নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নাচতে নাচতে লোকজনের বক্তব্য, ‘ছেলে না মেয়ে, এটা বড় কথা নয়। দেশ ফাইনাল খেলছে। এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই নেই। এতদিন উৎসব করা হয়নি। ঠিক করিনি আমরা। আজ সুদে আসলে পুষিয়ে নেব।’ কয়েকজন ইন্ডিয়ার জার্সি পরে নিয়েছেন বিকেলের আগেই। সবুজ-সাদা-গেরুয়া বেলুন দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে শহরের বহু এলাকা। খেলা শুরুর আগে চলছে উদ্দাম নৃত্য। লুকিয়েচুরিয়ে মাঝে মধ্যে ফেটে উঠছে পটকাও। এসবের মাঝেই পর্দায় ভেসে উঠল হরমনপ্রীত কউর এগিয়ে চলেছেন টস করতে। পথচলতি মানুষ একবার উঁকি দিয়ে যাচ্ছেন। মেয়েদের বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে এমন উন্মাদনা দেখে উত্তেজনায় ফুটছে কলকাতা। যাদবপুরে দাঁড়িয়ে এক প্রবীণ বললেন, ‘এমন তো দেখিনি আগে। খুব, খুব ভালো লাগছে।’ ফাইনাল ম্যাচ শুরুর যখন দেরি হচ্ছে, সেসময় সকলে একসঙ্গে বসে টি ২০ খেলাও উপভোগ করলেন। পরক্ষণেই মহিলাদের ফাইনাল শুরু হতে চ্যানেল ঘুরে গেল। সবার চোখ মেয়েদের ক্রিকেটে। তখন উন্মাদনায় কাঁপছে গোটা শহর।
মেয়েদের ফাইনাল খেলায় রাজনীতির অনুপ্রবেশও হয়েছে। বাম ছাত্র-যুব সংগঠনের তরফে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, বিক্রমগড় ও বেহালা শীলপাড়ায় জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বাম নেতাকর্মীদের বক্তব্য, ‘দেশজুড়ে বিজেপি-আরএসএস মহিলাদের মনুবাদী কায়দায় আটকাতে চাইছে। তাই এটা শুধু মেয়েদের ক্রিকেট নয়, গোটা ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার ঘটনা।’ সেসব কথাবার্তা ঘোষণাও করা হচ্ছে। আর ঘোষণা ভেদ করে বারবার পথচলতিদের বক্তব্য কানে আসছে, ‘দাদা স্কোর কত হল? জেমাইমা কী নেমেছে?’
খাবার ডেলিভারি দিতে গিয়ে কিছু মিনিট দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন ডেলিভারি বয়। পথে যেতে মানুষজনেরও একই প্রশ্ন, ‘স্কোর কত হল?’ খাবার দিতে যাওয়ার পথে এক ডেলিভারি বয় উত্তর দিয়ে গেলেন, ‘খেলা দেখার সময় পাচ্ছি না। একের পর এক ডেলিভারি আসছে। তাই রাস্তায় খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়ছি যে কোনও একটা স্ক্রিনের সামনে।’
বিক্রমগড়ে যখন এমন দৃশ্য সেসময় যাদবপুর এইটবি’র সামনে আবার বাজছে তাসা। মাঝবয়সি মহিলা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলে গেলেন, ‘মেয়েগুলো যেন শেষপর্যন্ত জিতে ফেরে ভগবান। বাড়িতে ছেলেগুলো জার্সি পরে বসে রয়েছে দেশকে জিততে দেখার অপেক্ষায়।’ একই দৃশ্য দেখা গেল বেহালায়। ওদিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে পার্কিং প্লটে জায়ান্ট স্ক্রিন বসানো নিয়ে দুপুর থেকে তোড়জোড় চলেছে। অন্যদিকে বৃষ্টির জন্য খেলা পিছিয়ে যাচ্ছে। তবুও একে একে পতাকা, তেরঙ্গা রিবন চলে এল। মাদুরও চলে এল পেতে বসার জন্য। এবার শুধু খেলা শুরু হওয়ার অপেক্ষা। তারপরই শুরু হয়ে গেল তুমুল হইচই।
দক্ষিণ কলকাতা শুধু নয়, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে একেবারে চেনা ঢঙে ক্লাবগুলোর টেলিভিশন সেট বাইরে করে রাখা হয়েছে। খেলা যত এগিয়েছে, টেনশন সঙ্গী হয়েছে শহরবাসীর। ভারতের উইকেট একটু দ্রুত পড়লে কপালে চিন্তার ভাঁজ। পরক্ষণেই চার-ছয় মারলে হুল্লোড়ের ছবি। কোনও কোনও ক্লাবে দেখা গিয়েছে, এদিন রাতের জন্য গরম ভাত আর মাংস রান্না শুরু হয়ে গিয়েছে। এর ফাঁকে কখনও ইন্টারনেটে সমস্যা, আটকে আটকে যাচ্ছে স্ক্রিন। তখন আবার অন্য হইচই। বিক্রমগড়ে এক ব্যক্তি বললেন, ‘এটাই তো এক সঙ্গে থাকা। দেশের জন্য থাকা। দেশের মেয়েদের পাশে থাকা। আজ আনন্দ কোনও বাঁধ মানবে না।’