নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ‘সুভাষের মৃত্যু হয়েছে এ আমি বিশ্বাস করি না। কেউ যদি ছাই এনেও দেখান তাহলেও আমি বিশ্বাস করব না। আমার মন বলছে, ও বেঁচে আছে। কোথাও আত্মগোপন করে আছে।’ কথাটা বলেছিলেন মহাত্মা গান্ধী।
নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: ‘সুভাষের মৃত্যু হয়েছে এ আমি বিশ্বাস করি না। কেউ যদি ছাই এনেও দেখান তাহলেও আমি বিশ্বাস করব না। আমার মন বলছে, ও বেঁচে আছে। কোথাও আত্মগোপন করে আছে।’ কথাটা বলেছিলেন মহাত্মা গান্ধী।
অর্থাৎ প্রতিটি ভারতবাসী আত্মা দিয়ে যা বিশ্বাস করে তা শোনা গিয়েছিল জাতীর জনকের গলাতেও। ভারতের অন্য কোথাও নয় বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে এ উক্তি করেছিলেন গান্ধী। ১৯৪৬ সালে তিনি বাংলার বিপ্লবীদের কাছে বলেছিলেন এ বিশ্বাসের কথা। দমদম সেন্ট্রাল জেলে বসে বলা গান্ধীজির সেদিনের বিশ্বাসের উত্তর আজও খুঁজে চলেছে দেশ। গান্ধীজির সেদিনের কথাগুলি ইতিহাসের বইয়ে লেখা রয়েছে। অনেকেরই পড়ার সুযোগ নেয়। মানুষের সামনে তা তুলে ধরার তাগিদ সেভাবে দেখায়নি কোনও মহল।
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাস। কংগ্রেসের সিংহভাগ নেতাকর্মী দমদম সেন্ট্রাল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তখনও বন্দি সুভাষচন্দ্র বসুর সহকারী ও অনুগামীরা। জেলে বন্দি থাকা সুভাষপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে দেখা করতে ১৯৪৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দমদম জেলে গেলেন মহাত্মা গান্ধী। প্রায় এক ঘণ্টা কথা বললেন বিপ্লবীদের সঙ্গে। সে কথার সিংহভাগ সুভাষ সম্পর্কিত। সে সময় জেলবন্দি ছিলেন বিপ্লবী সমর গুহ ও অমলেন্দু ঘোষ। তাঁরা সেদিনের বর্ণনা লিখে গিয়েছেন তাঁদের বইতে। লিখছেন, ‘সুভাষকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দৃশ্যত আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি মাথায় আঙুল ঠেকিয়ে বসেছিলেন। তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করছিল। ভাবুক হয়ে বলছিলেন, আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি কিভাবে তিনি ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে দেশত্যাগ করলেন। দেশকে স্বাধীন করতে জীবনকে পণ রেখেছিলেন। কতটা বাহাদুর হলে এমনটা করা যায়। এরপর এক মিনিটের জন্য তিনি নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর বন্দিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমি বিশ্বাস করি সুভাষ বেঁচে রয়েছে। তিনি কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন। এমনকি কেউ আমাকে ছাই দেখালেও সুভাষ বেঁচে নেই বলে আমি কখনও বিশ্বাস করব না। শুধু দমদম জেল নয়, পরে তিনি বিভিন্ন জায়গায় তাঁর এই বিশ্বাসের কথা বলেছিলেন।’ সমর গুহ আরও লিখেছেন, ‘১৯৪৫ সালের ২৩ আগস্ট টোকিও রেডিও থেকে অসমর্থিত সূত্রের খবর বলে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর মহাত্মা গান্ধী বোসবাড়িতে ফোন করে কোনও শ্রাদ্ধ করতে বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, প্রার্থনা করতে। পরে তিনি দমদম জেলের মতো সর্বসমক্ষেও বলেছেন, নেতাজি মারা গিয়েছে, আমি বিশ্বাস করি না।’
১৯৪৬ সালের আগেও দমদম জেলে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৩৯ সালে দমদম জেলের অব্যবস্থা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বিপ্লবীরা। শুরু করেছিলেন আমরণ অনশন। সে সময় গান্ধী জেলে গিয়ে বন্দিদের অনশন তোলার অনুরোধ করেছিলেন। আলিপুর জেলে ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে সাধারণ মানুষের। কিন্তু দমদম জেলের ক্ষেত্রে তেমন কোনও উদ্যোগ আজও চোখে পড়েনি বলে বক্তব্য অনেকের। ‘স্বদেশী দমদম’ গ্রন্থের লেখক মৌমিতা সাহা ও শ্যামলকুমার ঘোষ বলেন, ‘দমদম ঘিরে ইতিহাসের অজস্র উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে। সেন্ট্রাল জেলে মহান বিপ্লবীরা বন্দি ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী নিজে এসে বন্দিদের সঙ্গে দেখা করে সময় কাটিয়েছিলেন। সেইসব মূল্যবান তথ্য সামগ্রী ও গর্বের ইতিহাস জনমানসে তুলে ধরার প্রয়োজন। আমরা দমদম জেলে দর্শনার্থীদের জন্য মিউজিয়াম ও গবেষকদের জন্য আর্কাইভ তৈরির দাবি জানিয়েছি।’