সোহম কর, কলকাতা: দুপুরের দিকে কাজ শেষে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ির কাছে এলেন তরু হালদার। হাতের ব্যাগে কয়েকটি টম্যাটো আর ফুলকপি। এই মুহূর্তে পাটুলির ১১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাল্মিকী আবাসনের প্রায় ৪০টি পরিবার নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। আতঙ্কের নাম এসআইআর। সেকথা বলতে বলতে তরুদেবীর চোখের কোল ভিজে উঠল। চিন্তা কীসের? টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া পর্যন্ত মেট্রো সম্প্রসারণের সময় আদি গঙ্গার পাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলির ঠাঁই হয়েছে এই আবাসনে। তরুদেবীদের অভিযোগ, ‘আমাদের এখানে বেশিরভাগ লোকের নাম ২০০২ সালের তালিকায় নেই। তাহলে আমাদের কী হবে?’ তাঁদের প্রশ্ন, ‘আমাদের কি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে?’ পরক্ষণেই পাশ দিয়ে উঠে আসে প্রতিবাদের কথা, ‘কেন পাঠাবে আমাদের? আমাদের জন্ম এই বাংলাতেই।’
মেট্রো রেলের সম্প্রসারণের জেরে এককালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পরিবারগুলি তখন চারদিকে ছিটকে গেল। ২০০৫ সালে তত্কালীন বাম সরকার বাল্মিকী আবাসনে তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এসবের মাঝে ভোটার তালিকার কী হল? বাসিন্দা গীতা মণ্ডল বলছিলেন, ‘২০০০ সালে বাড়ি ভাঙল। তখন থেকে আমরা আদি গঙ্গার পাড় ছেড়ে পাড়ার ভিতরে চলে এলাম। ২০০৫ সালে এই আবাসনে এলাম। তখন আমাদের নাম ভোটার তালিকায় ছিল। আমরা ভোট দিয়েছি। ২০০১ সালেও সম্ভবত ভোট দিয়েছি। তখন আমাদের খুঁজে খুঁজে বের করে ভোট দিতে নিয়ে গিয়েছিল। এখন দেখছি, ২০০২ সালের তালিকায় নাম নেই।’ বাল্মিকী আবাসনের বাসিন্দাদের কেউ কেউ গৃহ সহায়িকার কাজ করেন। কেউ আবার কর্পোরেশনে অস্থায়ী কাজ করেন। মিথিলা মণ্ডল, মেনকা হালদার, করুণা সোরেন, শুভদ্রা সাউ, সন্ধ্যা হালদার, অর্চনা মণ্ডল— নামের তালিকা শেষ হওয়ার নয়। তাঁরা হাতে এনুমারেশন ফর্ম পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের বাবা আটের দশক কিংবা ন’য়ের দশকে মারা গিয়েছেন। তাঁদের ছেলে-মেয়েরা আত্মীয় হিসেবে কার নাম লিখবেন? এই সমস্ত প্রশ্নই এখন নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে আমাদের? এই প্রশ্ন নিয়ে কখনও স্থানীয় নেতা-নেত্রী, কখনও বিএলও’র কাছে যাচ্ছেন তাঁরা। কেউ বলছেন, হিয়ারিংয়ে যেতে হবে। এই মানুষগুলি কেউ রেশন কার্ড, কেউ বাবা-মায়ের ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর জিজ্ঞেস করছেন, এই কাগজে কাজ হবে? উত্তর অধরা থেকে যাচ্ছে। নাম না থাকার সংখ্যাটা হাজার ছুঁয়েছে বলেই তাঁদের ধারণা।