সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি কোনদিকে? সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং পণ্যমূল্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকছে তো? গ্রামীণ নাকি শহুরে, কোন ভারতের আর্থিক লেনদেন বেশি? কোথায় কম? মানুষ কি বেশি বেশি ভোগ্য ও নিত্যপণ্য কিনছে? নাকি কমে যাচ্ছে পারিবারিক ক্রয় প্রবণতা? খাদ্যের দামের ওঠাপড়া কতটা প্রভাব ফেলছে মানুষের কেনাকাটাকে? সঞ্চয় হচ্ছে? নাকি যত্র আয় তত্র ব্যয়ের এক আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে মধ্যবিত্ত? এই তাবৎ প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশ কয়েকটি সূচক প্রকাশ করে কেন্দ্র। খুচরো ও পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার, আর্থিক বৃদ্ধির হার, উৎপাদন সেক্টরের সূচক ইত্যাদি। পরিসংখ্যান-প্রকল্প রূপায়ণ মন্ত্রক ও বাণিজ্য মন্ত্রক নিয়ম করে প্রত্যেক মাসেই অর্থনীতির নির্ণায়ক মাপকাঠি অনুযায়ী এই কাজটা করে থাকে। আজ, বৃহস্পতিবার থেকে এই তাবৎ তথ্য-পরিসংখ্যান প্রাপ্তির প্রক্রিয়াই বদলে যাচ্ছে।
জিডিপি এবং মূল্যবৃদ্ধির হার নির্ধারণে এতদিন ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়েছিল ২০১২ সালকে। এবার ধরা হবে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষকে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রয়-বিক্রয়ের প্রবণতা—অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির এই তিন স্তম্ভ নিয়ন্ত্রণে গত ১১ বছরে রীতিমতো নাজেহাল মোদি সরকারের এটাই নবতম ‘প্রয়াস’। অর্থাৎ, হিসাব-নিকাশের ভিত্তিবর্ষটাই বদলে দেওয়া।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মোদি সরকারের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ মূল্যবৃদ্ধি। বিশেষ করে করোনাকালের পর যে রকেটের গতিতে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তা সামাল দিতে কেন্দ্র এবং রিজার্ভ ব্যাংক—উভয় পক্ষই ব্যর্থ। কিন্তু গত এক বছরে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির হার কমছে বলে কাগজে-কলমে দাবি করে চলেছে মোদি সরকার। বাস্তবে অবশ্য তার প্রতিফলন চোখে পড়েনি। সর্বোপরি খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শতরকম পদ্ধতিতেও প্রতিরোধ করা যায়নি। আজ যে নয়া মানক ও ভিত্তিবর্ষ চালু হতে চলেছে, সেখানে সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় কী? সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যে অংশ, তার ‘অবদানে’র অনুপাত কমিয়ে দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, এতকাল যে বেচাকেনার হিসাবে বার্ষিক হাউসহোল্ড কনসাম্পশন সার্ভে হয়ে এসেছে, তার বদল প্রয়োজন। তাহলে পরিসংখ্যানেরও অদল-বদল হবে। কী এই সার্ভে? এর মূল বিষয়বস্তু হল, ভারতের পরিবারগুলি বছরে কোন খাতে কত ব্যয় করে। এই তালিকায় সবথেকে বেশি যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে এসেছে, সেটি খাদ্যপণ্য। ৪৬ শতাংশ। আজ থেকে কিন্তু সেই খাদ্যের মাপকাঠির অংশ কমিয়ে ৩৭ শতাংশ করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ কেন্দ্র মনে করছে, এখন আম আদমি নিছক খাদ্যেই বেশি খরচ করে না। তাই পাঁচটি খাতে ব্যয়কে একসঙ্গে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ এবং আবাসন অর্থাৎ, বাড়িঘর কেনা। পাশাপাশি আজ থেকে ২০ বছর আগে একটি পরিবারে খাদ্যের ক্রয় প্রবণতা যতটা ছিল, সেই হার নাকি বিপুলভাবে কমেছে। এই রিপোর্ট বাণিজ্য মন্ত্রকের। আবার কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রক জানাচ্ছে, গ্রামীণ আবাসন এখন বড় ফ্যাক্টর। সেও ঢুকেছে তালিকায়। খুচরো মূল্যবৃদ্ধি নির্ণায়কের ফ্যাক্টরগুলির তালিকা ৬ থেকে বাড়িয়ে ১২ করা হয়েছে। এখানে আশঙ্কার বিষয় একটাই—খাদ্যের ‘ওয়েটেজ’ যেহেতু কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই আগামী দিনে আসলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিই কমিয়ে দেখানো হবে। দাম আকাশছোঁয়া হলেও তা সরকারের পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না। অতএব বাজার অগ্নিমূল্য হবে। কিন্তু কাগজে-কলমে কেন্দ্র দেখাবে যে, মূল্যবৃদ্ধি নেই! অঘোষিত এই নয়া নিয়মেরই অপেক্ষায় আম আদমি?