নাম হিমাংশী। মাত্র সাত দিনের বিবাহিত জীবনে ইতি টেনে দিয়েছিল জঙ্গিরা। ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসবাদী হামলায় নৌসেনার লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়ালের গুলিবিদ্ধ দেহটা পড়েছিল মাটিতে। পাশে স্থির হয়ে বসে তাঁর স্ত্রী হিমাংশী। এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়তেই সেদিন সহানুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়েছিল আসমুদ্রহিমাচল। সেই মহিলাকেই দু’দিন বাদে চরম বিদ্রুপ আর কদর্য আক্রমণের মুখে পড়তে হয়! হিমাংশীর ‘অপরাধ’ ছিল পহেলগাঁওয়ের ঘটনার পরে মুসলিম সম্প্রদায় ও কাশ্মীরিদের বাক্যবাণে আক্রমণ করা শুরু হলে তিনি আবেদন করেছিলেন, এটা যেন না করা হয়। কারণ তাঁর স্বামীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন কাশ্মীরিরাই। নাম, বিক্রম মিস্রি। পরিচয়, ভারতের বিদেশ সচিব। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষের আবহে প্রায় গোড়া থেকে কার্যত তিনিই সরকারের ‘মুখ’ হয়ে ওঠেন। ১০ মে মোদি সরকারের সংঘর্ষ বিরতির সিদ্ধান্ত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানানোর পর থেকে তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করা শুরু হয়। এমনকী ট্রোল বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাননি তাঁর কন্যা ও পরিবারও। তাঁর ছবির নীচে ‘দেশদ্রোহী’, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে লিখে দেওয়া হয়। অভিযোগ, মেয়ের ফোন নম্বর ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে এক্স-হ্যান্ডেলের অ্যাকাউন্ট লক করে দেন তিনি।
নাম বিজয় শাহ। পরিচয়, মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকারের মন্ত্রী। ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরু হতেই ঐক্য ও সম্প্রীতির বার্তা দিতে কর্নেল সোফিয়া কুরেশি ও উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং প্রতিদিনের সাংবাদিক বৈঠকে ‘ব্রিফিং’ দেওয়ার গুরুদায়িত্ব সামলান। ধর্ম পরিচয়ে সোফিয়া মুসলমান, ব্যোমিকা হিন্দু। মধ্যপ্রদেশের ওই মন্ত্রী সোফিয়ার ধর্ম পরিচয় বোঝাতে তাঁকে ‘সন্ত্রাসবাদীদের বোন’ বলে এক জনসভায় মন্তব্য করেন। গোটা দেশে ঝড় তোলা এই ঘটনার পর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপ করায় পুলিস এফআইআর করে। মন্ত্রী এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যান। কিন্তু সেখানেও তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়। সর্বোচ্চ আদালত মন্ত্রীর ওই বক্তব্যকে নোংরা, জঘন্য লজ্জাজনক বলে আখ্যা দেয়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মধ্যপ্রদেশ সরকারের বিরুদ্ধেও তোপ দেগে রাজ্যের বাইরের আইপিএসদের নিয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের কথাও জানিয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ২৮ মে তাঁরা রিপোর্ট দেবেন। আরও আছে। ‘অপারেশন সিন্দুর’ শুরুর পর হায়দরাবাদ ও বিশাখাপত্তনমে দু’টি বেকারির নাম বদলের দাবিতে বিক্ষোভ দেখায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। কারণ ওই বেকারিগুলির নাম ‘করাচি বেকারি’। ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ভারতে মোদি জমানায় এমন ঘটনা কিন্তু বারবার ঘটছে।
আসলে এ সবই হল ‘মোদির ভারতে’র টুকরো টুকরো ছবি। তবে এটা একটা দিক, এর অন্যদিকে আছে এক অধ্যাপকের কাহিনি। ভারত-পাক সংঘর্ষ পরিস্থিতির আবহে অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলি খান মেহমুদাবাদের ফেসবুকে একটি পোস্টকে ঘিরে বিতর্ক বাঁধে। তাঁর সেই পোস্টে উগ্রতা, প্ররোচনা ও মহিলাদের প্রতি অসম্মানের অভিযোগ তুলে হরিয়ানা পুলিস তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তার আগে জাতীয় মহিলা কমিশন তাঁকে তলব করে। ‘বিতর্কিত’ পোস্টের জন্য আদালতে কার্যত ভর্ৎসনা করা হলেও ওই অধ্যাপককে অবশ্য কয়েকটি শর্তে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। অন্যদিকে খবরে প্রকাশ, হিমাংশী, বিদেশ সচিবকে সীমাহীন কদর্য আক্রমণ করা হলেও অভিযুক্তরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে! আর মধ্যপ্রদেশের ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজ্য হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট কঠোর বার্তা দিলেও বিজেপি সরকার এখনও তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি। তাঁর মন্ত্রিত্বও অক্ষত রয়েছে। কারণ মধ্যপ্রদেশের আদিবাসী সমাজে এই মন্ত্রীর নাকি বিরাট প্রভাব! অথচ এক ফেসবুক পোস্টেই তৎপর বিজেপি সরকারের পুলিস অধ্যাপককে জেলের ঘানি টানিয়ে ছেড়েছে। প্রশ্নটা হল, মন্ত্রী হন বা অধ্যাপক বা যে কেউ অনুচিত কাজ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। তাহলে শাসকের তরফে বৈষম্যমূলক আচরণ কেন? তবে কি এটাই প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘নিউ নর্মাল’-এর আসল চেহারা? যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাতেও বিভাজন স্পষ্ট! তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ (অধ্যাপকের ফেসবুক পোস্ট প্রসঙ্গে) হল, ‘বাক স্বাধীনতা রয়েছে মানেই যা খুশি বলা যায় না’। আর বাস্তব সত্যটা হল, ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষের সময়কাল ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, আমাদের সংবিধানে বর্ণিত ‘সেকুলার’ পরিচয়টা সমাজমাধ্যমে কীভাবে আক্রান্ত হয়েছে। কীভাবে সমাজমাধ্যমে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করা একদল উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নির্বিকার রয়েছে রাষ্ট্র! সব কি তবে রাজনীতির অঙ্কে নির্ধারিত হবে? নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের দেশ ভারতের মানুষ সত্যিই কি এমনটা চায়? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে তো অন্যের ভাবাবেগে আঘাত করা নয়। দেশকে যারা ভালোবাসে, দেশমাতৃকাকে যারা পুজো করে তারা তো বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে বিশ্বাসী। দেশের শাসকেরও তো তা স্মরণে রাখা উচিত।