সমীর সাহা, নবদ্বীপ: তোমায় সাজাবো যতনে...। বাংলার দেব-দেবীকে সাজাতে সাজাতে কবে যে ওঁরা সজ্জাশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছেন, তা নিজেরাও জানেন না! ওঁদের গ্রামের নামটাও বদলে হয়ে গিয়েছে ‘সাজের গ্রাম’। ওদের হাতে তৈরি বুলেনের সুতোর সূক্ষ্ম কারুকাজের অলঙ্কার উমা, কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতীকে না পরালে যেন অঙ্গ শোভা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাই হয়তো গোটা বাংলা সহ দেশ-বিদেশের কাছে বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপে ওঁদের গ্রামের ভীষণ কদর। একদা ওদের কদর ছিল তাঁত বুননেও।
ভাগীরথী পূর্ব পাড়ের মহেশগঞ্জ বাগানে পাড়ার বাসিন্দাদের তাঁতের শাড়ি ছিল জগৎ বিখ্যাত। কালের নিয়মে সেই বাংলার তাঁত শিল্পের চাহিদা কমেছে। কারণ সুতোর দাম বৃদ্ধি। পরিশ্রম করেও ঠিকমত মজুরি মিলছিল না। মহাজনি খপ্পরে পড়ে যাচ্ছিলেন। শাড়ি তৈরিতে গ্রামের তাঁতিরা উৎসাহ হারিয়েছেন। পরে ধীরে ধীরে এলাকার বেশ কিছু পরিবার বুলেনের সুতোর সাজ তৈরিতে মনোনিবেশ করেন।
এরপর একের পর এক প্রায় প্রতিটা পরিবার এই শিল্পকে আঁকড়ে রুটি রুজির সন্ধানে নেমে পড়েন। এখানকার শিল্পীদের তৈরি সাজ পরানোর জন্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পুজো উদ্যোক্তারা উদগ্রীব হয়ে থাকেন। তবে এই শিল্পের মূল কারিগর মহিলারা হলেও ইদানীং পুরুষরাও দিনের বেলায় অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সেরে, রাতে ফিরে পরিবারের সঙ্গে এই শিল্পে সহযোগিতা করেন। শিল্পীদের এখন একটাই দাবি, সরকারি অনুদান পেলে এই শিল্পকে তারা আরও বড় জায়গায় নিয়ে যেতে পারতেন। মহেশগঞ্জ বাগানে পাড়ার বাসিন্দা ‘সাজ শিল্পী’ সত্যম দেবনাথ বলেন, ‘সামনেই দুর্গাপুজো। রাতদিন কাজ করে দেবদেবীর সাজ তৈরির কাজ চলছে। আমি ২৮ বছর ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিমার সাইজ অনুযায়ী সম্পূর্ণ সাজের দাম কম করে দু› হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হয়।’
বাগানে পাড়ার আর এক শিল্পী রাজকুমার দেবনাথের কথায়, ‘কলকাতা, কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ থেকে পাইকারি দোকান থেকে কাঁচামাল আনতে হয়। আর্ট পেপার পিচবোর্ড আঠা, চুমকি, বুলেন সুতো, পুঁতি, অভ্র, বুলেনের সুতো কিনে আনতে হয়। তারপর ছোট ছেনি, হাতুড়ি বাটালির সাহায্যে নকশার ফর্মা কাটতে হয়। এরপর আঠা লাগিয়ে বুলেনের সুতো, চুমকি ইত্যাদি দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করতে হয়। প্রতিমার মুকুট, চিক, হাতের বালা, কোমর বিছা সহ বিভিন্ন অলংকার। মহালয়ের কয়েক দিন আগেই বাইরের সমস্ত সাজ ডেলিভারি দিতে হয়।’
মহেশগঞ্জ বাগানেপাড়া লিপিকা দেবনাথ, পিংকি সর্দাররা বলছিলেন, ‘এই কাজের মাধ্যমে আমরা উপার্জনের পথ খুঁজে পেয়েছি। দিনে সাত থেকে আট ঘন্টা কাজ করি। তাতে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা রোজগার হয়।’ নবদ্বীপ স্বরূপগঞ্জ পঞ্চায়েতের মহেশগঞ্জ বাগানে পাড়ার প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবারের বসবাস। এখানকার শিল্পীদের তৈরি সাজ উত্তরপ্রদেশ, অসম, ত্রিপুরা সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় পাড়ি দিচ্ছে। এছাড়া রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই সাজ পৌঁছে যাচ্ছে কুমারটুলির হাত ধরে।