ট্রেনে বসবার সিট অমিল। অনেকে দাঁড়িয়েই গেলেন কলকাতা।
এ ট্রেনে চেনা লোকগুলিই যেন অচেনা। সিটে তিনজন চুপচাপ বসে। ‘এ সিটে চারজন বসে। সরে বসুন’-কেউ তাগাদা দিচ্ছেন না। ঠেলাঠেলি নেই। বচসা নেই। আগস্টের পচা গরমে এসির ঠান্ডায় সকলেরই মেজাজ খুশ। ‘কাজে বেশ মন বসছে বুঝলেন’-সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে বললেন কয়েকজন নিত্যযাত্রী। তবে গা কড়কড় করার বিষয়টি হেলাফেলা করার মতো নয়। কাঁচরাপাড়া থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত টিকিটের ভাড়া ৯৫ টাকা। আর এই রুটে সর্বোচ্চ ভাড়া ১২০। সর্বনিম্ন ৩৫ টাকা। কয়েকজনের বক্তব্য, ‘ভাড়া বেশি হোক। এরকম পরিচ্ছন্ন ট্রেন হলে ওঠাই যায়।’ কেউ বলেন, ‘বড্ড বেশি ভাড়া।’ অনেকে বললেন, ‘এসি ট্রেনে দাঁড়িয়ে যেতেও সমস্যা হয় না। ১০ মিনিট লেট করলেও রাগ হয় না।’ নৈহাটির কয়েকজন প্যাসেঞ্জার বলেন, ‘এই ট্রেনে উঠলে দেখছি চাদর বা সোয়েটার নিতে হবে।’ ট্রেনে কালো কোটের টিকিট পরীক্ষকদের ভালো ভিড়। সৈকত রায় নামে বারাকপুরের এক বাসিন্দা বললেন, ‘এসিতে না উঠলে এত টিটিই দেখতেই পেতাম না।’ গোটা ট্রেনে কড়া নজরদারি পরীক্ষকদের। তাঁদের দেখেই যাত্রীরা আগ বাড়িয়ে নিজের নিজের টিকিট দেখিয়ে নিচ্ছেন। কেউ টিটিই’কে বললেন, ‘সিটে গদি থাকলে ভালো হতো।’ কেউ বললেন, ‘ট্রেনে যদি বাথরুম থাকত। তাহলে চিন্তা ছিল না।’ এদিকে সাধারণ ট্রেনের টিকিট নিয়ে এসি ট্রেনে উঠে পড়ছেন অনেকে। তাঁদের গুনতে হয়েছে মোটা টাকা জরিমানা।
কাঁচরাপাড়া স্টেশনে ঘোষণা, ‘এসি ট্রেনের জন্য বৈধ টিকিট কেটে উঠুন।’ তবুও এক দম্পতি সাধারণ টিকিটেই উঠে পড়লেন। দু’জনের টিকিটের জন্য তাঁদের ফাইন দিতে হল ৬৬০ টাকা। পরীক্ষকের স্পষ্ট বক্তব্য, ‘ফাইন না নিলে একই ভুল আবার করবেন।’ সবমিলিয়ে এসি লোকাল যেন অন্য গ্রহ। সে ট্রেনে হকারের হাঁক নেই, পরিচ্ছন্ন, ঠান্ডা। তাতে চেপে অফিস গিয়ে মনমেজাজ দিব্যি খুশ নিত্যযাত্রীদের।