কোয়াই নদীর কাছে
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ডেভিড লিন-এর সাড়া জাগানো ছবি ‘ব্রিজ অন দ্য রিভার কোয়াই’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় যুদ্ধবন্দিদের দিয়ে থাইল্যান্ডের বিখ্যাত কোয়াই নদীর উপর একটা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় ছবিটি। এ ছবি সাড়া ফেলে দিয়েছিল সারা বিশ্বে! সেই সেতুটি দেখব বলে জানুয়ারির শেষে বেরিয়ে পড়লাম থাইল্যান্ড। 
কলকাতা থেকে রাতের বিমানে দু’ঘণ্টা দশ মিনিট ওড়ার পর যখন ব্যাঙ্ককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে নামলাম তখনও শেষ রাতের অন্ধকার জড়িয়ে রয়েছে পুরো দিগন্ত জুড়ে। কাছাকাছি একটা হোটেলে পৌঁছে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম কোয়াই নদী দর্শনে। পরিচ্ছন্ন শহরটির রাস্তা ধরে প্রায় তিন ঘণ্টা চলার পর পৌঁছে গেলাম নদীটির কাছে। জায়গাটির নাম ‘কাঞ্চনাবুড়ি’। এখানেই নদীর উপর গড়ে উঠেছে সুদৃশ্য সেতুটি। সম্পূর্ণ কালো রং। নীচ দিয়ে সবেগে বয়ে চলেছে টলটলে জল। সেই জলে ঢেউ তুলে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে দুধসাদা স্পিডবোট। দু’তীরে সারি সারি সুসজ্জিত হোটেল। যার বেশ কয়েকটি তৈরি হয়েছে জলের উপর। অনেকটা কাশ্মীরের ডাল লেকের ধারে গড়ে ওঠা হাউসবোটগুলির মতো। দেখলেই দু’চোখ জুড়িয়ে যায়।
যুদ্ধবন্দিদের দিয়ে কোয়াই নদীর উপর যে সেতুটি গড়ে তোলা হয়েছিল সেটি ছিল কাঠের। পরবর্তীকালে সেখানেই গড়ে উঠেছে বর্তমানের মজবুত সেতুটি। একসময় 
ব্যাঙ্কক থেকে মায়ানমারের রেঙ্গুন পর্যন্ত প্রায় ৪১৫ কিলোমিটার ব্যাপী তৈরি হওয়া এই রেলপথটির পরিচিত নাম ছিল ‘থাইল্যান্ড মায়ানমার লিঙ্ক রেলওয়ে’। যদিও দীর্ঘকাল নিয়মিত যাত্রী পরিবহণের জন্য রেলপথটি বন্ধ হয়ে পড়ে থাকায় সেটি পরিচিত ‘ডেথ রেলওয়ে’ নামে।
সেতুর উপরে দাঁড়িয়ে সকলেই প্রাণ ভরে উপভোগ করতে চাইছেন কোয়াই তীরের স্বর্গীয় সৌন্দর্য। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেমে আসি তীরে। 
কোয়াইয়ের জল এখানে ঈষৎ সবুজাভ। সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুধসাদা স্পিড বোট। উঠে বসি ওরই একটিতে। তারপর সে এক অসাধারণ রোমাঞ্চকর সফর। বেশ কিছুটা চলার পর এক জায়গায় এসে থামে আমাদের বোট। নেমে দেখি এখানেই নদীতীরের একটা ঘরে গড়ে তোলা হয়েছে সুন্দর একটা ‘ওয়ার মিউজিয়াম’। যুদ্ধবন্দিদের দিয়ে সেতুটি নির্মিত হওয়ার সময়কার প্রচুর সাদা কালো ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে ঘরটি। রয়েছে বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, বন্দি সৈন্যদের পোশাক-আশাক, খাবার পাত্র এমনকী সাজিয়ে রাখা হয়েছে নিষ্ক্রিয় করা একটি আস্ত বোমাও। ভ্রমণার্থীদের কাছে লিখিত আকারে তুলে ধরা হয়েছে সেতুটি তৈরির ইতিহাস ও যুদ্ধবন্দিদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু টুকরো কথা। রেললাইনের কাছে এসে দেখি লোকে লোকারণ্য। সকলেই উদগ্রীব দাঁড়িয়ে লাইনের দু’ধারে। 

Advertisement

শুনলাম প্রতিদিন সকালের দিকে একটা ট্রেন যায় এই পথ দিয়ে। সেটিই আবার ফিরে আসে বিকেলের দিকে। খানিক বাদেই ট্রেনটি ধীর লয়ে এগিয়ে আসে। মুহূর্তে নড়ে ওঠে ভিড়টা। যেন সাত রাজার ধন এক মানিক। সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেতুর উপর দিয়ে এগিয়ে আসতে থাকা ট্রেনটির ছবি তুলতে। বিপজ্জনকভাবে কেউ কেউ তোলে ট্রেনের সঙ্গে সেলফিও। তখন বেলা পড়ে আসছে। সেই পড়ন্ত বেলায় রেললাইন ধরে অপরূপ অরণ্য প্রকৃতির মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মায়ানমার সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাই বেশ কিছুটা। সে অনন্য অভিজ্ঞতা। 

ক্রমে সূর্য পশ্চিমে ঢলে। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু ছড়িয়ে পড়ে সেতুর গায়ে,গাছ গাছালির মাথায় মাথায়,ঈষৎ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আপন ছন্দে বয়ে চলা কোয়াই-এর জলে। প্রহর শেষ হয় কিন্তু তার আনন্দ আবেশটুকু যেন জড়িয়ে থাকে সমস্ত ভুবন জুড়ে। একরাশ তৃপ্তি নিয়ে উঠে বসি গাড়িতে। পরদিন যাব ব্যাঙ্ককের আর এক প্রান্ত দর্শনে। তবে জানি, কোয়াই নদীর তীরে সারাদিন কাটানোর এই মধুর স্মৃতি আমার মনে চিরদিনই অম্লান হয়ে থাকবে। 
কীভাবে যাবেন  
কলকাতা ও দিল্লি থেকে বিমানপথে যাওয়া যায় ব্যাঙ্কক। 
কোথায় থাকবেন
জনপ্রিয় সব পর্যটনস্থলেই প্রচুর হোটেল ও হোম স্টে রয়েছে। 


সমীর কুমার ঘোষ