নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: নবম শ্রেণির ছাত্রীকে জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন মা। মায়ের অভিসন্ধি বুঝতে পেরে ব্লক প্রশাসন ও স্কুলের শিক্ষকদের দ্বারস্থ হয়েছিল কাবেরী মণ্ডল। মায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার পর কিছুদিন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ওই ছাত্রীর বিয়ে আটকানো হয়। আবারও স্কুল যাওয়া শুরু করে কাবেরী। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত হিসেবে ১৪আগস্ট কন্যাশ্রী দিবসে ওই ছাত্রীকে কুর্ণিশ জানাল পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসন। মঞ্চে ওই ছাত্রী নিজের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা শোনায়। তা শুনে হাততালিতে মুখরিত হয় অনুষ্ঠান। জেলাশাসক পূর্ণেন্দু মাজী তাকে সংবর্ধনা জানান। শুধু তাই নয়, জেলাশাসক বলেন, ‘কাবেরী আমাদের আশা। তোমার ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য প্রশাসন সব সহযোগিতা করবে।’
জানা গিয়েছে, নন্দীগ্রাম থানার পারুলবাড়ি গ্রামে কাবেরীর বাড়ি। ওই থানার আমগেছিয়া গ্রামে মামাবাড়িতে থেকে সে পড়াশোনা করে। বর্তমানে মহেশপুর হাইস্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্রী। গত জানুয়ারি মাসে অষ্টম শ্রেণিতে পাশ করে নবমে ওঠার পরই তার মা কাবেরীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য নিজেই ছেলে দেখে ফেলেন। তারপর বাপেরবাড়িতে গিয়ে সেখানে বিয়ের কথা গোপন রেখে মেয়েকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও মামার বাড়ির লোকজন তাঁর গোপন ইচ্ছার কথা বুঝতে পেরে কাবেরীকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু, তাঁদের বাধা উপেক্ষা করে জোর করে মেয়েকে ট্রেকারে চাপিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। ট্রেকারে ওঠার পরই কাবেরীকে তার বিয়ের কথা জানিয়ে দেন মা। সেইসময় ট্রেকার থেকে ঝাঁপ দিয়ে দৌড়ে মাসির বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয় ওই ছাত্রী। সেখান থেকেই ১০৯৮নম্বরে ফোন করে। তারপর স্কুলের শিক্ষকদেরও বিষয়টি জানায়। শেষমেশ ব্লক প্রশাসন ও শিক্ষকদের সম্মিলিত চেষ্টায় কাবেরীর বিয়ে আটকানো হয়। প্রায় এক মাস লড়াইয়ের পর আবারও ক্লাসে যাওয়া শুরু করে ওই ছাত্রী।
বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নানাপ্রান্ত থেকে কন্যাশ্রী ক্লাবের সদস্যরা জেলাশাসকের অফিসে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। সেখানে কোলাঘাটের হাকোলা হাইস্কুলের সায়ন্তী সামন্ত, গীতা হাজরা প্রমুখ কীভাবে কন্যাশ্রী ক্লাব গড়ে সহপাঠীদের বিয়ে আটকাতে কর্মসূচি নিচ্ছে তা জানায়। একই মঞ্চে কাবেরীও নিজের বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কাহিনি তুলে ধরে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় নাবালিকা বিয়ের হার অত্যন্ত বেশি। অনেক ছাত্রী স্বেচ্ছায় ১৮বছরের আগেই প্রেমিকদের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যেও রাশ টানা যাচ্ছে না। এদিনের অনুষ্ঠানে জেলাশাসক স্পষ্ট জানান, বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোয় পড়ুয়াদের পাশে রয়েছে প্রশাসন। মহেশপুর হাইস্কুলের টিআইসি অনন্তকুমার গিরি বলেন, কাবেরীর এই লড়াইয়ে আমাদের শিক্ষকরাও শামিল হয়েছিলেন।
এদিন অনুষ্ঠানে জেলাশাসক ছাড়াও অতিরিক্ত জেলাশাসক(উন্নয়ন) নেহা বন্দ্যোপাধ্যায়, জেলা পরিষদের সহ সভাধিপতি সুহাষিনী কর, শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ অপর্ণা ভট্টাচার্য, পাঁশকুড়া পুর প্রশাসক বোর্ডের চেয়ারপার্সন নন্দ মিশ্র সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।