এ লজ্জা ঢাকবে কোন প্রচার! সত্তর বছর আগে ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘...এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাবো আমি...।’ মাত্র ২১-এ প্রয়াত কবির অঙ্গীকারের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তায়, শিশুদের উপর বিনিয়োগের থেকে ভালো কিছু হতে পারে না। সমাজকল্যাণমূলক প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ, শিশু-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলি অবজ্ঞা করলে দেশের উন্নয়নই ধাক্কা খাবে। শিশুদের উপর স্থিতিশীল বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে সামাজিক ও আর্থিকক্ষেত্রে বিপুল প্রতিদান মিলবে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। চারাগাছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, জল, সার দিলে তা যে একদিন মহীরুহ হয়ে উঠতে পারে— সেই বোধের কথা শুনিয়েছেন তিনিও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ দেশের ভবিষ্যতের কারিগরদের প্রতি তাঁর সজাগ দৃষ্টি, অঙ্গীকারের কথা বোঝাতে বছর দেড়েক আগে উত্তরপ্রদেশের এক নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে তাঁর আবেগঘন বার্তা ছিল, ‘আমার কোনও সন্তান নেই। আপনাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তেই আমার এই লড়াই।’ বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, পরামর্শ আর প্রধানমন্ত্রীর এমন বাণী শুনলে আশায় বুক বাঁধার কথা। কিন্তু মোদির ভারতে সরকারের অঙ্গীকার আর বাস্তবের ফারাকটা বুঝিয়ে দিচ্ছে, এ দেশে প্রতিনিয়ত বিপন্ন হচ্ছে শৈশব। যে বয়সে পুতুল খেলার কথা, সে বয়স ফুরিয়ে যাচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।
খুব সম্প্রতি এক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ছবিটা বেআব্রু করে দিয়েছে ইউনেস্কো। তারা বলছে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-আবাস, পুষ্টি পরিস্রুত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচ, এমন ছ’টি প্রাথমিক পরিষেবা প্রতিটি শিশুর অধিকার। কিন্তু ভারতের মোট শিশুর অর্ধেক, ২০ কোটি ৬০ লক্ষ শিশু এই ন্যূনতম পরিষেবাগুলির একটিও পাচ্ছে না! অন্তত দুটি বা তার বেশি প্রাথমিক পরিষেবা পাচ্ছে না ৬ কোটি ২০ লক্ষ শিশু। এ তো গেল সাম্প্রতিক রিপোর্ট। বছর পাঁচেক আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু), ইউনিসেফ ও ল্যানসেট মেডিকেল পত্রিকার করা সমীক্ষা রিপোর্টেও বিপণ্ণতার সেই একই ছবি উঠে এসেছে। একটি দেশে শিশুরা সামাজিকভাবে সুরক্ষিত, তাদের হিংসার শিকার হতে হয় কি না, শিশুদের শিক্ষা ও খাদ্যের অধিকার সুরক্ষিত হয় কি না, শিশু আত্মহত্যার হার কত, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর হার কত— এমন কিছু প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল সূচক। ১৮৮টি দেশকে নিয়ে চালানো এই সমীক্ষায় ভারতের স্থান হয়েছে ১৩৩-এ। সমীক্ষকেরা মনে করেন, ভারতের শিশুদের সামাজিক সুরক্ষার মান অত্যন্ত নীচে। আবার কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি)-র রিপোর্ট জানিয়েছে, গত দু’দশকে দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ দশগুণ বেড়েছে। ২০২৩ সালে দেখা গিয়েছে প্রতি তিন মিনিটে শিশুদের বিরুদ্ধে একটি করে অপরাধ হয়েছে। মোদি জমানায় দেখা যাচ্ছে, ২৪ ঘণ্টায় কোনও খাদ্য পায়নি, ভারতে এমন শিশুর সংখ্যা ৭০ লক্ষের কাছাকাছি। পঞ্চম জাতীয় সমীক্ষায় উঠে এসেছে, এ দেশে অপুষ্টির কারণে ৩১ শতাংশ শিশুর ওজন কম। প্রশ্ন উঠেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার ডাক দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। ভারত যখন ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে, তখন ক্ষুধা ও অপুষ্টির বেহাল দশা কমাতে কী করেছে এ দেশ?
চোখ খোলা রাখলে দেখা যাবে, শিশুদের জন্য এ দেশে প্রকল্পের অভাব নেই। পিএম পোষণ অভিযান, সমগ্র শিক্ষা, মিড ডে মিল, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও, স্বচ্ছ ভারত মিশনের মতো একাধিক প্রকল্প নিয়ে প্রায় সারা বছর ধরে ধুন্ধুমার প্রচার চলে। এইসব প্রকল্পের প্রচারে বিজ্ঞাপন বাবদ শত শত কোটি টাকা খরচও করা হয়। কিন্তু তা যে ভষ্মে ঘি ঢালার মতো, তা পরিষ্কার। আসলে সরকারি প্রকল্পগুলির প্রধান উপযোগিতা যেন হয়ে উঠেছে শাসক দলের দলীয় প্রচার। শিশুদের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্য হয়ে উঠেছে গৌণ! প্রকল্প ও প্রচারের জন্য বরাদ্দ সরকারি অর্থের কত অংশ যথাযথভাবে সৎ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, এইসব প্রকল্পে প্রতি বছর বাস্তবসম্মত সমীক্ষা করে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও অর্থবরাদ্দ করা হয় কি না, তা নিয়ে। প্রশ্ন ওঠে, সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও। কোনও সরকারের প্রাথমিক কাজ যদি হয় শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া, চারবেলা পুষ্টিকর খাবারের জোগান দেওয়া, বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করা, এককথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চোখের মণির মতো আগলে রাখা— তাহলে সেই কাজে মোদি সরকার যে পাশ মার্কসও পাবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এর সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ সমীক্ষা রিপোর্টগুলি। তাতে অবশ্য সরকারের দাবি এবং প্রধানমন্ত্রীর লম্বাচওড়া ভাষণ আটকাবে না। শৈশব নিয়ে ছেলেখেলা চলতেই থাকবে। আর প্রতি বছর হয়তো আরও তলিয়ে যাওয়া পরিসংখ্যানের পাহাড় জমবে।