সংবাদদাতা, করিমপুর: প্রাচীনত্বের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বার্তা বহন করে চলেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হোগলবেড়িয়ার নস্করী মায়ের দুর্গাপুজো। প্রায় ৪৮৪ বছরের পুরনো এই পুজোয় ধর্মের বিভেদ ভুলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন। পুজো কমিটিতেও হিন্দুদের পাশাপাশি রয়েছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা। পুজোকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিন ধরে বসে মেলা। সেখানে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ভিনরাজ্য থেকেও বহু মানুষের সমাগম হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় নস্করী মায়ের পুজো পারিবারিকভাবে অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে তা সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। পুজো কমিটির সদস্যরা জানান, নস্করী মায়ের পুজো সকলের পুজো। এখানে ধর্মের কোনও বিভেদ নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু মানুষও এই পুজোকে নিজেদের উৎসব হিসেবেই দেখেন। ফলে পুজোর কয়েক দিন নস্করীতলায় তৈরি হয় সম্প্রীতি ও মিলনের আবহ। পুজোর ইতিহাস ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। কথিত আছে, আনুমানিক ৯৫০ বঙ্গাব্দে বর্তমান নস্করীতলা এলাকায় পদ্মা নদী বয়ে যেত। নদীর শ্মশানঘাটের একটি নিমগাছের নীচে নস্কর বর্মণ নামে এক সন্ন্যাসী সাধনা করতেন। একবার রাজশাহীর চলনকলন গ্রামের এক জমিদার দেবীর মূর্তি ও পুজোর সামগ্রী নিয়ে নৌকায় যাওয়ার সময় প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে সেখানে আশ্রয় নেন। সেই সময় মহাষষ্ঠীর লগ্ন এসে পড়ায় সেখানেই দেবীর পুজো করার সিদ্ধান্ত হয়। জমিদারের অর্থানুকূল্যে পুজোর সূচনা হয়। পরে নস্কর বর্মণ সেই পুজোর দায়িত্ব নেন বলে প্রচলিত রয়েছে। বর্তমান সেবাইতদের অন্যতম গৌরসুন্দর চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার জানান, কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে নস্করী দেবীর বোধন হয়। পুরনো রীতি মেনে এখনও বর্ধমানের হড়োগ্রাম থেকে পুরোহিত আসেন। একসময় শাক্তমতে পুজো হলেও বর্তমানে বৈষ্ণব মতে পুজো হয়। অতীতে পশুবলির প্রথা থাকলেও বর্তমানে তা বন্ধ। নস্কর বর্মণ নিঃসন্তান ছিলেন। জীবনের শেষপর্বে কয়েকজন সেবাইতের হাতে পুজোর দায়িত্ব তুলে দেন। তারপর থেকেই বংশপরম্পরায় পুজোর দায়িত্ব পালন হয়ে আসছে। স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি খুব প্রাচীন এই মন্দিরের সংস্কার হয়েছে। মন্দিরের সামনে বিরাট নাটমন্দির স্থাপনের কাজ চলছে। যাতে পুজোতে আসা দর্শনার্থীদের সমস্যা না হয়। তারা আরও জানান, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির আগে বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ এই পুজো দেখতে আসতেন। সীমান্তের কড়াকড়িতে সেই যাতায়াত বন্ধ হলেও আজও বিভিন্ন জেলা ও ভিনরাজ্য থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। প্রায় পাঁচ শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নস্করী মায়ের পুজো তাই আজও ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সম্প্রীতির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।