আগামিকাল মাতৃত্বের উদযাপন। এখনকার মায়েরা হলেন ‘নিউ এজ মাদার’। শিশুকে বড় করার ক্ষেত্রে আধুনিক ভাবনাচিন্তায় বিশ্বাস রাখেন তাঁরা। যদিও ভুললে চলবে না, মা-বাবা যৌথভাবেই শিশুকে গড়ে তোলেন। সেক্ষেত্রে ভারসাম্য খুব জরুরি, জানালেন পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ।
কাদের বড় করছেন?
‘নিউ এজ মাদার’ অর্থাৎ এযুগের মায়েরা আলফা প্রজন্মের বাচ্চাদের বড় করছেন। অর্থাৎ যারা এখন প্লে স্কুলে যাচ্ছে বা যারা জুনিয়র স্কুলে যাচ্ছে, মূলত তারা এই প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত। এই দলে যেসব বাচ্চা আছে, তার অধিকাংশ শিশুর মধ্যে অনেক নতুন ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আর নিউ এজ বা একালের মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যারা যাচ্ছেন, তাদের জীবনেও বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। সেগুলো কীরকম? ব্যাখ্যা করলেন পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ। তাঁর মতে, প্রথমত, এখনকার আর্থ সামাজিক পরিকাঠামোর পরিবর্তন। বাচ্চারা বেশির ভাগই এখন বড় হচ্ছে নিউক্লিয়ার পরিবারে। এখনকার প্রজন্মের অনেক মা-বাবাই সবসময় বয়ঃজ্যেষ্ঠ অভিভাবকদের সঙ্গে থাকার ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দ নন। বাচ্চার বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এটা একটা বড় বদল। তার প্রভাব পড়ছে শৈশবে।
দ্বিতীয়ত, চারপাশে সকলেই কাজে ব্যস্ত। মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষ। তাই অধিকাংশ মায়ের অনেকক্ষণের অথবা খানিকক্ষণের একটা কাজের জগৎ রয়েছে। যাঁদের নেই, তাঁরা হয়তো কাজ খোঁজার চেষ্টায় আছেন। কেউ হয়তো অস্বস্তিতে আছেন কাজ না করতে পেরে। এটা মায়েদের ক্ষেত্রে বদল।
তৃতীয়ত, প্রত্যেক মায়ের জীবনযাত্রায় একটা বড় পট পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। এখন অনেকটা সময় তাঁরা নিজেদের নিবন্ধ করছেন কোনও রকমের গ্যাজেটের আসক্তিতে। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে সব কাজ সময়ে গুছিয়ে ওঠা অসম্ভবপর হয়ে পড়ছে। এই তিনটি দিক থেকে নিউ এজ মায়েদের জন্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
মা-বাবার ভূমিকা
পরিবর্তন থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু জটিলতা। এসময়ের মা-বাবা দু’জনেই তাঁদের সন্তানকে ‘তাৎক্ষণিক ভালোলাগা’র মধ্যে দিয়ে বড় করে তুলছেন। চাইলেই ক্যাডবেরি থেকে গ্যাজেট কিংবা খেলনা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বাচ্চাকে দ্রুত শান্ত করতে চান তাঁরা। কারণ? তাঁদের হাতে সময় নেই। পায়েল বলছেন, এটাই পরবর্তীতে অন্য সমস্যা ডেকে আনছে শিশুর জীবনে। ছোট থেকে সে জেনে যাচ্ছে চাইলেই সব পাওয়া যায়। অথচ ভবিষ্যৎ জীবনে চাইলেও যে সব পাওয়া যাবে না, এই বাস্তবের মুখোমুখি হতে তার ভীষণ সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আর একটা সমস্যা এই সময়ের মা-বাবার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। নিজের বাচ্চার প্রতি তাঁদের কারও কারও একটা আক্রোশ তৈরি হচ্ছে। হয়তো এমনিতে তাঁরা একেবারেই বাচ্চাকে বকাবকি করেন না। কিন্তু তাঁর কাজের সমস্যা, অথবা বাড়ির কোনও সমস্যা থেকে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যে মা অথবা বাবা বাচ্চার উপরে ভয়ানক এবং সীমাহীন একটা আক্রোশ বা রাগ দেখিয়ে ফেললেন। এই ধরনের সমস্যার মধ্যে দিয়ে আগেকার মা-বাবাকে যেতে হয়নি, এমন তো নয়। কিন্তু তখন বাড়িতে বাচ্চাকে সামলে দেওয়ার জন্য মা-বাবার অভিভাবকরাই সামনে থাকতেন। মা-বাবার না পাওয়ার যন্ত্রণা যাতে বাচ্চার উপরে গিয়ে না পড়ে, সেদিকে সজাগ নজর থাকত তাঁদের। কিন্তু এই যুগে সেটা আর হচ্ছে না। অথচ বাচ্চা তো সব কথামতো কাজ করবে না— এটাই স্বাভাবিক। মুর্হুমুর্হু মা-বাবাকে চ্যালেঞ্জে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে। সে লিখতে চাইবে না, সময়মতো কাজ শেষ করবে না, খাবে না, সময় নষ্ট করবে। এরকম অবস্থায় মা বাবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
সমাজমাধ্যম
সামাজিক মাধ্যমও জীবনে একটা বড় ভূমিকা পালন করছে এখন। পায়েল জানাচ্ছেন, এযুগের মা-বাবার ক্ষেত্রে এটা বড় সত্য। নিউ এজ মা-বাবা সবাই সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি নিয়ে খুবই ব্যতিব্যস্ত। রিলস ভিডিও এসব তাঁরা করবেনই। সেগুলো থেকে ক’টা লাইক, ক’টা শেয়ার, অন্যের পেজ দেখা ইত্যাদি করতে করতে দিনের দু’তিন ঘণ্টা কোথা দিয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে তাঁরা বুঝতেও পারছেন না। সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সাফল্য, অন্যের প্রাপ্তি দেখে মা-বাবার মনে অদ্ভুত হতাশাবোধ তৈরি হচ্ছে। তাঁদের মনে হচ্ছে, আমি বোধহয় কিছুই পেলাম না। অন্যের সন্তানের প্রতিভার বিকাশ দেখেও মানসিক অশান্তি তৈরি হচ্ছে। অন্যের বাচ্চা যেটা পারছে, আমারটি পারছে না। এই দুঃখ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। মা বাবার এই যুগপৎ মানসিক চাপ, ভয়ঙ্কর হতাশাবোধ বাচ্চার মধ্যেও চাপ তৈরি করছে। মা কিংবা বাবা মুখে বলছেন, আমরা বাচ্চাকে চাপ দিই না। কিন্তু তাঁদের অজান্তে চাপ চেপে বসছে শিশুটির মনে।
অনিয়মিত রুটিন
এর সঙ্গে জুড়েছে একটা অনিয়মিত অসুস্থ রুটিন। পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট হিসেবে পায়েল দেখেছেন এখনকার মা-বাবা এবং বাচ্চাদের রুটিনের মধ্যে অদ্ভুত অস্বাভাবিকতা রয়েছে। সারা দিনের রুটিন লিখতে বলা হলে তাঁদের অনেকেই যে সময়ের সারণি দিয়েছেন, তাতে সুস্থ জীবনযাপন কাটানো অসম্ভব। পায়েল জানালেন, বাচ্চার বয়স হয়তো পাঁচও পেরয়নি, এমন সিংহভাগ মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে ঘুমাতে পাঠাচ্ছেন রাত একটায়। পরদিন যাদের সকালে স্কুল, তারা ছ’টা বা সাতটায় উঠছে। অর্থাৎ রাতের ঘুম মাত্র পাঁচ-ছ’ঘণ্টায় ঠেকেছে। তবে দুপুরবেলার ঘুমটা তাদের সন্ধে সাতটা-আটটা পর্যন্ত চলছে। মা যতক্ষণ বাড়ি না ফিরছেন, আয়া বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখছেন। শেষমেশ এই পুরো রুটিনটা বাচ্চা এবং মায়ের পক্ষে প্রাণান্তকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রাতের ঘুম যদি এই রকম হয়, তাহলে বাচ্চা কখনও প্রত্যাশিত আউটপুট দিতে পারবে না। সেটা আবার মায়ের জন্য আর এক চাপ তৈরি করে। প্রতিনিয়ত এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এখনকার মায়েরা। তার সমাধান কী?
ভারসাম্য জরুরি
পায়েল জানালেন, গোড়া থেকেই একটা কথা মাথায় রাখা দরকার। মা এবং বাবা, দু’জনকেই বুঝতে হবে একবার যে জনক-জননীর ভূমিকার জ্যাকেটটা তাঁরা পরেছেন, সেই ভূমিকা পালন করতে হবে অন্তত আগামী আঠারো বছর। এটাকে ‘কাজ’ হিসেবে দেখলে ধরে নিতে হবে এটা আঠারো বছরের একটা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তবে মা বাবা যদি দু’জনে মিলে পরিকল্পনা করে দায়িত্ব ভাগ করে নেন, তাহলে কারও উপরেই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় না। আমি ছাড়া বাচ্চার দেখাশোনা কেউ করতে পারবেন না— এই বদ্ধমূল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে মায়েদের। বাচ্চার ব্যাপারে অতিরিক্ত পজেসিভ না হয়ে এটা অভ্যাস করতে হবে। আমি না খাওয়ালে বাচ্চা খাবে না, আমি না কথা বললে ও বুঝবে না— এই ধরনের ভাবনা কারও জন্যই স্বাস্থ্যকর নয়। যখনই বাচ্চার দায়িত্ব পালন শুরু করবেন, তখন থেকে মা বাবা এই বিষয়ে আলোচনা করবেন।
সময় বেঁধে কাজ
প্রথম থেকে বাচ্চা যাতে সুস্থ রুটিনে বড় হয়, সেই খেয়াল রাখতে হবে। রাতে দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে ঘুম। সকালে সাতটার মধ্যে ওঠা। এগুলো সব মা যদি একলা সামলাতে না পারেন, তাঁর চারপাশের লোকের সাহায্য নিতে হবে। বাচ্চা যাতে বাইরে বেরতে পারে, বাইরে খেলতে পারে অর্থাৎ ‘আউটডোর অ্যাক্টিভিটি’র দিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। পায়েল বলছেন, মাকে বুঝতে হবে সেই সময় তাঁর অফিসের কল থাকলে তাঁর পরিবর্তে সেই কাজটা অন্য কেউ করবে অর্থের বিনিময়ে। এর জন্য অপরাধবোধে ভোগার কোনও কারণ নেই। কর্মব্যস্ত শিডিউল থেকে মাকেই ঠিক করতে হবে, কোন কোন সময়টা কীভাবে তিনি তাঁর সন্তানকে দিতে পারেন। মায়ের সঙ্গ অবশ্যই বাচ্চার দরকার। এটা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। বাচ্চার মূলগত শিক্ষা— কথা বলা, লিখতে শেখা, বই পড়তে শেখা, বড় হয়ে ওঠার এই প্রাথমিক ধাপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়গুলো অন্য কারও উপরে নির্ভরশীল করে বাচ্চাকে বড় করা উচিত নয়। এই সময়টা বাচ্চার প্রাপ্য। মা নিজেই সময় দেবেন নিজের রুটিন বুঝে। দিনের মধ্যে নিয়মিত একটা সময় রাখতেই হবে, যখন বাচ্চার সঙ্গে থাকবেন। সেটা খাওয়ানো হতে পারে, বাচ্চার সঙ্গে গল্প করা হতে পারে। এর জন্য গ্যাজেটে মনোযোগ কমাতে হবে। অনেকটা সময় দেখা যাবে এমনিই বেঁচে যাচ্ছে।
নিজের যত্ন
নিজের যত্নের কথাও মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে। মায়েরা অনেকেই এই বিষয়টায় গুরুত্ব কম দেন। নিজে সুস্থ না থাকলে বা নিজের যথেষ্ট মানসিক উদ্দীপনা না থাকলে বাচ্চাকে সঙ্গ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই নিজের দিকে তাকাতেই হবে। এর মধ্যেও কোনও অপরাধবোধ নেই। স্বাস্থ্যচর্চা ছাড়া এই সব চাপ সামলানো সম্ভব নয় কারও পক্ষে। স্বাস্থ্যরক্ষার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে। মেডিটেশন করতে হবে। সারা দিনের জন্য বাচ্চার মতোই নিজের একটা রুটিন রাখতে হবে। এই রুটিন অনুযায়ী চললে অনেক সময় বেঁচে যাবে। পায়েলের মতে, এটা ভাবুন অন্যের রিল দেখে আমার কী লাভ? কে খাচ্ছে কে ঘুমাতে যাচ্ছে, কে চুল খুলে দৌড়চ্ছে— এসব আমার জীবনে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। এটা বুঝতে হবে। সেই বিষয়ে কেন এতটা সময় ব্যয় করবেন? এছাড়া মায়ের যদি মনে হয় একলা পুরোটা সামলে ওঠা যাচ্ছে না, তাহলে প্রফেশনাল হেল্প নিতে হবে। তিনি কীভাবে রুটিন মেনটেন করতে পারেন, সেটার জন্য গাইড করে দিতে পারেন প্রফেশনাল।
বাড়ুক বোঝাপড়া
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়া খুব জরুরি। এখনকার মা বা বাবা, নিজেদের মধ্যে সমঝোতার অভাব এখন ঘোর বাস্তব। প্রত্যেকেই এখন স্বাধীন, প্রত্যেকেই রোজগার করছেন। মনোমালিন্য বা ভুল বোঝাবুঝি হলেই কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন যে স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে থাকব না, চলে যাব। পায়েলের মতে, এই যে দুম করে একটা সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললাম সাতপাঁচ না ভেবে, এটা সমস্যা তৈরি করছে। এই মানসিকতাটা ঠিক নয়, বলছেন তিনি। তাঁর কথায়, আগেকার দিনে স্বামীর উপরে আর্থিকভাবে নির্ভরশীল ছিলেন স্ত্রী। এখন তেমন নয়। মা-বাবার মধ্যে মনোমালিন্য হলে একজন বলছেন, বাচ্চাকে নিয়ে চলে যাবেন। এটা কোনও পরিণতমনস্ক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। এতে তো ভুক্তভোগী হবে বাচ্চাটাই। সেটা কেউ ভেবে দেখছেন না। এবং একজন দেখলেও সেখানে ঠিকমতো পেরেন্টিং হওয়া মুশকিল। তাই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কথোপকথনের জায়গাটা থাকা সবসময় জরুরি। বাচ্চা রয়েছে বলে দাম্পত্য সম্পর্ককে অবহেলা করবেন না। সেটা ভুলে গেলে নিজেদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। সেটা থেকেই অনেক সমস্যা পরে মাথাচাড়া দেয়। তাই কথাবার্তার মাধ্যমে, খোলাখুলি আলোচনার মাধ্যমে সেই জায়গাটা অটুট রাখতে হবে। নতুন মা-বাবা হওয়ার পরে দু’জনেরই মনে নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। সেগুলো আদানপ্রদান করা দরকার। মায়েদের শারীরিক দুর্বলতা বাবাদের বুঝতে হবে। সেগুলো নিয়ে দোষারোপ করলে কেউই সঠিকভাবে বাচ্চাকে সঙ্গ দিতে পারবেন না। তাতে বাচ্চারই ক্ষতি। বাচ্চার জন্য টিম হিসেবে কাজ করতে হবে। ‘নিউ এজ পেরেন্টিং’ সেখান থেকেই শুরু হবে।
অন্বেষা দত্ত