নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: সে অনেকদিন আগের কথা। তখন ধান জমিতে সেভাবে কীটনাশক প্রয়োগ করা হতো না। জমির জলে খেলে বেড়াত ছোট ছোট মাছ, বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। নীল আকাশ ভেদ করে উড়ে আসত নীলকণ্ঠ পাখি। খাবারের অভাব ছিল না। জমিয়ে ভূরিভোজের পর আবার কাশফুলের বনের উপর দিয়ে উড়ে যেত। এখন পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। জমিতে দেদার কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। জমিতে নীলকণ্ঠ পাখির খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। তারা বাসস্থানও হারিয়ে ফেলছে। এই পাখি সাধারণত পুরনো গাছে ঘর বাঁধতে পছন্দ করে। সেই গাছও এখন তেমন দেখা যায় না। পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার কারণে নীলকণ্ঠ পাখির সংখ্যা কমে গিয়েছে।
প্রবীণরা বলছেন, এক সময় শরৎকালে হামেশাই নীলকণ্ঠ পাখি দেখা যেত। তাদের আকাশে উড়তে দেখলে অনেকেই কপালে হাত ঠেকাতেন। কথিত রয়েছে, এই পাখি কৈলাসে উমার ফিরে যাওয়ার বার্তা নিয়ে যায়। এই পাখিকে ‘মহাদেবের দূত’ হিসেবে ধরা হয়। সেই কারণে হিন্দুদের কাছে এই পাখির গুরুত্ব অন্যরকম। আগে দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের সময় এই পাখি ওড়ানো হতো। সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। এখন প্রথা মেনে অনেকে মাটির পাখি তৈরি করেন। বনদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, মানব সভ্যতার উন্নতিতে অনেক পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বিভিন্ন পাখির আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে। তারা তাদের থাকার আস্তানা হারিয়ে ফেলছে। খাবারের অভাব দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
বর্ধমানের বাসিন্দা সুদীপ্ত দাস বলেন, কয়েক বছর আগেও এই পাখি ধরার জন্য পুজোর মরশুমে চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠত। ঝোপ-জঙ্গলে ফাঁদ পেতে রাখা হতো। অনেক পরিবার মোটা টাকায় এই পাখি কেনে। এখন বনদপ্তর নজরদারি বাড়ানোয় চোরা শিকারিদের দাপট কমে গিয়েছে। তাছাড়া এই পাখি দেখাও যায় না। নীলকণ্ঠ জমির পোকা বা কীটপতঙ্গ খেতে পছন্দ করে। কীটনাশক প্রয়োগ করায় জমির সমস্ত পোকা মারা যায়। এই পাখি কৃষকের বন্ধু হিসেবেই পরিচিত। নীলকণ্ঠ কমে যাওয়ায় কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও গ্রামের উঠানে চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শব্দ শুনে ঘুম ভাঙতো। এখন তা শোনা যায় না। নতুন প্রজন্ম এই পাখিটিকে বইয়ের পাতায় দেখছে। ঠিক একইভাবে নীলকণ্ঠ পাখিকেও ঝোপঝাড় বা জমিতে দেখা যেত। বিশেষ করে শরৎকালে এই পাখি যেন অন্য বার্তা বয়ে আনত। এখন তা হারিয়ে গিয়েছে। তবে এখনও দশমীর দুপুরে নীলকণ্ঠ পাখি উড়ে যেতে দেখলে অনেকেই নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রবীণরা বলে ওঠেন, ‘আবার এসো মা।’