Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, অলস বাজেট

২০২৬-২৭ সালের বাজেটটি রবিবার পেশ করার পর, সরকারি মুখপাত্র, সম্পাদকীয় লেখক, ভাষ্যকার এবং সাংবাদিকরা বাজেটটিকে বর্ণনা করার জন্য ‘সতর্ক’ শব্দটি এবং ‘পরিস্থিতি অস্থিতিশীল না করা’ সংক্রান্ত প্রবচনটি ব্যবহার করেছেন। আমি মনে করি, তাঁরা একটি আমেরিকান চালু কথা অনুসরণ করেছেন, ‘যদি কিছু ঠিকঠাক চলে, তবে তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করো না।’

প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, অলস বাজেট
  • ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ২০২৬-২৭ সালের বাজেটটি রবিবার পেশ করার পর, সরকারি মুখপাত্র, সম্পাদকীয় লেখক, ভাষ্যকার এবং সাংবাদিকরা বাজেটটিকে বর্ণনা করার জন্য ‘সতর্ক’ শব্দটি এবং ‘পরিস্থিতি অস্থিতিশীল না করা’ সংক্রান্ত প্রবচনটি ব্যবহার করেছেন। আমি মনে করি, তাঁরা একটি আমেরিকান চালু কথা অনুসরণ করেছেন, ‘যদি কিছু ঠিকঠাক চলে, তবে তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করো না।’

Advertisement

একাধিক চ্যালেঞ্জ
ভারতীয় অর্থনীতির সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলিকে চিহ্নিত করেছে ২০২৫-২৬ সালের আর্থিক সমীক্ষা (ইএস)। সেগুলির মধ্যে রয়েছে—
 প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কযুদ্ধ। যদিও তিনি ঘোষণা করেছেন যে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। তবে মনে হচ্ছে যে এই কমানোর ব্যাপারটি শর্তসাপেক্ষ। যেমন মার্কিন পণ্যের উপর ভারতকে শুল্ক নামিয়ে আনতে হবে শূন্যে। দূর করতে হবে নিঃশুল্ক বাধাগুলি। ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমেরিকান পণ্য কিনতে হবে এবং পূরণ করতে হবে আরো কিছু শর্ত। এই শর্তাদি ভারতের পক্ষে পূরণ করা কঠিনই হতে পারে।
 প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ‘তাদের সম্ভাবনার নীচে রয়েছে।’ বিদেশি পোর্টফোলিয়ো বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) 
পুঁজি তুলে নিচ্ছেন। ভারতীয় প্রোমোটার বা উদ্যোপতিরা নগদ-অর্থে-সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ করতে অনিচ্ছুক। তার ফলে মোট স্থির মূলধন গঠন (জিএফসিএফ) জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশে আটকে আছে।
 নমিনাল জিডিপির বৃদ্ধি সন্তোষজনক নয়: এনএসও কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি এবং জাতীয় হিসেব সম্পর্কে সন্দেহ—প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হারের উপর একটি ছায়া ফেলেছে। নমিনাল জিডিপি একটি ভালো ইন্ডিকেটর বা সূচক। এটি ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ সালে বেড়েছে যথাক্রমে ১২ শতাংশ, ৯.৮ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ হারে। স্পষ্ট যে বৃদ্ধি এক্ষেত্রে গতি হারাচ্ছে।
 বেকারত্ব পরিস্থিতি ভয়াবহ। যুব শ্রেণির 
মধ্যে বেকারত্বের হার ২০২৫ সালের জুন মাসে ছিল ১৫ শতাংশ। মোট কর্মশক্তির মাত্র ২১.৭ শতাংশ নিয়মিত চাকুরে এবং বেতনভোগী। লক্ষ লক্ষ যুবক বেকার। সংখ্যাগুলি স্বনিযুক্তির দিকে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
 ‘ম্যানুফ্যাচারিং পাওয়ার’ হয়ে উঠতে না-পারলে কোনো দেশই মিডল ইনকাম কান্ট্রি বা মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়নি। গত ১০ বছরে জিডিপিতে ভারতের ম্যানুফ্যাচারিং সেক্টরের অবদান মাত্র ১৫-১৬ শতাংশ। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) এবং অন্যান্য প্রকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে।
 রাজকোষ একত্রীকরণ (ফিসকাল কনসোলিডেশন) অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে: রাজকোষ ঘাটতি (ফিসকাল ডেফিসিট) ২০২৫-২৬ সালের ৪.৪ শতাংশ থেকে ২০২৬-২৭ সালে ৪.৩ শতাংশে নেমে আসবে এবং রাজস্ব আয় ঘাটতি (রেভিনিউ ডেফিসিট) ১.৫ শতাংশেই থাকবে। এই হারে, এফআরবিএমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ন্যূনতম ১২ বছর লাগবে এবং এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে আমাদের।
 কর বিষয়ে ২০২৫-২৬ সালে যে ঝুঁকি (ট্যাক্স গ্যাম্বল) নেওয়া হয়েছে সেটি ব্যর্থ হয়েছে মারাত্মকভাবেই। বাজেট গাণিতিকভাবে রক্ষা পেয়েছে রিজার্ভ ব্যাংকের সৌজন্যে। তারা ২০২৫-২৬ সালে উদার হস্তেই প্রায় ৩ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকার ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এই বাবদ পূর্ববর্তী দুবছরে তারা দিয়েছিল যথাক্রমে ২ লক্ষ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং ২ লক্ষ ৬৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। ইউপিএ সরকার ক্ষমতায় ছিল ২০০৪-১৪ সালে। রিজার্ভ ব্যাংক থেকে তারা সর্বোচ্চ ডিভিডেন্ড পেয়েছিল ২০১৩-১৪ সালে এবং তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫২ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী প্রধান অর্থনৈতিক 
উপদেষ্টাকে উপেক্ষা করেছেন
আর্থিক সমীক্ষার প্রথম অধ্যায়ে প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ‘সতর্ক থাকতে হবে, তবে হতাশ হলে চলবে না’ গোছের পরামর্শ দিয়েছেন। এই সুর বজায় ছিল রিপোর্টের পুরোটাতেই। অন্য একটি অধ্যায়ে তিনি ফিসকাল কনসোলিডেশনের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথরেখার পক্ষে সওয়াল করেছেন। প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা একটি সাহসী পদ্ধতির পক্ষে সওয়াল করেছেন একমাত্র নগরায়ণ বিষয়েই। তাঁর পরামর্শ—‘শক্তিশালী মেট্রোপলিটন শাসনব্যবস্থা, অনুমানযোগ্য প্রয়োগ এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নাগরিক চুক্তি’ দরকার। এতে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে প্রণোদনাগুলি সারিবদ্ধ হবে। আরো উল্লেখযোগ্য আর্থিক সংস্থান দিয়ে শহরগুলির ক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে...।’
তাঁর প্রধান উপদেষ্টার প্রতি অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ছিল ‘নন-ইনটেলেকচুয়াল অ্যান্ড ইভেসিভ’—অর্থাৎ তার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তির অভাব পরিলক্ষিত হয় এবং ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার মতোই। তাঁর ৮৫ মিনিটের ভাষণে ভারতীয় অর্থনীতির হাল তিনি খোলসা করেননি। এমনকি, শুল্ক ও জবরদস্তিমূলক লেনদেন চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির উপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে দ্বিমুখী আক্রমণ শানালেন সে সম্পর্কেও তাঁর কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বা চীনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ কিংবা অন্যকোনো বিষয় নিয়েও অর্থমন্ত্রী নীরব থেকেছেন। অথচ বাজেট ভাষণ থেকে যেকোনো সচেতন ব্যক্তিরই কাছেই ওইগুলি ছিল এক স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আমার ‘চ্যারিটেবল ভিউ’ বা উদার মত হল, অর্থমন্ত্রী এবং সরকার ইকোনোমিক রিভিউ নিয়ে মাথাই ঘামান না। অন্যদিকে ‘আনচ্যারিটেবল ভিউ’ বা অনুদার দৃষ্টিভঙ্গিটি হল, তাঁরা মনে করেন আমরা এমন একটি গ্রহে বাস করছি যা সৌরজগতের অংশ নয়।
আমি হতবাক হয়েছি এটা দেখে যে, যেসব বিষয়ে দেশবাসী উদ্বিগ্ন সেগুলির মোকাবিলার জন্য সরকারের নীতিগুলি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেননি অর্থমন্ত্রী। ওই উদ্বেগজনক বিষয়গুলি হল—বৃদ্ধির মন্থর গতি, দারিদ্র্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, থমকে যাওয়া বিনিয়োগ, ব্যাপক বেকারত্ব, জনকল্যাণে অবহেলা, ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং পরিকাঠামো ও অপরিহার্য পরিষেবাগুলির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান প্রভৃতি। 
হিসাবরক্ষকের পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে
সাধারণ হিসাবরক্ষণের মানদণ্ডেও অর্থমন্ত্রীর আর্থিক ব্যবস্থাপনার রেকর্ড ছিল দুর্বল। ২০২৫-২৬ সালের বাজেট বরাদ্দে গ্রামোন্নয়ন, নগরোন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং আরো অনেক মন্ত্রকের ব্যয়ে কাটছাঁট করা হয়েছে নির্মমভাবে। শিবরাজ সিং চৌহানের তত্ত্বাবধানে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে ৬০ হাজার ৫২ কোটি টাকা ছেঁটে দেওয়া হয়। জল জীবন মিশনের জন্য প্রথমে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৬৭ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সংশোধিত হিসেবে দেখা গিয়েছে যে খরচ করা হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার কোটি টাকা। মূলধনী ব্যয় ২০২৪-২৫ সালে ছিল জিডিপির ৩.২ শতাংশ। সেটা ২০২৫-২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩.১ শতাংশে। প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ১.৬ শতাংশে (মোট ব্যয়ের ১১.৪ শতাংশ) নেমে এসেছে। ২০২৬-২৭ সালে এটা জিডিপির ১.৫ শতাংশে (মোট ব্যয়ের ১১.১ শতাংশ) নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যেসব বিশেষজ্ঞের কিছু জ্ঞানগম্যি আছে বাজেট ভাষণের তীব্র সমালোচনাই করেছেন তাঁরা। ‘চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি’ নিয়ে সরকারের আত্মপ্রশংসাকে উপহাস করেছেন ডঃ সুরজিৎ ভাল্লা। ফিসকাল কনসোলিডেশনের ধীরগতি নিয়ে ডঃ সি রঙ্গরাজন প্রশ্ন তুলেছেন। কৃষিক্ষেত্রের একটি বৃহৎ অংশকে অবহেলা করা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন ডঃ অশোক গুলাটি। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রোহিত লাম্বা বাজেটটিকে এই বলে উপহাস করেছেন যে, এটি এমন একটি অর্থনীতির পক্ষে উপযুক্ত যা একটি পরিকল্পনার সন্ধানে রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী তাঁর শ্রোতাদের সামনে বিভিন্ন প্রকল্প, কর্মসূচি, মিশন, প্রতিষ্ঠান, উদ্যোগ, তহবিল, কমিটি প্রভৃতি উপস্থাপন করেছেন। আমি গুনেছি অন্তত ২৪টি! শীঘ্রই জানা যাবে যে, এই ঘোষণাগুলির অনেকের জন্যই কোনো অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি!
এই যে বাজেট পাওয়া গেল সেটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্যের একটি অনুশীলন (এক্সারসাইজ ইন ইনটেলেকচুয়াল লেজিনেস) মাত্র।
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ