প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: সেদিনটাও ছিল ১২ মে। তবে আজ থেকে ৮৫ বছর আগে, ১৯৪০ সালে। ঝাড়গ্রামের লালগড় মাঠে সেদিন জনসভা করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সেই সভা থেকে ইংরেজের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্ৰামে নামার ডাক দিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রের ঝাড়গ্রামের আসার সেই স্মৃতি আজও ভোলেননি জেলাবাসী। মেদিনীপুর থেকে ধেড়ুয়া হয়ে মোটরগাড়ি করে সকালে ঝাড়গ্রামে এসেছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী নলীনবিহারী মল্লিকের বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলেন। বাছুরডোবা পেট্রল পাম্পের কাছে ছিল সেই বাড়ি। আজ তার আর চিহ্ন নেই। জেলার বার লাইব্রেরিতে দুপুরে আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। শহরের লালগড় মাঠে বিকেলে জনসভা হয়ছিল। সভা সেরে ঝাড়গ্রাম স্টেশন থেকে ট্রেনে হাওড়ায় ফিরেছিলেন। ঝাড়গ্ৰাম স্টেশনের প্রতীক্ষালয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসেছিলেন। লালগড়ের সেই বড় মাঠও আজ আর নেই। বর্তমানে মাঠের ছোট একটা অংশ দুর্গা ময়দান নামে পরিচিত। সেখানে সুভাষ চন্দ্রবসুর আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। প্রতিবছর ১২ মে শহরবাসী সুভাষচন্দ্রের পদার্পণ দিবস শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। অবিভক্ত মেদিনীপুরে সুভাষচন্দ্রের এটিই ছিল শেষ জনসভা। ময়দান সংলগ্ন এলাকায় প্রয়াত আইনজীবী শম্ভুনাথ চক্রবর্তীর বাড়িতে সুভাষচন্দ্র বসুর ব্যবহৃত চেয়ার, চায়ের কাপ এখনও সযন্তে রক্ষিত আছে। বাড়ির সদস্য ষাটোর্ধ্ব রুমা চক্রবর্তী বিশ্বাস বলেন, সেই সময়ে জেঠু শম্ভুনাথ ও বাবা ভোলানাথ চক্রবর্তী দুজনেই কংগ্রেস করতেন। বিয়ে হয়ে মা তখন সদ্য এই বাড়িতে এসেছেন। মায়ের মুখ থেকে শুনেছি, সভার দিন সুভাষচন্দ্রের জন্য তিনি চা করেছিলেন। ব্যবহৃত ডিসটি ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু কাপ ও কাঠের চেয়ার এখনও সযত্নে রাখা আছে। ঝাড়গ্রাম থেকে ফেরার সাত মাসের মধ্যে নেতাজি ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রের না ফেরা নিয়ে বাবা-মাকে বহুবার দুঃখপ্রকাশ করতে দেখেছি। পদার্পণ দিবসের অন্যতম উদ্যোক্তা তন্ময় সেনগুপ্ত বলেন, নেতাজি ঝাড়গ্রামে এসেছিলেন। জেলার মানুষ একথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। আসার দিনটি পদার্পণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই বছর পদার্পণ দিবস ৮৬ তম বর্ষে পড়ল। প্রতিবছরের মতো এবারও শ্রদ্ধার সঙ্গে দিনটি পালন করা হবে। জেলার বাসিন্দা বিধান দেবনাথ বলেন, সুভাষচন্দ্র মহানিস্ক্রমণের কয়েকমাস আগে লালগড় মাঠ থেকে আপোষহীন স্বরাজের ডাক দিয়েছিলেন। যে বক্তব্যের এখন ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করি। স্থানীয় ব্যাবসায়ী নলীনবিহারী মল্লিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেঙ্গল ভলিন্টিয়ার্সের একটা যোগ ছিল। অতিথি হিসেবে তাঁর বাড়িতে ওঠার এটা একটা কারণ হতে পারে। সুভাষচন্দ্রের ঝাড়গ্রাম সফরের বহু ইতিহাস হারিয়ে গিয়েছে। সেগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণ করাই হতে পারে নেতাজির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য। ঝাড়গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে সুভাষচন্দ্র বসু আপোষহীন স্বরাজের ডাক দিয়েছিলেন। দিনটি ছিল ১৯৪০ সালের ১২ ই মে। ঝাড়গ্রামবাসী আজও দিনটি ‘পদার্পন দিবস’ হিসেবে পালন করেন। শহরের দুর্গা ময়দান হয়ে উঠেছে পূণ্য ভূমি।



