সমৃদ্ধ দত্ত
সমৃদ্ধ দত্ত
• ডালহৌসির পথ ছেড়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরতে হবে। এখান থেকে পাহাড়ের পথে ঘুরে ঘুরে নামতে হবে ইরাবতী উপত্যকায়। বনের মধ্যে দিয়ে সেই পথ। দেওদার, পাইনের স্নিগ্ধ সুবাস ভেসে আসে বাসযাত্রীদের কাছে। আকাশ মেঘমুক্ত। পাইনের ফাঁক থেকে সেই সূর্যালোক এসে পৌঁছয় বন পাহাড়ের সবুজে। আবার অরণ্য সেই রৌদ্রকে ফিরিয়ে দেয় ইরাবতী অভিমুখে। সঙ্গী প্রাণজুড়ানো শীতল বাতাস। ওই যে ইরাবতী, তার কিছুটা উপরে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। ঘরবাড়ি দিয়ে তৈরি নয়নাভিরাম গ্রাম। অনেক উপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সুন্দর সাজানো গোছানো খেলাঘর। ইরাবতীর দক্ষিণ তীরে চম্বা নগরী। বাঙালি ভ্রমণপিপাসু পাঠক মাত্রই জানেন যে, ভ্রামণিক ও লেখক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিমাচল প্রদেশের এই চম্বা নগরীকে অভিহিত করেছিলেন, ‘পাহাড়ের কোলে ঘুমন্ত প্রশান্ত শিশু, নদীর নীলধারা যেন তার কণ্ঠমালা!’
রাজকুমারী চম্পাবতী শুধু যে অত্যন্ত রূপবতী এমন নয়, তিনি ছিলেন অসামান্য শাস্ত্রবিশেষজ্ঞও। কিন্তু হিমালয় ঘেরা ক্ষুদ্র এদিক ওদিক ছড়ানো জনপদে কোথায় পাওয়া যাবে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত? অতএব এক সন্ন্যাসীর কাছে যাতায়াত করতেন চম্বা রাজ্যের রাজকন্যা চম্পাবতী। সেই সন্ন্যাসী ক্রমেই বুঝেছিলেন যে, এই কন্যার মধ্যে দৈবী শক্তি রয়েছে। নিছক শাস্ত্র পড়ে সে বিদুষী হয়নি। কিন্তু কন্যা কেন প্রতিদিন এভাবে এক পুরুষের কাছে যায়? সত্যিই কি শাস্ত্র ও ধর্ম আলোচনা? নাকি...! সন্দেহের বশে স্বয়ং রাজা কন্যার পিছু দিয়ে দেখতে চান ব্যাপারটা কী? যে জীর্ণ পাতা দিয়ে তৈরি কুটিরে রোজ যেতেন রাজকুমারী, সেখানে পৌঁছে রাজা দেখলেন কন্যাও নেই, সন্ন্যাসীও নেই। শূন্য কুটির। একটি প্রদীপ জ্বলছে। রাজা বিস্মিত হওয়ার পরক্ষণেই শুনলেন এক দৈববাণী, মিথ্যা সন্দেহ করেছ তুমি নিজের দৈব কন্যাকে। তাই আর কখনও তাঁর দেখা পাবে না। তিনি আসলে দেবীরই এক রূপ। রাজা একথা শুনে ভেঙে পড়লেন। অতঃপর নিজের কন্যারই মূর্তি স্থাপন করে নির্মাণ করলেন মন্দির। চম্বার সেই মন্দিরে নিত্য পুজো হয়।
চম্বায় নতুন রাজধানী নির্মাণ করতে সর্বাগ্রে জল লাগবে। নদী থেকে তা আনার ব্যবস্থা হলেও কিন্তু জল আসছে না। রাজা স্বপ্ন দেখলেন, মহারানি আত্মবলিদান দিলে জল ঢুকবে নগরীতে। মহারানি নয়না দেবী প্রাণ বিসর্জন দিলেন ঝাঁপ দিয়ে। অবশেষে জলের প্রবাহ এল চম্বায়। তাই তৈরি হল নয়না দেবী মন্দির।
এহেন দেবদেবী, লৌকিক, অলৌকিক লোককথার অপরূপ চম্বা ভেসে যাচ্ছে বছর বছর। কারণ, ওই উল্লিখিত বিরণের চম্বা নগরী, তার যাত্রাপথ, পরিবেশ, গাছ-পাহাড় আর সেরকম নেই। যে চম্বায় চৈত্র ও বৈশাখ মেলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত সাধারণ মানুষ ও ভক্তবৃন্দ, তাদের এখন আতঙ্কে। অপেক্ষা থাকে কবে বর্ষায় আবার ধ্বংসলীলা হবে। সব লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। ঠিক উত্তরাখণ্ডের ধারালি গ্রামের মতো। গঙ্গোত্রী যাওয়ার পথে যে ধারালিতে তীর্থযাত্রীরা বিশ্রাম নেয়, রাত্রিযাপন করে, সেই গ্রামের সৌন্দর্য ধ্বংস করে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য হোটেল, খাদ্যবিপণি, ভোগ্যপণ্য বিপণি। যত্রতত্র পাহাড়ে ডিনামাইট ফাটানো হয়েছে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য। আর তার পরিণতি? কয়েকমাস আগে প্রকৃতির রোষ আছড়ে পড়েছে ক্ষীরগঙ্গা নদীতে। মাটি আর পাথরের পাহাড় ধসে পড়েছে। নদী উঠেছে ফুঁসে। এখনও ৫৫ জন নিখোঁজ। ঠিক চারদিন পর একটি মেঘভাঙা বৃষ্টি জম্মু-কাশ্মীরের কিস্তওয়ার জেলার প্রত্যন্ত চোস্তি গ্রামে ৬৭ জনকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। মাত্র ১৫ সেকেন্ডে। কেন? কারণ সেই জলস্রোতকে ধারণ করে রাখার মতো মাটি বা পাথর ছিল না পাহড়ে।
ভারতের ৩৬টি রাজ্যের মধ্যে ২৭টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হল প্রাকৃতিক বিপর্যয়প্রবণ। এটা ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির তথ্য। এর মধ্যে ২৭ শতাংশই হল নদী ভাঙন, বন্যা, পাহাড়ে ধসের প্রবণতা। ২০২৪ সালের প্রথম ১০ মাসে এরকম ধস, বন্যা, মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে সব ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি কারণে দেশে মৃত্যু হয়েছে ২,৯৩৬ জনের। শুধু হিমাচল প্রদেশেই ৪০৮ জন। ধস, বিপর্যয়, বৃষ্টি এসব আগেও হয়েছ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী বা স্বাধীনতার আগে-পরের ভ্রমণকাহিনিগুলি পড়লে জানা যাবে সেকথা। কিন্তু বর্তমানে যে ধ্বংসলীলা চলছে সেরকম কখনও হয়নি। আর এই বিনাশকাল ম্যানমেড। অর্থাৎ মানুষ নিজেই তৈরি করেছে নিজের ধ্বংসযাপন। তাই প্রতি বছর জুন মাস থেকে সেপ্টেম্বর, এই চার মাস ধরে যেরকম ভয়াল ভয়ঙ্কর কালান্তক হয়ে প্রকৃতি উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীরে আছড়ে পড়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসের, সেটা সরকারবাহাদুর কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
১২,৫৯৫ কোটি টাকার চারধাম প্রকল্পে ৮২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হবে। কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী—এই চার ধামকে যুক্ত করবে এই প্রকল্প। ইতিমধ্যেই সমাপ্ত হয়েছে ৬২৯ কিলোমিটার। একের পর এক সুড়ঙ্গ নির্মাণ করা হয়েছে। এর পিছনেই আসছে রেলপথ বিস্তার। ‘গ্রিন দুন’ নামক পরিবেশ সংস্থার হিসেব হল, চারধাম প্রকল্প তৈরি হওয়ার পর গত পাঁচ বছরে এই গোটা এলাকা কমবেশি ৯০০ ধসের সাক্ষী হয়েছে। হতাহত বহু। কতটা ক্ষতি হয়? একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ হল, উত্তরকাশীতে ৮ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি ছোটো রাস্তা প্রশস্ত করতে ৩ হাজার গাছ কেটে ফেলতে হচ্ছে। এই পথটি ভাগীরথী ইকো সেনসিটিভ জোনের অন্তর্গত। কোনওরকম ক্ষুদ্র প্রাকৃতিক বদল বিরাট বড়ো বিপর্যয় আনতে পারে।
হিমাচল প্রদেশে কী হচ্ছে? শুধুমাত্র বিগত চার মাসে ৪৫টি মেঘভাঙা বৃষ্টি হয়েছে। ৯১টি ফ্ল্যাশফ্লাড। ১০৫ পাহাড় অথবা নদী উপত্যকায় ধস নেমেছে। ৬৬০টি ছোট, মাঝারি, বড় রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই উন্নয়ন হিমাচলবাসীরা কি চেয়েছে? নাকি সরকার, কর্পোরেট, ঠিকাদার, হোটেলিয়ার লবিদের চাপ? যখনই কোনও সড়ক তৈরি করা হয়, বাঁধ নির্মাণ করা হয়, সুড়ঙ্গ খনন হয়, তখন সেই সব মাটি, পাথর কোথায় পড়ে? পার্শ্ববর্তী নদীতে। পাহাড়ি নদীর গভীরতা কতটা? সামান্য। তাও যদি এভাবে বুজে যায়, তাহলে জল ধারণ ক্ষমতা থাকবে কেন? তারা গ্রাম ভাসিয়ে দেবে না কেন? কেনই বা ফুঁসে উঠবে না? অতএব মন্দাকিনী কিংবা ইরাবতী, ক্ষীরগঙ্গা অথবা ধৌলি সকলেই প্রতিশোধ নেবে।
সরকারের বক্তব্য কী? বক্তব্য হল, সমতলের মানুষই সব বড়ো বড়ো রাস্তা আর বাণিজ্য, পরিকাঠামোর সুবিধা পাবে? পাহাড়ি গ্রামগুলির মানুষ কী দোষ করল? এটা তো যুক্তির কথা নয়! সমতলে রাস্তা নির্মাণ করতে পাহাড় ধ্বংস করতে হয় না। নদী বুজিয়ে ফেলতে হয় না। আর শহর প্রাকৃতিকভাবে এতটা বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে না। উত্তরাখণ্ড সরকারের অন্যতম যুক্তি হল, ২০১৩ সালে তো চারধাম প্রকল্প ছিলই না। সেই বছর জুন মাসে কেদারনাথে মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তাহলে অযথা কেন উন্নয়ন প্রকল্পকে দোষ দেওয়া হচ্ছে?
কিন্তু সর্বাগ্রে দেখা দরকার, কোনও দীর্ঘমেয়াদী প্রাণ, সম্পদ, পরিবেশের ক্ষতি না করে কীভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব! সেক্ষেত্রে সামান্য কম উন্নয়ন হলে ক্ষতি কী? অন্যভাবে পাহাড়ি মানুষের সামাজিক উন্নয়ন করা হোক। তারা নিজেরাও কী চায় এভাবে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থেকে দিনযাপন? চায় না। নদীতীরের যে একটি ভূমিকা আছে, সেটা জানা নেই? সেই নদীতীর দখল করে অনন্ত নির্মাণকার্য চলে, দোকান বাড়ি কারখানা হয় সরকারের চোখের সামনেই। কেউ বাধা দেয় না কিছু টাকার লোভে। পাহাড়ের ধাপ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। ইচ্ছা করলেই সেখানে নির্মাণ কার্য করা যায় না।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বৃহত্তম শিকার কে হতে চলেছে? ভারত। প্রবল বর্ষা হচ্ছে। প্রবল ঠান্ডা পড়ছে। প্রবল গরম পড়ছে। তা দেখে উন্নয়ন প্রকল্প করা দরকার। কারণ, মানুষ শুধু নিহত কিংবা নিখোঁজ হচ্ছে না। শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারণে ভারতে ২০২৪ সালে কত মানুষ অন্য ঠিকানায় চলে গিয়েছে আশ্রয়ের খোঁজে? ৫৪ লক্ষ! একে বলা হয় ‘ডিজাস্টার মাইগ্রেশন।’
শুধুই কি সরকারের দোষ? একেবারেই না। সমান দায়িত্ব কিন্তু নাগরিকেরও। নিত্যনতুন ট্যুরিস্ট স্পট আবিষ্কারের এক অসুস্থ তাড়নার জন্ম হয়েছে। প্রকৃতি রহস্যময়। তার সব রহস্য ভেদের দরকার কী?
প্রকৃতিকে ধ্বংস করার খেলায় নেমেছিল আধুনিক ও বুদ্ধিমান মানুষ। অবশেষে নদী, বর্ষা, পাহাড় একজোট হয়েছে। তারা নিচ্ছে প্রতিশোধ!