Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সমানাধিকারের সঙ্গে চাই সহযোগিতার হাত

সমানাধিকারের সঙ্গে চাই সহযোগিতার হাত
  • ৮ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অন্বেষা দত্ত: ডালে নুন হয়নি কেন?

Advertisement

শার্টের কলারে ময়লা লেগে রয়েছে কেন?
ছেলেটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে। সারাদিন বাড়ি বসে কী করো, কিছু দেখো না?
গৃহস্থ বাড়ির বাতাসে এধরনের প্রশ্ন প্রায়শই ঘুরে বেড়ায়। প্রশ্নকর্তার হাঁকডাক যতটা শোনা যায়, উত্তরদাতার ততটা নয়। বলা ভালো, একেবারেই নয়। ভালো করে কান পাতলেও প্রশ্নের উত্তর শুনতে পাওয়া যাবে না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে উত্তরদাতা উত্তর দেওয়ার মতো সাহস করেই উঠতে পারে না। সাহস করলে সংসারে যে কী দক্ষযজ্ঞ শুরু হবে!  
উপরের মন্তব্যগুলো থেকে দিব্যি আন্দাজ করা যায়, প্রশ্নকর্তাটি কে হতে পারেন আর উত্তরদাতাই বা কে। তবে প্রচলিত ধারণার বাইরে প্রশ্নকর্তার ভূমিকার বদলও দেখা যায়। বাড়ির কর্মঠ মেজাজি পুরুষের পরিবর্তে কখনও কখনও এই প্রশ্ন ধেয়ে আসতে পারে বাড়ির কর্ত্রীর কাছ থেকেও। কারণ তিনি ছোটবেলা থেকে এমনটাই দেখে এসেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাঁকে এভাবেই গড়েপিটে নিয়েছে। তিনি শিখেছেন, গেরস্থালি কাজকর্মে কোনওরকম গোলমাল হলেই তার দায় বর্তায় বাড়ির মহিলাদের উপরে। তাই মহিলা হয়েও তিনি সংসারে অনভিজ্ঞ, অপরিণত আর একজন মহিলাকে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারেন। 
ঘরের বাইরে পা রেখে নারী নিজের অধিকার বুঝে নিতে সক্ষম হয়েছে। বাইরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে কিন্তু বাড়ির ভেতরের পরিবেশ? 
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সব নারীর জন্য নিছক একটি দিন। কেন পালন করা হয় নারী দিবস? প্রসঙ্গত বলে রাখি, ভারতে অবশ্য প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় ‘জাতীয় নারী দিবস’ হিসেবে। সরোজিনী নাইডুর জন্মবার্ষিকীর দিনটি এদেশে জাতীয় নারী দিবস। ৮ মার্চ যে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হয়েছে তার পিছনে রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। রাষ্ট্রসঙ্ঘ আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মূলত আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে বিশ শতকে শ্রম আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল নারীর সমানাধিকার রক্ষার ভাবনা। ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে সোশ্যালিস্ট পার্টি আয়োজন করল নারী দিবস (ন্যাশনাল উওমেন্স ডে)। নেত্রী টেরেসা মালকিয়েল ছিলেন এর মূল উদ্যোক্তা। এই দিনটির উদযাপন সাড়া জাগাল জার্মানিতে। ক্রমে ক্রমে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে। ১৯১৭-য় রুশ বিপ্লবে মহিলাদের ভূমিকাকে সম্মান জানিয়ে ১৯২২ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করলেন লেনিন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক নারী দিবস একটা পূর্ণাঙ্গ চেহারা পেল বলা চলে।   
এ তো গেল তথ্যের কচকচি। এতরকম আন্দোলন দাবি স্বীকৃতি— এসবের মূল কথাটা কী ছিল? সর্বক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই চেয়েছিলেন নাগরিক হিসেবে সব রকম অধিকার পাবেন মহিলারাও। কার্যক্ষেত্রে কী হল? 
নারী অধিকার... নারী অধিকার... করে গলা ফাটিয়ে এমন একটা আবহ তৈরি করা হল যে বিষয়টাই গেল গুলিয়ে। পরিহাসের বিষয় হয়ে দাঁড়াল নারীবাদ। প্রকৃত নারীবাদ কখনও শুধু নারীর অধিকার স্বার্থ বা সম্মান রক্ষার কথা বলে না। নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলা আর সব ক্ষেত্রে শুধু নারীই প্রাধান্য পাবে এটা বলা—দুটো বিষয় তো এক নয়। এই ভ্রান্ত ধারণার সঙ্গে মিশে গেল উগ্র নারীবাদ। মহিলাদের একটা অংশ ভাবতে শুরু করল, বা তাদের ভাবানো হল এইভাবে যে সিগারেট খাওয়া কিংবা অত্যাধুনিক পশ্চিমী পোশাক পরলেই ‘আধুনিক নারী’ হওয়া যায়। অনেকে 
এটাই অন্ধের মতো অনুসরণ করতে শুরু করল প্রতিবাদের অঙ্গ হিসেবে। অর্থাৎ শুধু উপর-উপর একটা বদল। 
চিন্তার ক্ষেত্রে কোনও বদল হল না। নারী অধিকার রক্ষার শহুরে লড়াইটা তাই বহু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রইল শুধু পোশাক বিপ্লবে। আধুনিক পোশাক পরিহিতা বা সভাসমিতিতে নারী অধিকার নিয়ে বড় বড় কথা বলা মহিলাটি হয়তো বাড়িতে গার্হস্থ্য  হিংসার শিকার। আর সেই হিংসার মাধ্যম হয়তো সবসময় পুরুষও নয়, কোনও নারীই। যেমনটা লেখার শুরুতেই বলছিলাম।
পুরুষতন্ত্র এই কাজটাই করতে চায়। সমাজ যতই এগিয়ে যাক, পুরুষতন্ত্র তার কাজটা করে যায় নিভৃতে। নারীর বিরুদ্ধে নারীই তার অস্ত্র। সম্প্রতি দেখা একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের হিন্দি ছবির কথা বলি। একটি মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে আসার পরে তার জীবন কীভাবে বদলে গিয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে তৈরি হয়েছে ছবিটি। আমাদের সামাজিক রীতি শেখায় শ্বশুরবাড়ি মানে নতুন জায়গা, নতুন সংসার। অনেক কিছু মানিয়ে নেওয়া। এসব জেনেই বেশিরভাগ মেয়ে নতুন সংসারে আসে। প্রাণপণ চেষ্টা করে নতুন পরিবারটিকে আপন করে নিতে। তা সত্ত্বেও অনেক মেয়েই শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের মন পায় না। ছবিতে দেখা যায়, বাড়ির পুরুষ অর্থাৎ স্বামী-শ্বশুর সকলেই সারাক্ষণ বিভিন্ন কাজের জন্য মা-বউকে অর্ডার করতে অভ্যস্ত। মা অর্থাৎ মেয়েটির শাশুড়ি বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁদের সবরকম প্রয়োজন পূরণ করছেন। মেয়েটি নতুন সংসারে এসে এই ধরনের ‘নির্দেশ’ পালন করতে গিয়ে খাবি খাচ্ছে। মাঝে মাঝে শাশুড়ি মায়ের কাছে প্রশ্ন তুলছে, বাড়ির পুরুষরা যেভাবে চাইছেন সেইভাবেই সবসময় কাজটা করতে হবে কেন? শাশুড়ি মা কিন্তু ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। তিনি শুধু চাইছেন যে ‘নিঃশব্দ শ্রম’ রোজকার সংসারে তিনি এতবছর দিয়ে এসেছেন, সেটি যেন তাঁর মতো সুনিপুণভাবে নববধূও বিনা বাক্যব্যয়ে দিতে পারে। এখানেই তৈরি হয় সংঘাত। বাড়ির পুরুষরা যে সব কাজের নির্দেশ দিতে অভ্যস্ত, তার মধ্যে অনেক কাজই তাঁরা নিজেরা করে নিতে পারেন। যেমন বাইরে যাওয়ার আগে নিজের পোশাক থেকে শুরু করে চটিজুতো বের করে রাখা। এই সামান্য কাজটির জন্য কেন আর একজনের সাহায্য প্রয়োজন হবে? এই প্রশ্নটা ওই সংসারে কেউ তুলছে না। বাড়ির মহিলারা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাদের ডেকে এনে ব্যস্ত করে তুলতে হবে, সামান্য কাজটিও করিয়ে নিতে হবে, কারণ এতেই পুরুষতন্ত্রের উদ্দেশ্য সাধিত হয়। ছবিতে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, মেয়েটি এতদিনকার চলে আসা প্রথা মানল না। বেরিয়ে গেল সংসার ছেড়ে।     
বাস্তব কী বলে? সম্প্রতি কাজের সময় নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এক সমীক্ষা (টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪) অনুযায়ী, মহিলারা ‘অবৈতনিক গৃহকর্মে’ পুরুষদের তুলনায় রোজ ২০১ মিনিট অতিরিক্ত ব্যয় করেন। কীভাবে? ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় কাজের সময়ের মাত্রা ১০ মিনিট কমলেও এখনও গৃহকর্মে মহিলারা ব্যয় করেন ২৮৯ মিনিট। পুরুষরা সেখানে গৃহকাজে দেন ৮৮ মিনিট। অঙ্ক বলছে তফাৎটা ২০১ মিনিট অর্থাৎ ৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের। বয়স্ক মানুষদের দেখভাল ও যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও হিসেবে ফারাক চোখে পড়বে। নারীরা কেয়ারগিভার-এর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যয় করেন দিনে ১৩৭ মিনিট। আর পুরুষরা দিনে ৭৫ মিনিট। শহর ও গ্রামাঞ্চল মিলিয়ে 
১ লক্ষ ৩৯ হাজার ৪৮৭টি বাড়ির থেকে নারীপুরুষ 
মিলিয়ে ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ১৯২ জনের উপরে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। 
সমানাধিকার তৈরির পাঠ বাড়ি থেকেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। বাড়িতেই যদি দৈনন্দিন শ্রমের এই ফারাক থাকে... নারী সবসময় নিঃশব্দ শ্রম ব্যয় করবে, এটাই যদি দস্তুর হয়... কোনও শিশুপুত্র বা শিশুকন্যা যদি ছোট থেকে এটা দেখেই বড় হয়... তাহলে সে কি অন্যরকম কিছু শিখবে? শিশুপুত্রদের ছোট থেকে শেখানো হবে ছেলেদের কাঁদতে নেই। 
তাদের বীরত্বের গল্প শোনানো হবে। ছোট ছেলেটি বড় 
হতে হতে বুঝবে, কষ্ট হলেও দাপট দেখানোই পুরুষের 
ধর্ম। ভবিষ্যতে সেই দাপটের শিকার হবে তার স্ত্রী অথবা বান্ধবী.. এরপর আন্তর্জাতিক বিশ্বে নারীর অধিকার আন্দোলনকে সম্মান জানিয়ে একটি গোটা দিন বরাদ্দ হলেও খুব কিছু এসে যায় কি?
এখনও আধুনিক ভারতে শ্বশুরবাড়িতে বধূ নির্যাতনে কত মেয়ে আত্মাহুতি দেয় তার ইয়ত্তা নেই। প্রতি সমীক্ষায় খুঁজে পাওয়া যাবে নতুন নতুন পরিসংখ্যান। হিন্দু রাষ্ট্র বৃহত্তর করার লক্ষ্যে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত গত বছর নিদান দিয়েছিলেন মেয়েদের তিন সন্তান ধারণ আবশ্যিক। রাজনৈতিক দল নারীপ্রগতি নিয়ে ভাবে না। নারীর ভূমিকা ঠিক করে দেয়। নারীকে সন্তান ধারণের যন্ত্র বানাতে চায়। এসব গোলকধাঁধার মধ্যেও জ্ঞানের গরিমায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সত্যিই তো কত মেয়ে এগিয়ে আসছেন। মুখ্য ভূমিকায় বসছেন। নিজে জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিসর তৈরি করছেন। তাঁদের প্রগতি হচ্ছে। এই নারী কিন্তু বাড়ির পুরুষ কেন গৃহকর্মে কম সময় দিচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। পুরুষ কি তা শুনতে অভ্যস্ত হচ্ছেন? পুরুষতান্ত্রিক অহং (ইগো) দূরে রেখে, নারী বনাম পুরুষের লড়াই সরিয়ে রেখে তাঁরা কি ভাবতে পারছেন ঘরে-বাইরে একটা ভারসাম্য দরকার? প্রগতিশীল পুরুষ তৈরি হচ্ছেন কি? নারী দিবসে ডালি ভরা উপহারের চেয়ে সহযোগিতার হাত বোধহয় অনেক বেশি কাম্য।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ