নয়াদিল্লি: পর্দায় তিনি এক অদ্ভুত চরিত্র। কখনো ক্ষতবিক্ষত মানুষ। কখনো ক্রুদ্ধ-বিদ্রোহী। কখনো আবার হাসতে হাসতে ভয় ধরিয়ে দিতে পারেন, এমন এক চরিত্রাভিনেতা। তিনি যেন সংলাপ বলতেন না, ছুড়ে দিতেন। চোখের দৃষ্টি, গলার স্বর, শরীরী ভাষা—সব মিলিয়ে নিজের জন্য অভিনয়ের এক আলাদা ভাষা তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী এই অভিনেতার।
জন্ম মহারাষ্ট্রে। পিতৃদত্ত নাম বিশ্বনাথ। তবে খ্যাতি পান নানা পাটেকর নামেই। অভিনয় শুরু মঞ্চে। তার আগে পড়াশোনা মুম্বইয়ের জেজে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্ট কলেজ থেকে। বাবা গজানন পাটেকর ছিলেন টেক্সটাইল আর্টিস্ট। ছোটো থেকেই রং-তুলির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে নানার। কলেজে পড়াকালীন স্বল্প পারিশ্রমিকের জন্য জেব্রা ক্রসিং আঁকতেন। রং করতেন সিনেমার পোস্টারে। সেই যুবকের চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হল ১৯৭৮ সালে। ‘গমন’ ছবির হাত ধরে। বর্ণময় সেই জার্নিতে ছেদ পড়ল বৃহস্পতিবার। পুনে থেকে নানার ছেলে মলহার পাটেকর জানিয়েছেন, গোয়ার বাড়িতে এদিন ভোরে প্রচণ্ড বুকে ব্যথা শুরু হয় তাঁর। তড়িঘড়ি একটি মেডিকেল টিম আসে। সিপিআর দেওয়া হয়। তাতে কাজ না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় অভিনেতাকে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। তার আগেই মৃত্যু হয় নানার। ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ওই হাসপাতালেই ময়নাতদন্ত করা হয়। একটি মামলাও দায়ের হয়েছে। এদিন পুনেতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। নানা পাটেকরের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাহুল গান্ধী, অনুপম খের, রজনীকান্ত সহ বিশিষ্টরা।
একেবারেই বলিউডি হিরোসুলভ দেখতে নন। এমনকি, ছোটোবেলায় বন্ধুরা কটাক্ষ করে বলত, ‘আয়নায় কখনো নিজের মুখ দেখেছিস? তোর অভিনয় কে দেখবে?’ বন্ধুদের কটাক্ষ অবশ্য তাঁকে দমাতে পারেনি। ‘পারিন্দা’তে হাড়হিম করা গ্যাংস্টার, ‘ক্রান্তিবীর’ ছবির বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ হয়ে তাঁর গর্জন, ‘অব তক ছপ্পন’-এ দ্বন্দ্বে জর্জরিত পুলিশ আধিকারিক—সব ধরনের চরিত্রেই তাঁর অবলীলায় যাতায়াত। ‘সালাম বম্বে’, ‘অঙ্গার’, ‘অঙ্কুশ’, ‘তিরঙ্গা’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’—ছবির সংখ্যা নয়, চরিত্রের অভিঘাতই ছিল তাঁর পরিচয়ের মাপকাঠি। ‘ক্রান্তিবীর’ ও ‘অগ্নিসাক্ষী’র জন্য জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। আবার সেই মানুষটিই ‘ওয়েলকাম’-এর ‘উদয় শেঠি’ হয়ে বিনোদনের পর্দাতেও অনায়াস বিচরণ করেন। গুরুগম্ভীর অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর রসবোধও ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। অবসর নেওয়ার পর জনপ্রিয় মঞ্চানিভেতার জীবনযাপন কেমন, তা পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘নটসম্রাট’ ছবিতে। পরিচালক হিসাবেও কাজ করেছেন নানা। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ তাঁরই পরিচালিত ছবি। এই ছবির প্রস্তুতির জন্য মারাঠা লাইট ইনফ্র্যান্টির সঙ্গে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নেন। তিন বছর কাটিয়েছিলেন সামরিক ইউনিটে। সেই প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পর্দায় নায়কোচিত উপস্থিতি না থাকলেও তিনি ছিলেন বাস্তবের নায়ক। কৃষক ও খরাপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তৈরি করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। নয়ের দশকেই তাঁর পারিশ্রমিক ছিল ১ কোটি টাকা। একবার কয়েক কোটি টাকা দিয়ে গাড়ি কেনার ইচ্ছা হয়েছিল তাঁর। কিনতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু কী মনে করে ফিরে আসেন। সেই টাকা দিয়ে দেন গরিব কৃষক পরিবারের মধ্যে। তিনি তারকা ছিলেন, কিন্তু তারকার ছাঁচে নিজেকে কখনো ঢালেননি। আজীবন বিশ্বাস করতেন, কৃত্রিমতা দিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। মুখের উপর সত্যি কথা বলার জন্য সমালোচিতও হতে হয়েছে তাঁকে। তবে নিজের অকপট স্বভাব বদলাননি।
‘হাম দোনো’ ছবির শ্যুটিংয়ে সাত বছরের বালক পুষ্কর যোগকে বকাবকি করেছিলেন ঋষি কাপুর। সে জন্য ঋষির বিরুদ্ধে কথা বলতেও পিছপা হননি নানা। ২০১৩ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী। চরিত্রকে নিজের শরীর, কণ্ঠ এবং অভিব্যক্তি দিয়ে এমনভাবে ভরিয়ে তুলতেন যে, পর্দায় চরিত্র আর অভিনেতাকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যেত।
বিতর্কও অবশ্য পিছু ছাড়েনি। নানার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেন তনুশ্রী দত্ত। ২০১৮ সালে এই ঘটনার জেরেই বলিউডে ‘মি টু’ আন্দোলনের সূত্রপাত। আবার মনীষা কৈরালা, আয়েশা জুলখার মতো অভিনেত্রীদের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে বারবার। চলতি বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ও রোমিও’, ‘সুবেদার’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখেছেন দর্শক। ‘এথা’, ‘শক্তি শালিনী’র মতো ছবি মুক্তির অপেক্ষায়।
নানা পাটেকর পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। শুধু রয়ে গেল তাঁর সেই স্বর—কখনো প্রতিবাদী, কখনো বিষণ্ণ, কখনো হাস্যময়, কখনো বা তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে ভরা। ছবি: পিটিআই



