নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: দেশবাসীর জন্য আবার উপদেশ মোদির—সোনা কিনবেন না। বিদেশ ভ্রমণ করবেন না। আর সেই উপদেশ তিনি দিলেন বিদেশ থেকেই। মঙ্গলবার তিনি ছিলেন কিরঘিজস্তানে। ৮ মাসে ১৬ দেশ। ১২ বছরে ৮২ সফর। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদির বিদেশযাত্রার তালিকা চোখে পড়ার মতো। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর অথবা বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বারবার বিদেশ যান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এক্ষেত্রেও সবার উপরে। তিনি এখনও বিদেশে। সংসদীয়মন্ত্রী কিরেন রিজিুজুও দেশে নেই। এরমধ্যেই ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার পূর্বাভাস ছাপিয়ে পৌঁছেছে ৭.৮ শতাংশে। আর তাই মোদির বার্তা, উজ্জ্বল অর্থনীতির কারণে গোটা দেশ আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। কিন্তু এই জোয়ার কীভাবে ধরে রাখা যাবে? একমাত্র ‘আত্মনির্ভরতা’র মাধ্যমে। আম জনতাকেই শপথ নিতে হবে আত্মনির্ভরতার। কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে। সংযম দেখাতে হবে। কেমন সেই সংযম? মোদি বললেন, ‘নিছক ভ্রমণের জন্য কেউ বিদেশ যাবেন না। বিদেশে অনেকে বিয়ের অনুষ্ঠান করেন—ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। সব বন্ধ করে দিন। সোনাও কিনবেন না। স্বদেশের কথা ভাবুন। স্বদেশি কিনুন।’
ঠিক এই কথাই তিনি আগে বলেছেন। আবার বললেন। অর্থাৎ ছবিটা স্পষ্ট, পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জিডিপি বৃদ্ধির হার অপ্রত্যাশিতভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হল, দেশবাসীর ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়া, শিল্পোৎপাদন থেকে কৃষি বিভিন্ন সেক্টরের উন্নতি, বাজারে অর্থের লেনদেন বৃদ্ধি। কিন্তু তার সবটাই কি আত্মনির্ভরতার জন্য? এই প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই ‘আনন্দে’ মঙ্গলবার দিনভর মোদি সরকার এবং এনডিএর নেতা-মন্ত্রীরা জয়ধ্বনি দিয়ে গিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিয়ে মানেই সোনার অলংকার কেনা। সেখানে ‘খুব দরকার না হলে সোনা কিনবেন না’ কথাটির অর্থ কী? কারণ একটাই। সোনা এবং পেট্রল-ডিজেল সবথেকে বেশি আমদানি হয়। আর সেজন্য প্রয়োজন ডলার। অর্থাৎ, চাপ বাড়ে ভারতীয় বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে। ফল? টাকার পতন। একইভাবে বিদেশ ভ্রমণের অর্থই হল, সর্বাগ্রে বিদেশি মুদ্রা নিয়ে যাওয়া। রিজার্ভ ব্যাংকে যে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার আছে, তা যাতে খুব বেশি খরচ না হয়, অর্থাৎ চাহিদা না বৃদ্ধি পায়, সেটাই লক্ষ্য সরকারের। অতএব আত্মনির্ভরতা এবং স্বদেশির মন্ত্র। দেশের ভাণ্ডারে যত বেশি বিদেশি মুদ্রা আসবে এবং স্বদেশি পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বাড়বে (যেমন স্বদেশি পণ্য কেনা, স্বদেশি পর্যটন), ততই ফুলেফেঁপে উঠবে বাজার অর্থনীতি। টাকার শক্তিবৃদ্ধি হবে। সোজা কথায়, টাকার পতন রুখতে কৃচ্ছ্রসাধনের দায় নিতে হবে করদাতা আম জনতাকেই। বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী রাখার দায়িত্বও আম জনতার। সংকটের সময় রান্নার গ্যাস কম খরচের দায় নিতে হয়েছে আম জনতাকে। অশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশে বেশি দামে পেট্রল-ডিজেল কেনার সহনশীলতা দেখাবে আম জনতা। ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়ের বিয়েতে সোনার অলংকার কেনা ও উপহারের আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হবে আম জনতাই। কংগ্রেস সহ বিরোধীদের বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির চাপে মানুষ নাজেহাল। কর্মসংস্থান তলানিতে। জিএসটি আদায়ও তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাহলে জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে মোদি সরকার এত জয়ধ্বনি দিচ্ছে কেন? বিরোধীদের প্রশ্ন, জিডিপির পরিসংখ্যান এবং আম জনতার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে এত বিপুল ফারাক কেন?