নির্মাল্য সেনগুপ্ত, রায়গঞ্জ: তুলাইপাঞ্জি চাষের উর্বর ভূমিতে একদা হতো নীলচাষ। নীলকর সাহেবদের নিদারুণ অত্যাচার, চাবুকের আঘাত সহ্য করে হতদরিদ্র চাষিরা কার্যত বাধ্য হয়ে চাষ করতেন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ফলানো সেই নীল কেউ গোরুর গাড়িতে, কেউ মাথায় করে বয়ে আনতেন নীলকুঠিতে। জমা হতো একের পর এক চৌবাচ্চায়। পরে যা দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নীল তৈরি করাতেন নীলকর সাহেবরা। ব্রিটিশ শাসনকালের সেই নিদর্শন আজও রয়ে গিয়েছে করণদিঘি ব্লকের সাবধান এলাকার নীলকুঠি এলাকায়। নীল জমা করার চৌবাচ্চা থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির উনান। প্রশাসনের উদ্যোগে বর্তমানে সেই কুঠি সংরক্ষিত হয়েছে। যেখানে এখনও ইতিহাস উৎসাহী মানুষজন ও পর্যটকদের ঢল নামে।
ইতিহাস পর্যবেক্ষকদের মতে, অন্তত ১৫০ বছর আগে তৎকালীন দিনাজপুর, বর্তমান উত্তর দিনাজপুর জেলায় ধাপে ধাপে তিনটি নীলকুঠি স্থাপিত হয়। যার মধ্যে দু’টি কালের গর্ভে প্রায় লুপ্ত। তবে এখনও উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদিঘি ব্লকের সাবধান এলাকায় সেই নীলকুঠি রয়ে গিয়েছে। যা হেরিটেজ তকমা পেয়েছে। লুপ্তপ্রায় দু’টি নীলকুঠির একটি রায়গঞ্জ শহরের সুদর্শনপুর এলাকায়, দ্বিতীয়টি ইটাহার ব্লকের চূড়ামনে মহানন্দা নদীর তীরে স্থাপিত হয়েছিল।
উত্তর দিনাজপুর জেলার ইতিহাস পর্যবেক্ষক বৃন্দাবন ঘোষ বলেন, জেলার মাটি বরাবরই যথেষ্ট উর্বর। শস্য শ্যমলা এই ভূমিতে যেখানে তুলাইপাঞ্জি ধান চাষ হয়, সেখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে জমিদার, জোতদার, বিদেশি শাসকদের আগমন হয়েছিল। ব্রিটিশরা উত্তর দিনাজপুরে কুলিক নদীর পাড়ে সুদর্শনপুরে, ইটাহারে মহানন্দা নদীর তীরে চূড়ামনে এবং করণদিঘিতে সাবধান এলাকায় নীলকুঠি স্থাপন করে নীল চাষ শুরু করে। সেই নীল বিদেশে পাঠানো হতো। কালের নিয়মে সুদর্শনপুর ও চূড়ামনের নীলকুঠি কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তবে, করণদিঘির নীলকুঠি স্থানীয় মানুষজন, ইতিহাসপ্রেমীদের প্রচেষ্টা, প্রশাসনের উদ্যোগে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে নীল রাখার কয়েকটি চৌবাচ্চা, বিশালাকৃতির চুল্লি বা উনান রয়েছে। এখন ওই নীলকুঠি হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য সংরক্ষিত হয়েছে। যা আজও তৎকালীন স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ব্রিটিশদের অত্যাচার, দেশের মানুষের সংগ্রামের স্মৃতি বহন করে চলেছে। নিজস্ব চিত্র