ফুলডুংরির দেশে
  • ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে বন্দে ভারতে টাটানগর নেমে বাকি পথ গাড়িতে যেতে পারেন। কলকাতা থেকে টানা গাড়িতে গেলে দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে।

Advertisement

এখন আমাদের দু’জনেরই অবসর জীবন। আমি যদিও লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। তবুও কিছুদিন পরপর ভ্রমণের নেশা জাগে। গত শীতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। গন্তব্য ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলা। ঘাটশিলার প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। তার দু’টি কারণ। একটি সুবর্ণরেখা নদী। অপরটি হল সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি।
সকাল ছ’টায় হাওড়া স্টেশন থেকে বন্দে ভারত-এ উঠে পড়লাম। ট্রেনে বসেই মনে অসম্ভব আলোড়ন হচ্ছিল। সত্যি তাহলে এবার আমার বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে! যেহেতু বন্দে ভারত ট্রেনটির ঘাটশিলায় স্টপেজ নেই, সেজন্য আমাদের টাটানগরে নামতে হল। সকাল ন’টায় টাটানগর স্টেশনে পৌঁছালাম। গাড়ি বুক করা ছিল। ড্রাইভার রাজু ভাই দিলখোলা মানুষ। ঘাটশিলা ঢোকার খানিকটা আগে গাড়ি থেকে নেমে গালুডি ড্যাম দেখলাম। এটি সুবর্ণরেখা নদীর উপর। শীতকাল হওয়ায় জল খুবই কম ছিল। মাঝে মাঝে শুকনো জায়গায় পাথর দেখা যাচ্ছিল। আবার কোথাও কোথাও বেশ খানিকটা গভীর জল, তার সৌন্দর্যই আলাদা।
গাড়িতে গল্প করতে করতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম গেস্ট হাউসে। আসার একমাস আগেই বুকিং সেরে রেখেছিলাম। আমরা পৌঁছে স্নান সেরে লাঞ্চ করে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য বিভূতিভূষণের বাড়ি ‘গৌরী কুঞ্জ’। বিকেল পাঁচটায় এই বাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।
দেবদর্শন দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে গেলাম ঘাটশিলার রঙ্কিণীদেবীর মন্দিরে। এটি ঘাটশিলার রোহিনীবেরা গ্রামে অবস্থিত। রঙ্কিণীদেবী মা কালীর একটি জাগ্রত রূপ। অতীতে নরবলি প্রথার জন্য বিখ্যাত ছিল। ব্রিটিশ আমলে সেসব বন্ধ হয়ে যায়। কৃষ্ণ বর্ণের প্রতিমা। পরিবারের সকলের মঙ্গল কামনায় সংকল্প করলাম। 
মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম গৌরী কুঞ্জে। এখানেই জীবন কাটিয়েছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এ যেন অন্যরকম নস্টালজিয়া। এই বাড়িতে বসে ৯০ বছর পূর্বে লিখেছিলেন ‘আরণ্যক’ উপন্যাস। তাঁর বাড়িটি এখনও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে মিউজিয়াম করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে রয়েছে তাঁর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি। সাহিত্যিকের ব্যবহৃত পোশাকও সংরক্ষিত রয়েছে। অমূল্য কিছু পারিবারিক ছবি দিয়ে সাজানো এই মিউজিয়াম। ১৯৩০ সালের গালুডিতে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই অঞ্চল তাঁর এত ভালো লাগে যে এখানে থেকে যান। ভালোবাসতেন সুবর্ণরেখা নদী আর ফুলডুংরি পাহাড়। বিভূতিভূষণ এই বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
রাজু ভাইয়ের ডাকে সংবিত ফিরল। পরবর্তী দর্শনীয় স্থান ‘রাত মোহনা’। সুবর্ণরেখা নদীর মাঝখানে বাঁধ, বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে নদীর দু’পাশের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তাছাড়া এই স্থানটি সূর্যাস্ত সূর্যোদয়ের অসাধারণ দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। সুবর্ণরেখা নদীর সামান্য দূরে রয়েছে একটি টিলা। সেখানকার তিনটি ঝরনার জলধারা থেকে জল এসে সুবর্ণরেখায় গিয়ে মিলিত হচ্ছে। আমরা গিয়েছিলাম গোধূলি লগ্নে। পড়ন্ত সূর্যের আলো ছিটকে পড়ছে সুবর্ণরেখার জলে। জলে সোনালি আলোয় মৃদু ঢেউ। পশ্চিম আকাশ লাল রংয়ের লালিমায় মোহনীয়। গাছে গাছে পাখিদের বাসায় ফেরার কাকলি। অন্যদিকে নদীর জলের ছলাৎ ছল শব্দ। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য...। সেদিনের মতো ফিরে এলাম রিসর্টে।
পরের দিন সকালে দশটায় রওনা হলাম বুরুডি লেকের উদ্দেশে। ফুলডুংরি পাহাড়ের পাদদেশে একটি দোকান থেকে চা খাওয়া হল। এবার পাহাড়ের মাথায় ওঠার পর্ব। কর্তামশাই যেতে রাজি হলেন না। আমি একাই উপরে চড়তে শুরু করলাম। চারদিকে ঘন শাল ও মহুয়ার জঙ্গল। লাল নুড়ি পাথরের পথ ধরে চলতে থাকলাম। পাহাড়ের চূড়া থেকে সমস্ত ঘাটশিলা শহর দেখা যায়। ঘাটশিলা শহরের মনোরম প্যানোরমিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত এই ফুলডুংরি পাহাড়। যা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের প্রেরণা ছিল। যত উপরে উঠছি, জঙ্গল তত গভীর হচ্ছে। প্রায় ৩৫ মিনিটের চেষ্টায় চূড়ায় পৌঁছালাম। চারিদিকে দৃশ্য দেখে মনে হল, কষ্টটা সার্থক। পাহাড় চূড়ায় একটা সমতল বেদির মতো জায়গা আছে। জনশ্রুতি, এখানে নাকি বিভূতিভূষণ একাকী সময় কাটাতেন।
পরের দিন বেরিয়েই প্রথমে গেলাম সুবর্ণরেখা নদীর তীরে গোপালপুর গ্রামের সূর্য মন্দিরে। মন্দিরটি রথ আকৃতির। এই রথের আঠারোটি চাকা রয়েছে। গর্ভগৃহে সূর্যদেবের বিগ্রহ ছাড়াও রয়েছে গণেশ ও শিব পার্বতীর বিগ্রহ। 
পরের গন্তব্য ছিল বুরুডি লেক। লেকে যাওয়ার রাস্তার দু’ধারে জঙ্গল। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। কোথাও ছোটো গ্রাম। কোথাও বা শুধুই জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝের রাস্তা দিয়েই গাড়ি চলল বুরুডি লেকের উদ্দেশে। আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। রাস্তার পাশেই বেদির মতো উঁচু জায়গা আছে। ওখানে বসে একমনে লেকের দিকে তাকিয়ে নীল জলের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। মাঝে মাঝে বকের সারি নীল জলের উপর দিয়ে সাদা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছিল। কখনো মাছরাঙা ভরদুপুরে জলের উপর মাছের সন্ধানে ওড়াউড়ি করছিল। এই সৌন্দর্য শুধু অনুভব করা যায়। লেকের চারদিকে ছোটো বড়ো পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ঘন অরণ্য। অরণ্যের মাথার উপর সূর্যের কিরণ পড়েছে, মনে হচ্ছে স্বর্ণ মুকুট মাথায় দিয়ে রাজা দাঁড়িয়ে আছে। পরদিন টাটানগর থেকে ট্রেন। জঙ্গল, পাহাড় পেছনে রেখে আপাতত ফেরার পালা। 
গৌরী বিশ্বাস