নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বয়সের ভারে শরীর নুয়ে ধনুকের মতো বেঁকে গিয়েছে। গলার স্বরে এখন কেবল বার্ধক্যের কাঁপুনি। অথচ ৯৮বছর বয়সে এসেও জয়তুন বিবিকে আজ রাস্তায় নামতে হয়েছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে। সিউড়ি বিধানসভার রাজনগর ব্লকের সীমান্তবর্তী গ্রাম কানমোড়ায় বুধবার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা গেল। শতবর্ষ ছুঁইছুঁই যে বৃদ্ধা গত কয়েক দশক ধরে দেশের প্রতিটি নির্বাচনে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, আজ জীবনের সায়াহ্নে এসে তাঁকেই শুনতে হচ্ছে- তিনি এদেশের ভোটার নন! ক্ষোভে ফেটে পড়া জয়তুন বিবির একটাই প্রশ্ন, ‘একশো বছর বয়স হতে চলল, এতগুলো ভোট দিলাম। আজ হঠাৎ বাদ কেন?’
কানমোড়া গ্রামের এই হাহাকার কেবল জয়তুন বিবির একার নয়। গ্রামের মোট ভোটারের সংখ্যা এগারোশোর কিছু বেশি হলেও কমিশনের ‘বিবেচনাধীন’ বা বিচারাধীন তকমা পেয়েছিলেন ১৯০ জন। বুধবার সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হতেই দেখা যায়, তার মধ্যে ১০৩ জনের নামই বেমালুম ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এই ঘটনা সামনে আসতেই গ্রামজুড়ে এখন তীব্র উত্তেজনা। গ্রামের বাসিন্দা রহিম খানের ক্ষোভ, ‘আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। একই বাড়ির দুই ভাইয়ের স্ত্রীদের একই নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও একজনের নাম আছে, অন্যজনের বাদ গিয়েছে। এটা হয়রানি ছাড়া আর কী?’ প্রতিবাদের আঁচ এতটাই যে, যাঁদের নাম তালিকায় রয়েছে তাঁরাও আজ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন পড়শিদের পাশে দাঁড়াতে।
গ্রামের বাসিন্দা সফি আহমেদের নাম তালিকায় থাকলেও তিনি বিক্ষোভে শামিল হয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের সবার নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। না হলে কানমোড়া গ্রামের কেউ এবার ভোট দেবে না।’ গ্রামের মোড়ে চেয়ারে বসে জীর্ণ ভোটার কার্ড হাতে জয়তুন বিবির সেই অসহায় চাহনি আজ কমিশনের ‘যান্ত্রিক’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা প্রশাসনের অন্দরেও এই গণছাঁটাই নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে। ১৯৫৬-র দলিল কিম্বা কয়েক দশকের পুরনো ভোটার কার্ড থাকা সত্ত্বেও কেন এভাবে শয়ে শয়ে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর মেলেনি। কানমোড়ার মানুষের এই ‘ভোট বয়কট’-এর ডাক কি শেষ পর্যন্ত কমিশনকে পিছু হটতে বাধ্য করবে? নাকি ৯৮ বছরের জয়তুন বিবিদের ললাটে শেষ বয়সে ‘পরিচয়হীন’ হওয়ার কলঙ্কই জুটবে? উত্তর দেবে সময়।