Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নতুন আমদানি!

একটা সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনের স্বপ্নকে বুকে নিয়ে এই প্রায় ৭৫ বছর বয়সেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নতুন আমদানি!
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

একটা সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনের স্বপ্নকে বুকে নিয়ে এই প্রায় ৭৫ বছর বয়সেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নাকি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাঁর আমলে দেশে বহুবিধ সমস্যার কোনও খামতি নেই! যেমন, মোদির ‘সুশাসনে’ দেশের সাধারণ মানুষকে এখন খাবারের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে! কেন্দ্রীয় সমীক্ষা রিপোর্টই বলছে, এই জমানায় গ্রাম-শহরে খাদ্যপণ্য ক্রয়ের হার কমেছে। খাদ্যপণ্যের অবিরত মূল্যবৃদ্ধির ঠেলায় দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের দু’বেলা খাবার জোগানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার এপ্রিল-জুন মাসের ত্রৈমাসিকে দেখা যাচ্ছে, এই সময়ে অসংগঠিত শিল্পের ৪০ কোটি শ্রমিকের মধ্যে কাজ হারিয়েছেন ১২.৮৮ কোটি শ্রমিক। ৪.৭ শতাংশ ছোট-মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একই দশা চলছে কৃষকদেরও, সেখানে সংকট প্রতিদিন তীব্র হচ্ছে। ধরা যাক, যুব সমাজের কথা। এই প্রজন্মের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের কোনও দিশা নেই এই আমলে। সরকারি-বেসরকারি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, অপুষ্টি, সুখ-সমৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, অসাম্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের মাপকাঠিতে গোটা বিশ্বে ভারতের স্থান ক্রমশ পিছচ্ছে। কিন্তু দাবি অনুযায়ী সরকার চালাতে মোদির দূরদৃষ্টি, ঈশ্বরের কৃপা, অক্লান্ত পরিশ্রমের এইসব ‘ফসল’ দেখিয়ে যে ভোটে জেতা যাবে না— তা বিজেপি-আরএসএসের চেয়ে ভালো আর কে বোঝে! অতএব ক্ষমতায় টিকে থাকতে, কুর্সি ধরে রাখতে গত লোকসভা ভোটের আগে তীব্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ঢালাও আমদানি করা হয়েছিল। এখন বিভিন্ন রাজ্য, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অসমের বিধানসভা ভোটের আগে অনুপ্রবেশকে হাতিয়ার করে সাফল্য পেতে চাইছে গেরুয়া শিবির। বাজারে তাই নতুন শব্দবন্ধ আমদানি করা হয়েছে। ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ বা জনবিন্যাস মিশন। 

Advertisement

গত ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতা দিবসের দিন লালকেল্লা থেকে বক্তৃতায় এই ডেমোগ্রাফি মিশনের কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর রবিবার অসমে এক অনুষ্ঠানে একই কথা শুনিয়েছেন মোদি। অনুপ্রবেশের মাধ্যমে দেশের সীমান্ত এলাকায় নাকি জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে। তাই ডেমোগ্রাফি মিশন চালু করতে চলেছে সরকার— বলেছেন মোদি। অনুপ্রবেশকারীরা দেশের মা-বোন, কৃষক, যুব সমাজের অধিকার, সম্পদ কেড়ে নিচ্ছে— দাবি মোদির। কিন্তু দেশে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা কত, সীমান্তবর্তী এলাকায় তাদের কোথায় কত বাস, কীভাবে তারা জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে— এমন গুরুত্বপূর্ণ কোনও প্রশ্নের তথ্য কেন্দ্রীয় সরকার বা প্রধানমন্ত্রী দেননি। তার চেয়েও বড় কথা হল, সীমান্ত প্রহরার দায়িত্বে রয়েছে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন বিএসএফ। অতএব অনুপ্রবেশের সিংহভাগ দায় ও দায়িত্ব এই অসামরিক বাহিনীর। তাই এই ব্যর্থতার দায় একান্তই শাহের মন্ত্রকের। ব্যর্থতা ঢাকতে প্রধানমন্ত্রী অবশ্য আঙুল তুলেছেন বিরোধীদের দিকে! 
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে দ্বিচারিতার নজির গড়েছে মোদি সরকার। ইতিমধ্যেই তাদের আচরণে স্পষ্ট হয়েছে যে পড়শি রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুরা (বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায়) এদেশে এলে তাদের স্বাগত। কিন্তু মুসলিমরা এলে তারা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। এদেশে তাদের জায়গা হবে না। হচ্ছে ধরপাকড়, পুশব্যাকও। মোদির জনবিন্যাস বদলে যাওয়ার দাবি মানলে প্রশ্ন ওঠে, তবে কেন এ জন্য শুধু মুসলিমরা দায়ি হবে? আসলে হিন্দুরা শরণার্থী, মুসলিমরা অনুপ্রবেশকারী—আরএসএস-এর দর্শন অনুযায়ী এই প্রচার জনমানসে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে মোদিবাহিনী। বিহার, অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এই প্রচারকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছে বিজেপি। একদিকে হিন্দু মেরুকরণ, অন্যদিকে মুসলিম অনুপ্রবেশের জুজু দেখিয়ে প্রচারের সুর বেঁধে দিচ্ছেন মোদি-শাহরা। তবে শুধু প্রচারে আটকে না থেকে মুসলিম বিতাড়নের নাকি নীল নকশাও ছকে ফেলেছে গেরুয়াবাহিনী। যার পোশাকি নামই ডেমোগ্রাফি মিশন। মূলত বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকাকে সামনে রেখে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ‘টার্গেট’ করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ডেমোগ্রাফি মিশন অভিযান সফল করতেই নাকি দেশজুড়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের কাজ হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মূল উদ্দেশ্য অনুপ্রবেশকারী মুসলিম ভোটারদের চিহ্নিত করা। সেই কাজ শেষ হলে ঘাড়ধাক্কা দেওয়ার ব্যবস্থা করার কাজটা সহজ হবে সরকারের। একথা ঠিক, এদেশে অনুপ্রবেশ একটা বড় সমস্যা। বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে পারে নির্বাচিত সরকার। এতে কোনও দ্বিমত থাকার কথা নয়। দেশের নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে অনুপ্রবেশ রোখা দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনও দ্বিচারিতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু ঠিক ভোটের আগে গেরুয়াবাহিনীর অতিসক্রিয়তা তাদের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। তাই প্রশ্ন হল, এত করেও ওই রাজ্যগুলির কুর্সি দখল করা যাবে কি?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ