প্রথমে ভাবতেন পাথরের মূর্তি। তারপর তাঁকেই মা কালী রূপে মেনে নিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। তা দেখে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের আনন্দ আর ধরে না! লিখছেন গুঞ্জন ঘোষ।
১৮৮৪ সালের গোড়াতেই বিএ পরীক্ষার রেজাল্ট বেরবে। সেদিন গিয়েছিলেন বরাহনগরে বন্ধুর বাড়িতে। বিপদ এল অতর্কিতে!
বন্ধুর বাড়িতে সে রাতটা থেকে যাওয়ার কথা ছিল। রাত এগারোটা পর্যন্ত ভজন হল। তারপর খাওয়াদাওয়া। হঠাৎ দরজায় করাঘাত, রাত তখন দুটো! কে যেন ডাকছে নাম ধরে— ‘নরেন নরেন, শিগগির এস, এখুনি বাড়ি চল!’ দরজা খুলে নরেন্দ্রনাথ দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে বন্ধু হেমালী! কী ব্যাপার! হেমালী জানান, ‘তোমার পিতা আর নেই! হৃদরোগে চলে গেছেন! এক্ষুনি আমার সঙ্গে সিমলে চল।’ নরেন্দ্রনাথ তখনই রওনা দিলেন। দেখলেন শোকস্তব্ধ সারিসারি মুখ! যথাবিহিত শ্রাদ্ধাদি ক্রিয়াকর্ম করলেন। সংসার এক রাতের মধ্যে তাঁর কাঁধে এসে পড়ল। পরিবারে নির্দিষ্ট আয় বলতে কিছুই নেই!
নরেন্দ্রনাথের সামনে পাঁচ-সাতটি অভুক্ত মুখ! দরকার চাকরি। নরেন্দ্র বিভিন্ন দফতরে আবেদন করতে লাগলেন। কিন্তু সর্বত্রই ব্যর্থ। সেই নিদারুণ অভিজ্ঞতা এইভাবে জানালেন, ‘মৃতাশৌচের অবসান হইবার পূর্ব হইতেই কর্মের চেষ্টায় ফিরিতে হইয়াছিল। অনাহারে নগ্নপদে চাকরির আবেদন হস্তে লইয়া মধ্যাহ্নের প্রখর রৌদ্রে আফিস হইতে আফিসান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইতাম — অন্তরঙ্গ বন্ধুগণের কেহ কেহ দুঃখের দুঃখী হইয়া কোনদিন সঙ্গে থাকিত, কোনদিন থাকিতে পারিত না, কিন্তু সর্বত্রই বিফলমনোরথ হইয়া ফিরিতে হইয়াছিল।’ সেই কঠিন সময়ে একদিন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে এসে অনুযোগ করলেন, ‘এত যে আপনি মা মা করেন, আপনার মা কি পারেন না আমাদের অন্নকষ্ট দূর করতে?’
ঠাকুর বললেন, ‘তুই মাকে মানিস না, তাই তোর এত দুঃখ কষ্ট। শোন, আজ মঙ্গলবার তুই মায়ের কাছে যা চাইবি তাই পাবি।’ নির্বাক নরেন্দ্র। ভাবছেন কালীঘর! সেই পাথরের মূর্তি, পৌত্তলিকতা! ঠাকুর ফের বললেন, ‘কী রে দাঁড়িয়ে রইলি যে বড়ো?
যা!... কীরে যা নারে, মায়ের কাছে গিয়ে একবার চা; চেয়ে নে তোর যা চাই। তুই যা চাইবি মা তোকে তাই দিবেন।’ নরেন্দ্রনাথ দক্ষিণ-পূর্বের দরজা দিয়ে উঠোনে নামলেন। মন্দিরে গিয়ে মায়ের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। মায়ের আলুলায়িত কেশ, মুখে উজ্জ্বল হাসি। জিভ কামড়ে আছে ঝকঝকে দাঁতের সারি। কী জীবন্ত চক্ষু! আস্তে আস্তে এই রূপের কাছে নরেন্দ্রনাথ হারিয়ে গেলেন। মন কোন ঊর্ধ্বলোকে ছুটে চলল। তুমি কী মা সেই আদি শক্তি আদ্যাকালী! মা তুমি তোমার শক্তিতে ভুবন আচ্ছন্ন করে রেখেছ। তোমার কৃপাকটাক্ষে সবকিছু সংগঠিত হয়ে চলেছে। আদি অনন্তকাল ধরে তোমার কৃপাকণা পরম করুণা হয়ে আমার ওপর ঝরে পড়ুন মা। আমি কৃপা ভিখারিদের দেখতে পারতাম না, আজ আমিই তোমার কৃপা ভিখারি। বুঝেছি মানুষের রূপ যৌবন অর্থ ঐশ্বর্য সবই অনিত্য! এই দ্বন্দ্বভরা চিরদুঃখপূর্ণ নামরূপাত্মক প্রতিভাযুক্ত জগৎ চকিতে বিস্মৃত হয়ে গেল! লজ্জায় নরেন্দ্রনাথের মাথা নত হল। তিনি প্রাণভরে মায়ের কাছে চেয়ে নিলেন, ‘মা আমায় জ্ঞান দাও, ভক্তি দাও, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও!’
সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। চিরকালের কালীঅবজ্ঞা আজ নতুন অনুভবে কালীর আজ্ঞায় রূপান্তরিত হল। ভক্তিবারি ঝেঁপে এল নরেন্দ্রনাথের মন দুয়ারে। ঠাকুরের কাছে ফেরত এলেন।
ঠাকুর খুব খুশি। বললেন, ‘হ্যাঁ রে, মায়ের কাছে তোর দুঃখ নিবারণের জন্য প্রার্থনা করে চেয়ে নিয়েছিস তো তোর যা দরকার?’ নরেন্দ্রনাথ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। ঠাকুর প্রশ্ন করলেন, ‘কীরে চেয়েছিস তো?’
‘না! নিজের জন্য কিছুই চাইতে পারলাম না।’
ঠাকুর তিরস্কার করলেন, ‘সে কী রে! যা, আবার যা। তোর যা চাইবার চেয়ে নে। টাকা-পয়সা, বলবি সাংসারিক দুঃক্ষকষ্ট দূর করে দাও।’ নরেন্দ্রনাথ আবার চললেন। সেই একদৃশ্য। সামনে চিন্ময়ী মা! আবার মাতৃরূপে বিহ্বল হয়ে গেলেন। একই প্রার্থনা, ‘মা, আমায় জ্ঞান দাও মা। ভক্তি দাও মা, বিবেক দাও, বৈরাগ্য দাও।’ এবারেও ব্যর্থ। ঠাকুরের কাছে এসে বললেন, ‘চাইতে পারলাম না। লজ্জা করল।’ সেই অভাবনীয় অভিজ্ঞতার কথা নরেন্দ্রনাথ বলেছেন— ‘মন্দিরের বাহিরে আসিয়া মনে হইল ইহা নিশ্চয়ই ঠাকুরের খেলা, নতুবা তিন তিনবার মার নিকটে আসিয়াও বলা হইল না। অতঃপর তাঁহাকে ধরিয়া বসিলাম, আপনিই নিশ্চিত আমাকে ঐরূপে ভুলাইয়া দিয়াছেন, এখন আপনাকে বলিতে হইবে, আমার মা-ভাইদের গ্রাসাচ্ছাদনের অভাব থাকিবে না।’
তিনি বলিলেন, ‘ওরে, আমি যে কাহারও জন্য ঐরূপ প্রার্থনা কখনও করিতে পারি না, আমার মুখ দিয়া যে উহা বাহির হয় না। তোকে বললুম, মার কাছে যাহা চাহিবি তাহাই পাইবি; তুই চাহিতে পারিলি না, তোর অদৃষ্টে সংসারসুখ নাই, তা আমি কি করিব।’ বলিলাম, ‘তাহা হইবে না মহাশয়, আপনাকে আমার জন্য ঐ কথা বলিতেই হইবে; আমার দৃঢ় বিশ্বাস — আপনি বলিলেই তাহাদের আর কষ্ট থাকিবে না।’ ঐরূপে যখন তাঁহাকে কিছুতেই ছাড়িলাম না, তখন তিনি বলিলেন, ‘আচ্ছা যা, তোদের মোটা ভাত-কাপড়ের কখনও অভাব হবে না’।
নরেন্দ্রনাথকে এবার জিততে হবে। হবে সম্মুখ সমর। নিজের পরিবারের অন্নক্লিষ্ট মুখ তো শুধু নয়, শত সহস্র অবয়ব ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে, কত রাজ্য কত প্রদেশ কত বিদেশ! দুঃখ দারিদ্র্য অশিক্ষা আত্মজিজ্ঞাসুদের ভার একা নেবেন নরেন্দ্রনাথ। শিব শিব শিব— মহাদেব যেমন হলাহল পান করেছিলেন, নরেন্দ্র সেই কাজ করবেন। মা যেন সেই নির্দেশ দিলেন। নরেন্দ্র রূপান্তরিত, তাঁর চোখে বাধাহীন অশ্রুরেখা। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘আমায় একটি গান শিখিয়ে দিন, মায়ের গান।’ আমরা আমাদের মতো এইবার যদি ধ্যান করি সেই, ‘অতি সুনন্দিত বন্দিত’ স্বর্গীয় দৃশ্যাবলি?
ঠাকুর শেখাচ্ছেন, ‘গা নরেন গা, আমার সঙ্গে গা— আমার মা ত্বং হি তারা... তুমি ত্রিগুণধরা পরাৎপরা!’ সংগীতে সিদ্ধ নরেন্দ্রনাথ তান শুনেই বুঝে গেলেন রাগ ভৈরবী ধরেছেন। হ্যাঁ গা, এ কী যোগসূত্র গা! এই রাত বুঝি ভৈরবীর আর্তিকাল! একতাল বারো মাত্রার চলন। কানে শুনছেন দেবকণ্ঠ, ‘ওরে শুধু কাঁদলে হবে রে— গাইতে গাইতে কাঁদতে হবে যে, নে ধর— আ-মার মা ত্বং হি তা-রা/ তু-মি ত্রি-গুণ-ধ-রা পরাৎপরা/ মা ত্বং হি তারা...!’
নরেন্দ্রনাথ গন্ধর্বনিনাদিত কণ্ঠে তুলে নিলেন গান। তারপর? দরবিগলিত কণ্ঠে রাতভর গেয়ে চললেন —‘আমি জানি গো দীন-দয়াময়ী,/ তুমি দুর্গমেতে দুঃখহারা/ মা ত্বং হি তারা।’ ও মাগো, তুমিই তো উদ্ধারকর্ত্রী তারা! মা তুমি সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ— এই তিন গুণের ধারক আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে সেই পরম সত্তা হয়ে তুমিই তো রয়েছ গো!
তুমি জলে আছ, স্থলেও আছ। তুমিই তো এই সৃষ্টির আদিমূল। তোমার কথা আর কত বলব! তুমি যে আমার সর্বস্ব। এতদিন মানিনি, আজ আমার প্রাণেশ্বর আমার চোখ খুলে দিয়েছেন!
মা কথা রেখেছেন। ঠাকুরের আনন্দ আর ধরে না। তাঁর নরেন কালী মেনেছে! সেটা কি পাথরের কালী, নাকি রামকৃষ্ণ-কালী!
প্রিয় নরেন্দ্র সারা রাত গান গেয়ে ভাবে অবসন্ন। ভোরের দিকে ঘুম এসেছিল। ঠাকুর নিজেই মাদুর পেতে বিছানা করে দিয়েছেন। এই সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ কী করছিলেন সেই নামচা কেউ লিখে রাখেননি।
ধরে নিতে পারি, ভোর হচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির বাগানে শতসহস্র পাখির কলকাকলি। মালি ভর্তাভারির ঝাঁটপাট দেওয়া হয়ে গেছে। গোল বারান্দার বাঁদিকে মাধবীলতার ঝোপে উন্মত্ত বাতাসের দোল।
ঠাকুর তাঁর ঘরের পুবের দরজা খুললেন। মা গঙ্গাকে প্রণাম করলেন। ওপারে বালির গঙ্গাতীরের শ্মশানচিতার ধোঁয়া নির্বাণরেখা ছড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে!
হঠাৎ দেখলেন ভক্ত বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল আসছেন। তাঁকে দেখেই ঠাকুরের আনন্দে জগতের সেরা খবরটি জানিয়ে দিলেন, ‘ওগো, নরেন কাল কালী মেনেছে— বেশ করেছে, না?’
একটু পরে ঠাকুর তাঁর ছোটো খাটটিতে এসে বসলেন। সারাক্ষণ স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে নরেনকে দেখেই যাচ্ছেন। শক্তিকে মেনে নিয়েছেন সদাশিব। শক্তিই তো ক্রিয়াশীল হয়ে শিবের মাধ্যমে জীবজগতের জড়তা নাশ করবে, মোহ ভাঙবে! সেই কাজের জন্যেই তো সপ্তঋষির প্রধান ঋষিকে নামিয়ে আনা! তাকেই তো বলতে হবে—‘হে আমার ভাই চাষাভুষো...!’
কবি হয়ে লিখবেন সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘নিঃশেষে নিভেছে তারাদল, মেঘ এসে আবরিছে মেঘে,/স্পন্দিত ধ্বনিত অন্ধকার, গরজিছে ঘূর্ণ-বায়ুবেগে...!’
তখন বেশ বেলা। এলেন নরেন্দ্রনাথের বন্ধু তারাপদ ঘোষ। দেখলেন, ঠাকুর তাঁর ঘরে একা মেঝেতে বসে আছেন। কিছুটা তফাতে নরেন্দ্র ঘুমিয়ে আছেন। তারাপদ কাছে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করতেই তিনি ঘুমন্ত নরেনের দিকে আঙুল তুলে বলে উঠলেন, ‘ওরে দেখ, ঐ ছেলেটি বড় ভাল, ওর নাম নরেন্দ্র, আগে মাকে মানত না, কাল মেনেছে। কষ্টে পড়েছে, তাই মার কাছে টাকা-কড়ি চাইবার কথা বলে দিয়াছিলাম, তা কিন্তু চাইতে পারলে না— বলে, ‘লজ্জা করল!’ মন্দির থেকে এসে আমাকে বললে মার গান শিখিয়ে দাও— ‘মা ত্বং হি তারা’ গানটি শিখিয়ে দিলাম। কাল সমস্ত রাত ঐ গানটা গেয়েছে! তাই এখন ঘুমুচ্ছে। (আহ্লাদে হাসিতে হাসিতে) নরেন্দ্র কালী মেনেছে, বেশ হয়েছে— না?’
এই দিনটির কথা স্বামীজি কখনও বিস্মৃত হননি। বহু পরে বলেছিলেন, ‘তখন আমাদের খুব দুর্দিন। বাড়ীতে অন্ন নেই। মা আমায় বেকায়দায় ফেলে চিরতরে তাঁর গোলাম করে নিলেন! কালী উপাসনা আমার জীবনের একটি সম্পূর্ণ গোপন ও ব্যক্তিগত বিষয়। আমার শরীর চলে যাবার সাথে সাথেই এই রহস্য চলে যাবে, তা কখনও প্রকাশ পাবে না।’
দধিচীর মতো সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে এমনও বললেন, ‘যতদিন পর্যন্ত একটা কুকুর অভুক্ত থাকবে, আমি তার জন্য জন্মগ্রহণ করতে পারি!’ এই আশ্চর্য কথা অতীতে কখনও শোনা যায়নি, ভবিষ্যতে যাবে কি না সন্দেহ। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের শরীররূপধারী শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপায় বিবেকানন্দ বিলিয়ে চলেছেন সেই অমূল্য প্রেমধন—আর্তত্রাণ, সেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানমূলক বিদ্যা, চিকিৎসা থেকে আধ্যাত্মিক দিশা আরও কত কী! বেদান্তের প্রয়োগ কৌশলের কী অনুপম বাহার! কী নিপুণ ব্যবহার! সেই মহাবাক্যেরই কী আশ্চর্য দিব্যস্ফুরণ— ‘নরেন্দ্র কাল কালী মেনেছে, বেশ হয়েছে, না!’



