হিমাংশু সিংহ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নাকি সব পারে! চাকরি, কর্মসংস্থানের মাথায় বেত্রাঘাতের সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে নিতে পারে বৈধ ভোটারকেও অবলীলায়। এই মুহূর্তে বাংলার বিভিন্ন স্কুল কলেজ ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখলে ভোটার বাদ দেওয়ার নামে সেই হেনস্তা ও অত্যাচারের টুকরো টুকরো ছবিই সামনে আসছে প্রতিনিয়ত। এসআইআর পর্যবসিত হয়েছে ভোটার অধিকার কাড়ার নির্মম উৎসবে! বাংলার নাগরিক ইতিহাসে কোনও নির্বাচনের আগে নির্বাচকদের নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা দেখিনি। নবতিপর বৃদ্ধবৃদ্ধা যাঁরা আসছেন তাঁরা ভোট পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন কি না ভগবানেরও অজানা, কিন্তু তাঁদেরকেও ছাড়ছে না জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন। গত ছ’দশক টানা কলকাতায় বাস করেও আমার পরিবার এসআইআরের নোটিস পেল কোন যুক্তিতে? অপরাধটা কী? যদি অপরাধ কিছু থাকেই তাহলে নামটা উঠেছিল কেন? বাবা-মা কিংবা দাদু-দিদার সঙ্গে বয়সের ফারাক কোন যুক্তিতে একজন ভোটারকে সন্দেহজনক করে তোলে? তাঁর ক’পুরুষের বাস এই বাংলায় দেখুন, বাড়ি ঘর দেখুন, কোথায় পড়েছে তদন্ত করুন। তা না করেই নোটিস ধরাচ্ছেন? সে তো বাংলাদেশি নয়, রোহিঙ্গা মুসলমানও নয়! লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি কি শুধু ভোটারদের হেনস্তা করতে ব্যবহৃত ডিআরডিও’র নবতম অস্ত্র। বাংলার মানুষের অপরাধ তাঁরা গতবার গেরুয়া পার্টিকে স্থান দেয়নি ভোটবাক্সে। সেই অপরাধে একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ হয়ে থেকেছে দীর্ঘ সময়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও ঘুম ভাঙেনি কেন্দ্রের সরকার বাহাদুরের। বন্ধ হয়েছে আবাসের বরাদ্দ। আর এবার সব অস্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর এসআইআরে পছন্দমতো ভোটারতালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। সেই মিশনেই নেমেছে বশংবদ নির্বাচন কমিশন।
আমার বাবা উত্তর কলকাতার সিঁথিতে প্রথম জমি কেনেন ১৯৬৬ সালে। বাড়ি হয় ৬৯ সালে। প্রায় ৪০ বছর সুখে দুঃখে ওই বাড়িতেই ছিলাম আমরা। গোটা পরিবারের প্রথম ভোটার সচিত্র পরিচয়পত্র ১৯৯৫ সালের। কোথাও কোনও ছেদ নেই। এরপর ২০০৯ সালে কাছেরই ফ্ল্যাটে উঠে যাই আমি। স্বভাবতই ঠিকানা পরিবর্তন হয়। বদলে যায় ভোটার কার্ডও। বাবার অবর্তমানে এবার গোটা পরিবারের ম্যাপিং হয়েছে আমার নামের সঙ্গেই। তাহলে পরিবারের সদস্যকে অযথা নোটিস কেন? কোথায় অসংগতি? যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার নামে হেনস্তা করার এই সুগভীর চক্রান্ত কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে? বাড়ির পাশেই শুনানি কেন্দ্র তাই সহজে হাজির হওয়া যাচ্ছে, দু’পা হেঁটেই জেরক্স করানো যাচ্ছে যাবতীয় নথি। একবার দূর গ্রামের কথা ভাবুন। পায়ে হেঁটে দু’তিন কিলোমিটার পেরিয়ে শুনানিতে যাচ্ছেন অসহায় বৃদ্ধবৃদ্ধা। অধিকাংশেরই শরীর অশক্ত, চোখের দৃষ্টি প্রায় শূন্য। মুঠো মুঠো ওষুধ খেতে হয়। পানীয় জলটুকুও সঙ্গে নেই। দূর দূরান্তে কোথায় দোকান যে ছুটে গিয়ে আধার কার্ড, স্কুল কলেজের সার্টিফিকেট, জমির দলিলের কপি জেরক্স করা হবে তৎক্ষণাৎ। গোটা দিন হত্যে দিয়ে শুনানিতে পড়ে থেকে একরাশ বিরক্তি বুকে পুষে ঘরে ফেরা। এই ক্ষোভ ভোটে কার বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ হয়ে ঝরবে আগামী নির্বাচনে? পিছন থেকে কমিশনকে চালাচ্ছে কোন রাজনৈতিক শক্তি!
বলতে কোনও দ্বিধা নেই, হিয়ারিংয়ের নামে বাংলায় তুঘলকি রাজ চলছে। সবটাই করা হচ্ছে এআই মায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামক নয়া ইন্দ্রজালকে অস্ত্র করে। বিএলওদের অ্যাপে নিত্যনতুন নির্দেশিকা, যা প্রক্রিয়াটাকে সহজ করার তুলনায় প্রতিমুহূর্তে জটিল করছে। তার উপর লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা ‘যৌক্তিক অমিল’ খায় না মাথায় দেয় আম ভোটারের ৯৯ শতাংশই জানেন না। তবু গেরুয়া নির্দেশে চালিত এসআইআরের শেষ পর্বে কমিশনের আস্তিনে এই প্রযুক্তিই দৈত্যের ভূমিকায়। ওই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই নাটকের শেষ অংকে বিনা যুক্তিতে শত শত ভোটারকে হেনস্তা করা হচ্ছে বিনা করণে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু এলাকায়। নোটিসে নোটিসে নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। হিমশিম খাচ্ছেন বিএলওরাও। কারও বয়স ৮২ তো কারও ৮৬। শুক্রবারই আমার সামনেই এক মহিলা টানা দু’ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পরও ডাক না পেয়ে অসুস্থ বোধ করায় তাঁকে আগে ছেড়ে দেওয়া হল, কিন্তু শুনানি শেষে বাড়ি ফিরে তিনি কেমন আছেন খোঁজ নিল কি কেউ? অর্ধশতকের বেশি নিজের আস্তানায়, কোথাও কোনও অসঙ্গতি নেই, তাও নোটিস। কোথাও বলা হচ্ছে আপনার ৬টা ছেলেমেয়ে হল কীভাবে? এটা কোনও সন্দেহের কারণ হতে পারে? আশি বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে তার ফিরিস্তি দিতে হবে হাঁটুর বয়সি অফিসারকে, এটা মামদোবাজি না নির্বাচন কমিশনের ‘কৃত্রিম সৌজন্যবোধ’-এর নয়া চেহারা। বুঝতেই পারছেন লক্ষ্য সংখ্যালঘু ভোটার এবং অবশ্যই সীমান্তবর্তী জেলার লোকজন। রিসিট ছাড়াই বহু জায়গায় অরিজিনাল ডকুমেন্ট পর্যন্ত রেখে দেওয়ার অভিযোগ আসছে। এটা কমিশনের এক্তিয়ারের সম্পূর্ণ বাইরে। সংখ্যালঘু পঞ্চাশ হাজার কমাতে পারলে কার লাভ? কোথাও মিসফায়ার হলে টেকনিকাল গ্লিচ বলে অস্বস্তি ঢাকার চেষ্টা করছে বিএলও এবং এইআরও সম্প্রদায়, সঙ্গে বোকা বোকা হাসি। যেন নির্বাচকের সংখ্যা কমানোই প্রাথমিক অগ্রাধিকার!
রোহিঙ্গা খুঁজতে ব্যর্থ কমিশনের শেষ চ্যালেঞ্জ, এরাজ্যে সংখ্যালঘু ভোটারের শতাংশ ৩০ থেকে যদি ২৭ কিংবা আরও একটু কম করা যায়! এদলের বিবেক মায় নাগপুরের সংঘ পরিবার সংখ্যালঘুদের সঙ্গে ভোটে পাল্লা দিতে প্রায়শই একাধিক সন্তানধারণের প্রস্তাব দেন। শুনানিতে প্রশ্ন অনেক, বাবামায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক ১৫ বছরের কম কেন? এমনকী দাদু ঠাকুমাকেও ছাড়া হচ্ছে না যদি ভুলেও তাঁদের সঙ্গে ম্যাপিং হয়। তাঁদের সঙ্গে নাতিনাতনির বয়সের ফারাক ৪০-এর কম হলেই সন্দেহজনক ভোটার বলে হেঁকে দেওয়া হচ্ছে! এটা কোনও যুক্তগ্রাহ্য কারণ হতে পারে? এই কি কমিশনের মানবিক মুখ না বাংলায় ভোটের তিন মাস আগে কমিশনের আলখাল্লা পরে আধুনিক বিন তুঘলকের আগমন।
বোঝাই যাচ্ছে, অমিত শাহের নির্দেশে সুস্পষ্ট একটা বিশেষ মিশন নিয়ে বাংলায় নেমেছে জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন। কেটেছেঁটে এমন একটা তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে যাতে মোদি গেরুয়া দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয় যেকোনও মূল্যে। কয়েক সপ্তাহ আগেই লিখেছিলাম ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন পছন্দমতো প্রতিবেশী দেশ দখলের নেশায় মেতেছেন, বিজেপিও তাই। বাংলায় গেরুয়া পার্টি পছন্দের ভোটার তালিকা তৈরির নেশায় মেতেছে। হাওয়াই জাহাজে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে আর নিত্যনতুন রেল চালিয়ে যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারেকাছে যাওয়ার ক্ষমতা বঙ্গ বিজেপির বীরপুঙ্গবদের নেই তা কেন্দ্রীয় পার্টি জেনে ফেলেছে। সদস্য সংগ্রহ অভিযানের শোচনীয় ফ্লপ শো’র পরই তাই সব ছেড়ে নাম বাদ দেওয়ার কৌশল আঁকড়ে ধরার ব্লুপ্রিন্ট চূড়ান্ত হয়। আমরা যা দেখছি তা আরও শোচনীয় অত্যাচারে পরিণত হচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রাম বাংলায়, জেলা শহরে, সংখ্যালঘু মহল্লায়। ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট যেখানে এককাট্টা সেখানে আগামী দশ জন্মেও বিজেপির এই বাংলায় ক্ষমতাদখল খোয়াব হয়েই থেকে যাবে। রোহিঙ্গা না মিললেও যেনতেন লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সির গেরোয় যদি সংখ্যালঘু ভোট কমানো যায় তাহলেই অনেকটা। এটাই বিজেপি চায়। সেই হুকুম তামিলেই শশব্যস্ত নির্বাচন কমিশন।
ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক মতুয়া এবং হিন্দু ভোটার ‘সন্দেহজনক’ হওয়ায় হইচই শুরু হয়েছে বনগাঁ, রানাঘাট, কোচবিহারে। ব্যুমেরাংয়ের গন্ধ পেয়ে বিজেপির মতুয়া নেতারাও তোপ দেগেছেন সমস্বরে। মতুয়া, রাজবংশী সহ হিন্দু উদ্বাস্তুদের বাদ যাওয়াকে ব্যালেন্স করতে পালটা সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, বাছাই করা জেলায় সংখ্যালঘুরাই বেশি ডাক পাচ্ছেন। বহু বুথের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোটারকে ডাকা হয়েছে। স্বভাবতই ক্ষোভ চরমে। কাজকর্ম নাওয়াখাওয়া ছেড়ে আবালবৃদ্ধবণিতার শীতের সকাল থেকে একটাই কাজ নির্বাচন কমিশনের খিদমত খাটা। তাঁদের অনেকে অসুস্থ শয্যাশায়ী। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নানারকম ওষুধ চলে। হাঁটতে চলতে অন্য কারও সাহায্যের দরকার হয় বহু ভোটারের। গাড়ি কিংবা অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া বেশি দূরে যাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়। প্রতিদিন সেইসব বৃদ্ধবৃদ্ধার সীমাহীন দুর্দশার করুণ নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে কমিশনের খামখেয়ালিপনায়। উদ্দেশ্য একটাই, বাংলায় বিজেপিকে অন্তত একটু প্রাসঙ্গিক করে তোলা। বিএলও স্বামীকে নোটিস ধরাতে হচ্ছে স্ত্রীকে একাধিক শহরে জেলায়। এর থেকে সামাজিক অশান্তি, হাঙ্গামা, হানাহানি বাড়তে বাধ্য। কী দেখলাম বেলডাঙা, কাটোয়া চাকুলিয়ায়, জনরোষের দায় কার? ভোটের আগে বাংলায় বড় রকমের অশান্তি নামিয়ে আনার চক্রান্ত চালানো হচ্ছে হিন্দু মুসলিম বিভাজনের লক্ষ্যে। মনে পাহাড়প্রমাণ বাঙালি-বিদ্বেষ পুষে রাখলে স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি লোপ পাওয়াটাই স্বাভাবিক। এরা বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে রাজ্যের মানুষকে শেষ না করে ছাড়বে না! আগামী ভোটে এর বিরুদ্ধেই বাংলা ও বাঙালির লড়াই। বিজেপি ও তার দালালদের এর চরমতম সাজা ভোগ করতেই হবে। বাংলার মানুষই কড়ায় গন্ডায় এই প্রহসনের জবাব দেবে গণতান্ত্রিক পথে! হলফ করে বলতে পারি, কোনও ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে নির্বাচনের তিন মাস আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এই নাটক করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হবে না। অমিত শাহ হাত ভেঙে দেবেন। এই পোড়া দেশে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো যে আজ কতটা বিপন্ন তা বোঝা যাচ্ছে বেছে বেছে বিজেপি দুর্বল এমন রাজ্যে প্রতিহিংসামূলক ভোটার তালিকা সংশোধনেই। তারপরও আমরা দু’দিন বাদে সংবিধান দিবস পালন করব, গালভরা কথা বলব বিআর আম্বেদকর প্রসঙ্গে। পর্বতের মূষিক প্রসব শেষ হলে আবার ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে আপাদমস্তক হিন্দুরাষ্ট্র গড়ার ব্লুপ্রিন্ট রচনায় মন দেব। এতে কি ভারত মাতার আত্মা শান্তি পাবে, না বিআর আম্বেদকরের সংবিধান বাঁচবে? বাহ রে ভারতবর্ষ!